Category: মুক্তস্বর

  • মাহফুজা খানম: গণ্ডী ভাঙা আলোর যাত্রী

    মাহফুজা খানম: গণ্ডী ভাঙা আলোর যাত্রী

    পয়লা বৈশাখে তাঁর জন্ম। এই দিনে বাঙালি বর্ষবরণের আবাহন বাণী উচ্চারণ করে–‘মুছে যাক গ্লানি, মুছে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ জন্মক্ষণে গীত এই মহৎ সংগীতটিকে মাহফুজা খানম সারাজীবন ধারণ করেছেন।

    মাহফুজা খানমের ডাক নাম হেলেন। তখন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের বাড়িতে তাঁরা থাকেন। পাশের অভয় দাস লেনে তখন জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল বাস করতেন। তাঁর বাড়িতে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের পরিচালনায় শিশুকিশোর সংগঠন কচিকাঁচার মেলা সংগঠিত হয়। শুরুর দিন থেকেই হেলেন কচিকাঁচার মেলার সাথে যুক্ত হন। তখন তাঁর বয়স ১০ বছর। মাহফুজা খানমের বাড়িতে সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিরাজ করত। বাবার ঘনিষ্ঠতার সূত্রে তাঁদের বাড়িতে দেশের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মনে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তখন দিশা খূঁজে ফিরছে। নিজ বাড়ির পরিবেশ থেকেই মাহফুজার শিশুমনে ক্রমান্বয়ে বাঙালির দেশ-চেতনার সুগভীর ছাপ অঙ্কিত হতে থাকে। তাঁর পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক ভাবনা এবং সামাজিক কার্যক্রম এই চেতনা দ্বারা পরিচালিত হয়েছে।

    লেলিন চৌধুরী

    মাহফুজা খানমের স্কুলজীবন শুরু হয় বাংলাবাজার গার্লস স্কুলে ভর্তির মধ্য দিয়ে। এখানেই প্রথমে ছাত্র রাজনীতির সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। এরপর তিনি ইডেন কলেজে ভর্তি হন। অগ্নিকন্যা নামে খ্যাত বেগম মাতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। একসময় তিনি ইডেন কলেজের উজ্জ্বল গতিশীল নেতায় পরিণত হন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের জীবন শুরু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়খণ্ড মাহফুজার জীবনের একটি স্বর্ণময় প্রোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের বা ডাকসু’র সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মুক্তির সনদ বলে বিবেচিত ছয় দফা ও এগারো দফার প্রচারণায় ধূমকেতুর মতো তিনি সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন।

    পড়াশোনায় তুখোড় ছাত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের দীপ্ত মশাল মাহফুজা খানমের কোনো সরকারি চাকরি হয় না। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি কলেজ কোথাও শিক্ষক হিসেবে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় না। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় তাঁর অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। মেধার যোগ্যতায় পিএইচডি করার জন্য তিনি কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত হন। কিন্তু পাকিস্তানি সরকার রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে মাহফুজার পাসপোর্ট ইস্যু করা থেকে বিরত থাকে। ফলে পিএইচডি করতে তিনি লন্ডন যেতে পারেননি।

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালটি বাঙালি এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের মহত্তোম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। সে সময় দেশপ্রেমিক মানুষের একটিমাত্র লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে সাফল্যের স্বর্ণদ্বারে উপনীত করা। সেই উদ্দেশ্যে মাহফুজা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং দুঃসাহসের সঙ্গে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বসমূহ পালন করেন। তাঁদের বাড়িটি সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়।

    পাকিস্তান আমলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি‑বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতার সুযোগ না পেয়ে মাহফুজা খানম সদ্য প্রতিষ্ঠিত পুরানা পল্টন গার্লস কলেজে যোগ দেন। তাঁর পছন্দের শিক্ষকতার জীবন শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষক হিসেবে সরকারি বিভাগে আত্মীকৃত হন। এর পর ক্রমান্বয়ে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হয়ে বেশ কয়েকটি কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। মানিকগঞ্জ মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বেও ছিলেন। এ ছাড়া তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

