চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, এবার মোট জিপিয়ে-৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। গতবছরের পরীক্ষায় জিপিয়ে-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ শিক্ষার্থী। সে হিসাবে এবার জিপিএ-৫ কম পেয়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল থেকে এ তথ্য জানা যায়।
গত ১০ এপ্রিল শুরু হওয়া এই পরীক্ষায় মোট ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়—যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় এক লাখ কম। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। এ ছাড়া, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৮ দশমিক ০৯ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
শতভাগ পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কমেছে ১৯৮৪টি
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪টি। গত বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮টি। সেই হিসেবে এবার শতভাগ পাসের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কমেছে ১ হাজার ৯৮৪টি।
১৩৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ১৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ, এসব প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল করেছে। গত বছর শূন্য পাস করা এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫১টি। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৪টিতে।
পাসের হার ও জিপিএ-৫, দুদিকেই মেয়েরা এগিয়ে
আগের তিন বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও পাসের হারে এগিয়ে আছে মেয়েরা।পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ছিলেন ৯ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৯ জন, ছাত্র ৯ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৭ জন। এদের মধ্যে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪৫ জন ছাত্রী ও ৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৮১ জন ছাত্র পাস করেছে। এ হিসাবে ছাত্রীদের পাসের হার ৭১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৬৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অপরদিকে, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রী এবং ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছাত্র। এবার ছাত্রদের চেয়ে ৮ হাজার ২০০ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পাসের হারে টানা ১০ বছর এগিয়ে ছাত্রীরা
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তার মধ্যে ছাত্রীদের পাসের হার ৭১.০৩ শতাংশ এবং ছাত্রদের পাসের হার ৬৫.৮৮ শতাংশ। সেই হিসাবে এবারও পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। এ নিয়ে টানা ১০ বছর এসএসসিতে পাসের হারে এগিয়ে ছাত্রীরা। বিগত ১১ বছরের এসএসসি ও সমমানের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবশেষ ২০১৫ সালে ছাত্রীদের চেয়ে পাসের হারে এগিয়ে ছিল ছাত্ররা। সে বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। তার মধ্যে ছাত্রদের পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের পাসের হার ছিল ৮৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এরপর থেকে প্রতিবছর পাসের হারে এগিয়ে ছাত্রীরা।
বোর্ডভিত্তিক পাসের হার
এবার সবচেয়ে বেশি পাস করেছে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এরপর আছে—যশোর বোর্ড: ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, কারিগরি বোর্ড: ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ড: ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ, সিলেট বোর্ড: ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, মাদরাসা বোর্ড: ৬৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, ঢাকা বোর্ড: ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ড: ৬৭ দশমিক ০৩ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ড: ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ, ময়মনসিংহ বোর্ড: ৫৮ দশমিক ২২ শতাংশ, বরিশাল বোর্ড: ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
সাধারণ ৯ বোর্ডে পরীক্ষার্থী: ১৪ লাখ ৯০ হাজার ১৪২ জন। তার মধ্যে— ছাত্র: ৭ লাখ ১ হাজার ৫৩৮ জন, ছাত্রী: ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬০৪ জন। এবার সর্বমোট ২ হাজার ২৯১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া অংশগ্রহণ করেছে ১৮ হাজার ৮৪টি প্রতিষ্ঠান। মাদরাসা বোর্ডে পরীক্ষার্থী : ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন। এর মধ্যে— ১ লাখ ৫০ হাজার ৮৯৩ জন ছাত্র ও ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৩৩ জন ছাত্রী ৭২৫টি কেন্দ্রে, ৯ হাজার ৬৩টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসেছে। তারমধ্যে— ১ লাখ ৮ হাজার ৩৮৫ জন ছাত্র এবং ৩৪ হাজার ৯২৮ জন ছাত্রী।
এবার সবগুলো শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী। তার মধ্যে— ঢাকা বোর্ড: ৩৭ হাজার ৬৮ জন, চট্টগ্রাম বোর্ড: ১১ হাজার ৮৪৩ জন, কুমিল্লা বোর্ড: ৯ হাজার ৯০২ জন, ময়মনসিংহ বোর্ড: ৬ হাজার ৬৭৮ জন, যশোর বোর্ড: ১৫ হাজার ৪১০ জন, বরিশাল বোর্ড: ৩ হাজার ১১৪ জন, দিনাজপুর বোর্ড: ১৫ হাজার ৬২ জন, সিলেট বোর্ড: ৩ হাজার ৬১৪ জন, রাজশাহী বোর্ড: ২২ হাজার ৩২৭ জন। অন্যান্য বোর্ডের ফলাফল— মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড: জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯ হাজার ৬৬ জন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড: জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী। এবারের পরীক্ষায় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় নকল করে বহিষ্কার ৭২১ শিক্ষার্থী