    এক বর্ণময় দায়িত্বশীল সামাজিক জীবন তিনি যাপন করেছেন। সচেতনভাবে সক্রিয় রাজনীতির পথ থেকে সরে এসে শিক্ষকতার মাধ্যমে মানুষ গড়া এবং সামাজিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজকে মাহফুজা খানম জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চেয়ারপারসন, ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসনের সংগঠন শিশু বিকাশ ছায়ার সভাপতি, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সভাপতি, অপরাজেয় বাংলার সভাপতিসহ অনেকগুলো সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট এবং সিণ্ডিকেট সদস্য, এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিশ্ব শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন স্কুল এবং কলেজে প্রতি বছর বৃত্তি প্রদান করতেন। বহুসংখ্যক ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করেছেন। তাঁর মমতাময়ী হাতের ছোঁয়ায় এবং আর্থিক সহযোগিতায় কত মানুষের জীবন সংকটমুক্ত হয়েছে, তার হিসাব তিনি নিজেও বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন।

    মাহফুজা খানমের জীবনসঙ্গী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। এই প্রেমময় দম্পতির দুই পুত্র এবং এক কন্যা। বড় পুত্র এবং কন্যা চিকিৎসক এবং মেজো পুত্র আইনজীবী ব্যারিস্টার। মাহফুজা-শফিক দম্পতির নীতিনিষ্ঠতা, সততা প্রায় প্রবাদপ্রতিম। ১৯৪৬ সালের ১৬ এপ্রিল জন্ম নেওয়া দেশপ্রেমিক, মানবপ্রেমিক এবং কল্যাণকামী মানুষটির জীবনপ্রদীপ ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট নির্বাপিত হলো। অক্লান্ত কর্মবীর, শিক্ষানুরাগী, জীবনবাদী মানুষটির প্রতি অসীম শ্রদ্ধা এবং বিনম্র ভালোবাসা।

    লেখক: খেলাঘর কর্মী এবং জনস্বাস্থ্যবিদ

    [লেখাটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের অনলাইন সংস্করন থেকে নেওয়া]

  • জনসংযোগ কর্মী মানেই মুখপাত্র নয়, মুখপাত্র হয়ে উঠতে হয়

    জনসংযোগ কর্মী মানেই মুখপাত্র নয়, মুখপাত্র হয়ে উঠতে হয়

    আপনার দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রতিদিন কারো না কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি হবে। পরিচয় হবে টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে কিংবা সরাসরি কিংবা সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। জনসংযোগ পেশা কেমন জানি নতুন পরিচয়ের নেশায় বুদ হয়ে থাকা। একজন জনসংযোগ কর্মী হিসেবে ৩০ বছরের সময়কাল যেন এক অভিজ্ঞতার পসরা সাজিয়ে সম্মুখপানে তাকিয়ে থাকা। নতুন পরিচয়, নতুন অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়ার জন্য।

    অন্য সকল ডিপার্টমেন্টের এক্সিকিউটিভদের মতো জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সকাল-সন্ধ্যা অফিসের সময়, কালাকানুন সবই মেনে নিতে হয়। অতিরিক্ত হিসেবে ২৪ ঘণ্টাকেই কর্মঘণ্টা মেনে নিয়েই দায়িত্ব পালন করতে হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় দিনটি যদি ৩৬ ঘণ্টায় হতো তাহলে ভালোই হতো। আজকাল বনেদী খেলা ক্রিকেটে টি-টেন, টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে দিনদিন জনপ্রিয় উঠছে। কিন্তু টেস্ট ম্যাচের জৌলুস কিন্তু রয়ে গেছে আদি ও অকৃত্রিমতায়। জনসংযোগ পেশাটা ঠিক সেই রকমই একটা টেস্ট ম্যাচ। ধৈর্যের টেস্ট ম্যাচ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমহারে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া। আর যদি কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ পেশা হয়ে থাকে তবে তো আপনাকে যেকোনো সময়ে যেকোনো বিষয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

    জনসংযোগ পেশাটাই এমন আপনাকে প্রতিষ্ঠানের সব বিষয়ে কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান যে ধরনের ব্যবসার সাথে জড়িত সেই ব্যবসা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হয়। উদাহরণ হিসেবে- এভিয়েশন সেক্টরের ব্যবসার কথাই উল্লেখ করা হলো- একজন সেলস্ কিংবা মার্কেটিং প্রতিনিধি সেলস অথবা মার্কেটিং বিষয়ক সম্যক জ্ঞান থাকলেই যথেষ্ট, অ্যাকাউন্টিং কিংবা রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের কাজের ধরনও হিসাব-নিকাশসংক্রান্ত যেখানে কাজের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা পাইলট উভয়েরই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষায়িত হতে হয়। আবার এডমিন কিংবা এইচআর ডিপার্টমেন্টেরও কাজের সীমাবন্ধতা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বিভাগ যেমন পারচেজ, ক্যাটেরিং, ইন-ফ্লাইট সার্ভিস, কাস্টমার সার্ভিস, সিকিউরিটি, ক্লিনিং, ট্রান্সপোর্ট প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আলাদা আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু পাবলিক রিলেশন ডিপার্টমেন্ট কাজের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।

    জনসংযোগ কর্মীকে যেকোনো সময় যেকোনো বিষয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতে হয়। খুব বেশি সচেতনতার সাথে বক্তব্য রাখতে হয়। ভুল বক্তব্য প্রতিষ্ঠানকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। কঠিন সময়ে সাবলীলভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারাই একজন জনসংযোগবিদ যে অন্যদের থেকে আলাদা তাই প্রকাশ করা।

    একজন জনসংযোগ কর্মীর প্রয়োজনীয়তা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সবসময়ই আছে। যেমন প্রয়োজন ভালো সময়ে তেমনি প্রয়োজন মন্দ সময়ে। তবে ভালো সময়ের চেয়ে মন্দ সময়ে জনসংযোগ কর্মীকে খুব বেশি প্রয়োজন বলেই মনে হয়। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো মন্দ সময়ে একজন জনসংযোগ কর্মী তার সুসম্পর্ক দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ভালো সময়ের দিকে এগিয়ে নিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে। একজন জনসংযোগবিদ তার সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে মিডিয়ার মাধ্যমে সকল স্তরের নাগরিকদের নিকট সঠিক বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে তুলে ধরতে পারেন। যা অন্য কর্মকর্তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না।

    প্রয়োজন থাকলেই সংবাদকর্মীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা আর প্রয়োজন শেষ হলেই সম্পর্ক শেষ এই নীতিতে যারা বিশ্বাস করেন তাদের জন্য জনসংযোগ পেশা নয়। যারা নির্দিষ্ট সময় মেনে জনসংযোগ পেশায় কাজ করতে চান তাদের জন্যও এই পেশা খুব বেশি মানানসই হবে না।

    সরকারি কিংবা বেসরকারি উভয় সেক্টরেই জনসংযাগ কর্মীকে অফিস সময়ের বাহিরেও সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখতে হয় নিজেকে। আপনি হয়তো রাত ১১টা কিংবা ১২টায় ও ফোন কল পেতে পারেন। আপনার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ পরিচয়ের সূত্র ধরে কেউ জরুরি একটা সেবার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়ে থাকলে প্রয়োজন বুঝে সহায়তা করা। এটাও জনসংযোগ কর্মীর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। কারো সাথে পরিচয় হবে প্রফেশনালি কিন্তু সম্পর্ক তৈরি হবে পারসোনালি। যে সম্পর্কটা থাকবে আজীবন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে লাভবান হবে প্রতিষ্ঠান।

    শুধু এক্সটার্নাল রিলেশন ভালো রাখতে হবে ব্যাপারটা আসলে তা নয়, আপনার ইন্টারনাল রিলেশনও অনেক ভালো হতে হবে। ইন্টারনাল রিলেশন যতবেশি শক্তিশালী হবে আপনি জনসংযোগ কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠানে আপনার ভূমিকা ততবেশি গ্রহণযোগ্য হবে। আপনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কোনো বার্তা খুব সহজেই মিডিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন, যা প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো কর্মীর পক্ষে সম্ভব নয়।

    ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে বড় মিডিয়া কিংবা ছোট মিডিয়া বলতে কিছু নেই। একজন জনসংযোগ কর্মী হিসেবে আপনাকে সব মিডিয়াই সমান ধারণা পোষণ করতে হবে। কোনো ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে সত্য ঘটনা তুলে ধরাই কাম্য হবে নতুবা ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে নানাবিধ কল্পকাহিনির সম্মুখীন হতে পারেন, যা ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে, ভবিষ্যৎ ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সত্য সংবাদ প্রকাশে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    প্রত্যেকটি মিডিয়া হাউজের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এমনকি সংবাদকর্মীদের কমিউনিটি বেজড্ অনেক প্রতিষ্ঠান থাকে তাদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে যেমন জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), ক্রাইম রিপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্র্যাব), ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) ইত্যাদি। একজন জনসংযোগ কর্মী হিসেবে সংবাদকর্মীদের মনোভাব অনুধাবন করা খুবই জরুরি।

    জনসংযোগ কর্মীর কাজ এবং সময়ের কোনো রুটিন মাফিক সীমাবদ্ধতা নেই। সবসময়ই ফ্রি আবার আবার সবসময়ই ব্যস্ত। প্রতি মূহূর্তেই ব্যস্ততার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। কঠিন সময়েও উপলব্ধি এমনই হওয়া উচিত- কথার মাধ্যমেই আপনি একজনকে কষ্ট দিতে পারেন আবার কথার মাধ্যমেই আপনি একজনকে সন্তুষ্টি দিতে পারেন। কথা বলবেন আপনি। আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কি কষ্ট দেবেন নাকি সন্তুষ্টি দেবেন।

    একজন জনসংযোগকর্মী আপাদমস্তক কোম্পানির মুখপাত্র হয়ে ওঠার জন্য আপনাকে সৎ, নিষ্ঠা, সময়ানুবর্তিতা, অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়া খুবই জরুরি।


    • লেখক: মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

     

  • জীবাশ্ম জ্বালানি নয়, সবুজ শক্তিই ভবিষ্যৎ

    জীবাশ্ম জ্বালানি নয়, সবুজ শক্তিই ভবিষ্যৎ

    প্রতিবছর ২২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ধরিত্রী দিবস। পৃথিবীর প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ও মমত্ববোধকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী’ – জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করে। এটি এমন একটি বার্তা, যা কেবল পরিবেশবাদী আন্দোলনের জন্যই নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা যেভাবে শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার করি, তা-ই নির্ধারণ করছে আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎ। তাই, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব রোধ করে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাত্রা করাই আজ সময়ের দাবি।

    বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রধান ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা- সব মিলিয়ে এখানে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বেড়ে চলা জ্বালানি চাহিদা পূরণে এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বিরাজমান। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো গ্যাস, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। যদিও বাংলাদেশ নিজে মাত্র শুন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমন করে, তবু এই পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব এখানেই সবচেয়ে বেশি পড়ছে। বিশ্বব্যাপী কার্বন নির্গমণ ও বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে, যা দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও কৃষি উৎপাদনে ব্যাঘাত-এসবই জলবায়ুর পরিবর্তিত আচরণের পরিণতি।

    এমন পরিস্থিতিতে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নবায়নযোগ্য উৎস যেমন সৌর, বায়ু ও জৈবজ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বিকল্প গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ পরিবর্তন বাস্তবায়নে প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং কার্যকর নীতি সহায়তা। বাংলাদেশ যদিও বৈশ্বিকভাবে কম নিঃসরণকারী দেশ, তবুও জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তুলতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আন্তঃখাত সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

    সৌর শক্তি ও বায়ু শক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্প গ্রহণের অনুকূল অবস্থা বিরাজমান। গ্রামীণ সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই অনেক পরিবারে আলো পৌঁছে দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে আরও বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। শক্তির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণই পারে গ্রহকে বাঁচাতে। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার কেবল পরিবেশ বান্ধব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক ও টেকসই। সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাস কিংবা জলবিদ্যুৎ—এই উৎসগুলো নির্বিচারে ব্যবহার করলেও তা প্রকৃতিকে ধ্বংস করে না। বরং, এগুলোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হয় এবং জ্বালানিনির্ভরতা কমে।

    বিশ্বজুড়ে এখন এক জীবাশ্ম জ্বালানি ফেজ আউটের জন্য বৈশ্বিক আন্দোলন চলছে। বাংলাদেশও জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছে এবং নিজস্ব অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। তবে অভিযোজনের পাশাপাশি এখন উৎপাদন কাঠামোয় রূপান্তর এর দিকে জোর দিতে হবে।