২০২৫ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় নকলসহ বিভিন্ন অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে সারা দেশে ৭২১ শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছে। তবে এই সংখ্যা গত ছয় বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। ২০২০ সালে যেখানে ১ হাজার ১৫৫ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছিল, সেখানে চলতি বছর এই সংখ্যা কমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ১৪৩ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়। প্রতি বছর এই সংখ্যা কমতে কমতে ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪১ জনে। একই ধারা কুমিল্লা বোর্ডেও লক্ষ্য করা যায়। ২০২০ সালে যেখানে ৭৭ জন বহিষ্কার হয়েছিল, চলতি বছর সেখানে বহিষ্কৃত হয়েছে ৪৮ জন। বরিশাল বোর্ডে ২০২০ সালের তুলনায় এখন বহিষ্কারের হার অনেকটাই কমে এসেছে—১০২ থেকে ২৮ জনে নেমে এসেছে সংখ্যা। দিনাজপুর বোর্ডেও ১০৫ থেকে কমে ৫৯ জনে ঠেকেছে বহিষ্কারের হার।
ময়মনসিংহ বোর্ডে যদিও ২০২৩ সালে বহিষ্কারের সংখ্যা ছিল ৮১ জন, চলতি বছর তা কমে ৬৪ জন হয়েছে। রাজশাহী বোর্ডে এ বছর মাত্র ৭ জন বহিষ্কৃত হয়েছে, যা অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। যশোর বোর্ডে বহিষ্কৃত হয়েছে ১৫ জন, আর সিলেট বোর্ডে মাত্র ২ জন। চট্টগ্রাম বোর্ডে সর্বনিম্ন বহিষ্কার হয়েছে—শুধু ১ জন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে এ বছর বহিষ্কৃত হয়েছে ৩২৫ জন শিক্ষার্থী। যদিও ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৬১ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এ বছর বহিষ্কৃত হয়েছে ১৩১ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮৬ জন, তবে ২০২০ সালে যা ছিল ২২৯ জন।
অন্যদিকে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষাবোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। এরমধ্যে ছাত্রী ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন এবং ছাত্র ৯ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ জন। সারা দেশের ৩ হাজার ৭১৫টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য এর আগে ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ জন। সে তুলনায় ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী কমেছে প্রায় এক লাখ। আর ২০২৪ সালে তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪৮ হাজার পরীক্ষার্থী কমেছিল।
সব বোর্ডেই গণিতে ভরাডুবি
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সব বোর্ডেই গণিতে পাসের হার আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় গণিতেই বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেনি। ফলে সব শিক্ষাবোর্ডে গণিতেই ভরাডুবি ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ১১টি বোর্ডের বিভিন্ন বিষয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সবচেয়ে ভালো ফল হয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে, যেখানে গণিতে পাসের হার ৮৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই ফল অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় অনেকটাই ভালো হলেও বাকি সব বোর্ডেই চিত্রটা হতাশাজনক।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে গণিতে পাস করেছে ৭৫ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। রাজশাহী বোর্ডে এ হার কিছুটা ভালো—৮৬ দশমিক ৫২ শতাংশ। যশোর বোর্ডেও তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে, পাসের হার ৮৫ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে কুমিল্লা, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ বোর্ডে ফল অনেকটাই খারাপ। কুমিল্লা বোর্ডে গণিতে পাসের হার ৭২ দশমিক ০১ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৭১ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে মাত্র ৬৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। বরিশাল বোর্ডে এই হার আরও কম—মাত্র ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিতে পাস করেছে ৮১ দশমিক ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও আশানুরূপ নয়। সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৮৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। এছাড়া, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও গণিতে পাসের হার কম, যেখানে ৭৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে।
বিদেশে পাসের হার ৮৭.৩৫ শতাংশ
২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এবার গড় পাসের হার ৬৮.৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ পাসের হার ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বিদেশ থেকে অংশ নিয়েছে ৪২৭ জন। সেখানে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৭৩ জন, ফেল করেছে ৫৪ জন। বিদেশের পাসের হার শতকরা ৮৭.৩৫ শতাংশ।