    বাংলাদেশ ২০২১ সালে “জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি” ঘোষণা করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে আসবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন—নবায়নযোগ্য শক্তি প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য কর সুবিধা ও নীতিগত স্থায়িত্ব, সৌর প্যানেল উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ জনবল তৈরি, জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য শক্তি সংযুক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, সব সরকারি ভবনে বাধ্যতামূলকভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন। তরুণ প্রজন্মকে এই খাতে উৎসাহিত করতে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি বিষয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি।

    ধরিত্রী দিবস কেবল সরকারের দায়িত্ব স্মরণ করায় না, বরং নাগরিকদের সচেতন ও কার্যকর ভূমিকার কথাও মনে করিয়ে দেয়। বিদ্যুৎ সাশ্রয়, পরিবেশবান্ধব জীবনধারা, এবং নবায়নযোগ্য পণ্যের ব্যবহার—এগুলো ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের হাতিয়ার হতে পারে। বাড়িতে সৌর প্যানেল বসানো, এলইডি বাল্ব ব্যবহার, প্রয়োজনবোধে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত রাখা, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার, ইলেকট্রিক বাইক ও গাড়ির ব্যবহার—এ সবই পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ছোট ছোট পদক্ষেপ।

    বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমরা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারি। পরিবেশ ক্লাব, তরুণ উদ্ভাবক, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মেলা, সামাজিক উদ্যোগ, এবং ক্লাইমেট ক্যাম্পেইন—এসবের মাধ্যমে তরুণরা নেতৃত্ব দিতে পারে একটি ‘গ্রিন বাংলাদেশ’ গড়ার আন্দোলনে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে গ্রিন ক্যাম্পাস ইনিশিয়েটিভ, পরিবেশবান্ধব কারিকুলাম এবং সৌর বিদ্যুৎ চালিত ইকো ল্যাব গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনকে পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ দেওয়া সম্ভব।

    সরকার ইতঃমধ্যেই নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি, বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। তবে, এই প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

    নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। ভূমি স্বল্পতা, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগের খরচ এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব অন্যতম প্রধান বাধা। তবে, দীর্ঘমেয়াদী লাভের কথা বিবেচনা করলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং উদ্ভাবনী সমাধান এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

    “আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী” প্রতিপাদ্যটি কেবল নীতি নির্ধারক বা বিশেষজ্ঞদের জন্য নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি বার্তা বহন করে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ব্যবহার, সৌর প্যানেল স্থাপন, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের সুবিধা সম্পর্কে অন্যদের জানানো – এই সবই একটি টেকসই ভবিষ্যতের দিকে আমাদের পদক্ষেপকে শক্তিশালী করতে পারে।

    কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য একটি বড় হুমকি। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে সেচ ব্যবস্থা পরিচালনা, কৃষি যন্ত্রপাতি চালানো এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপন করা গেলে একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে, তেমনি অন্যদিকে কৃষকদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।

    শিল্পক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কলকারখানা এবং শিল্প ইউনিটগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ এবং বায়ুবিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপও হ্রাস করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

    এবারের ধরিত্রী দিবসের বার্তাটি শুধু ধরিত্রী দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য নয়, বরং এটি এক আহ্বান—নিজেদের শক্তিকে পরিবেশ রক্ষায় কাজে লাগানোর। জীবাশ্ম জ্বালানি আমাদের উন্নয়ন এনে দিয়েছে, কিন্তু তার মূল্য আমরা প্রকৃতি ও মানুষের স্বাস্থ্য দিয়ে দিচ্ছি। এখন সময় এসেছে টেকসই বিকল্প বেছে নেওয়ার। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—আমরা কত দ্রুত ও কতটা পরিকল্পিতভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারি তার ওপর। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ধাবিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জনগণের সচেতনতাই পারে একটি টেকসই এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

    ধরিত্রী বা পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাসস্থল। এর ভারসাম্য রক্ষা করতে কাজ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। দিনদিন যেভাবে পরিবেশ দূষণ, বন নিধন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বাড়ছে, তাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ পৃথিবী রেখে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এখনই আমাদের সচেতন হতে হবে এবং ধরিত্রী রক্ষায় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এই লক্ষ্যে গাছ লাগানো, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহার, পানি-নদী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে অংশ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের দিকে নজর দিতে হবে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ধরিত্রীকে রক্ষা করতে এবং এক টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

    এই ধরিত্রী দিবস হোক একটি নতুন অঙ্গীকারের দিন। আসুন, এবারের ধরিত্রী দিবসে আমরা সকলে মিলে আমাদের গ্রহকে রক্ষা করার এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর অঙ্গীকার করি। আমাদের সম্মিলিত শক্তিই গড়ে তুলবে আমাদের সবুজ পৃথিবী। আমাদের শক্তি, আমাদের ভবিষ্যৎ—এবং অবশ্যই, আমাদের পৃথিবী।


    লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।


     

  • ‘কর্মমুখী’ কারিগরি শিক্ষাই পারে বিপুল জনগোষ্ঠীর পতন ঠেকাতে

    ‘কর্মমুখী’ কারিগরি শিক্ষাই পারে বিপুল জনগোষ্ঠীর পতন ঠেকাতে

    বার্ডস আই ভিউ বলে একটা কথা আছে। এর মানে পাখির চোখে দেখা। চোখের সামনে অনেককিছু বুঝতে পারবেন না, কিন্তু যখন উপর থেকে দেখবেন তখন পরিষ্কার ভিউ পাবেন। আমার কাছের লোকজন জানে আমি কেমন দেশপাগল। সবাই দেশ ছাড়তে চাইলেও আমি কখনো ছাড়তে চাইনি। এখন যখন বাইরে আসছি অনেককিছু উপর থেকে দেখে ক্লিয়ার হচ্ছে।

    আপনারা যখন দেখছেন উন্মাদ নির্বোধ বাঙ্গু জনতা আবারও মব ভায়োলেন্স তৈরি করে অস্থিরতা তৈরি করছে। আমার হাসি পাচ্ছে, দু:খ লাগছে। বহির্বিশ্বের তরুণ মিলেনিয়াল আর জেন জিরা ফেসবুকে এক্টিভ না, তাই নিজের দেশ নিয়ে অ্যামবারেসড হওয়া লাগবে না ভেবে স্বস্তি পাচ্ছি। টিকটক, ইনস্টা, স্ন্যাপচ্যাটে ভিডিও গেলে অবশ্য আর লজ্জা বাঁচানোর ভরসা নাই। কারণ পাকিস্তানেও দুইদিন পরপর এসব মব সহিংসতার ঘটনা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই দেখি। যাই হোক, নিজের জাতীয়তা তো বদলাতে পারবো না।

    ভদ্রতা, শিষ্টাচার, গণ পরিসরের আচরণ, সভ্য আচরণ এসব শেখাতেও আমরা ব্যর্থ। এসব ছাপিয়ে আমি আসলে ভাবি এতো বিরাট সংখ্যক তারুণ্যের অপচয়। এখানে অর্থনীতির ছাত্ররাও দেখি বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক তরুণের কথা জানে। কিন্তু ওদের বলতে পারি না এই বিপুল তারুণ্যকে কীভাবে নষ্ট করে ফেললাম আমরা। রাজনৈতিক সহিংসতা, ব্যক্তিতান্ত্রিক উন্নয়ন ধারণা ও তা থেকে উদ্ভূত দুর্নীতির ফলে আমরা সুদূরপ্রসারী কোন পরিকল্পনাই করিনি।

    বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে সুযোগ থাকার পরেও তারা শিক্ষায় বিনিয়োগ করেনি। অথচ এই একটা খাতের সামান্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি আর কারিগরি শিক্ষায় জোর দিলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য একটা লক্ষ্য থাকতো সামনে আগানোর। দেখুন, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিছু না কিছু মাধ্যম লাগে। রিটায়ারমেন্টের পর বাড়ি, শীতের ছুটিতে কক্সবাজার টাইপের লক্ষ্যও একটা মাধ্যম। আপনি ওইটুকু পাওয়ার জন্য সারাবছর বা সারাজীবন কাজ করেন। শুধুমাত্র মরার পরের জীবনকে টার্গেট করে কেউ বাঁচে না। যারা ধর্মগুরু তারাও না। যদি করতো তারা তাহলে নিজেরা মুমিনের মতো জীবন কাটাতো। কিন্তু তারা মোনাফেকি করে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরকালের মূলা ঝুলায়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে।

    আপনি ধর্মীয় শিক্ষা নেন বা একাডেমিক শিক্ষা, দুনিয়ায় যেহেতু বেঁচে থাকতে হবে টাকা উপার্জন আপনাকে করতেই হবে। বড়লোক বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মাদ্রাসায় পড়লেও তারা পরবর্তীতে অন্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়। ব্যবসা বা অন্যান্য চাকরি করে। কিন্তু গরীব যে শিশু মাদ্রাসা বা এতিমখানায় যায় তার আসলে ভবিষ্যৎ থাকে না। অন্যরা বড় হয়ে ছাত্রলীগ/ছাত্রদলের মতো সংগঠনের সদস্য হয়। আর সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা অত্যন্ত ছোট বয়স থেকেই ধর্মীয় রাজনীতির অনুসারী হিসেবে গড়ে ওঠে।

    টেকনিক্যাল বা আধুনিক শিক্ষা না থাকায় তারা অন্য পেশাতেও পিছিয়ে থাকে। তার বয়সী অন্য শিশু যেখানে জাভা, পাইথন শিখতেছে এসব শিশু কিশোরদের একমাত্র রেফারেন্স পয়েন্ট ধর্মগ্রন্থ ও তার নানামুখী তাফসির। ধর্মগ্রন্থগুলো যতটা শান্তিপূর্ণ, এর ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে সেটা কতটা মারণাস্ত্র হতে পারে তা আমরা বর্তমান দুনিয়ায় দেখতে পারছি।

    বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রেই দেখা যায় কুরআন বা হাদিসের বাণী পড়ে কেউ হয় আল্লাহভিরু মুসলমান আর কেউ হয় খুনে মানসিকতার জঙ্গি ভাবাপন্ন। একই কথা হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি সব ধর্মের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন সমস্যা শুধু ধর্মীয় শিক্ষার না। এখানে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই একটা স্ক্যাম। একটা সমাজের সবার অনার্স, মাস্টার্স করার দরকার নাই। যারাই অল্টারনেটিভ পথ বেছে নিয়েছে এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং, ফিজিওথেরাপি, নার্সিং, টেকনিশিয়ান, কম্পিউটার শিক্ষার দক্ষতা অর্জন করেছে, তারা কিন্তু কেউ বসে থাকে না। ড্রাইভিং শিখে কাউকে বসে থাকতে দেখবেন না।

    যারা লেখাপড়া জানে না তারাও হেলপারি করে করে ড্রাইভারিটা শিখে নেয়, কারণ এই কর্মদক্ষতা ওকে কাজ দেবে ভবিষ্যতে। এবং এই দক্ষতাটা যদি কেউ বৈজ্ঞানিক উপায়ে শেখে তাহলে তা সে দেশের বাইরেও কাজে লাগাতে পারবে।

    ধরেন আপনি খুব ভালো টাইলস মিস্ত্রি। মানে আন্দাজে না একদম অংকের হিসাবনিকাশ করে টাইলসের কাজ বোঝেন। সঙ্গে যদি আপনার ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা থাকে আপনি দেশের মধ্যেই বড় বড় প্রোজেক্ট পাবেন। আপনার যদি দক্ষতার ওপর সার্টিফিকেট থাকে ও আপনি ইংরেজি বা অন্য বিদেশি ভাষাটাও জানেন, আপনি একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে বিদেশে আসতে পারবেন।

    তবে এই সংখ্যাটাও আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ডিজিটাল অভিবাসন প্ল্যাটফর্ম ‘আমি প্রবাসী’র বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪ এ সেকথাই উঠে এসছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ২৭ শতাংশ কমেছে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ১৪ লাখ (১৩,৯০৮১১) গেলেও ২০২৪ সালে বিদেশ যায় দশ লাখ (১০,০৯,১৪৬) জন বাংলাদেশি কর্মী। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দক্ষ কর্মী তৈরির অন্যতম মাধ্যম, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তির সংখ্যা কমা।

    প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরিতে ২০২৪ সালে ১ লাখ ১২ হাজার ১৬৬ জন ভর্তি হয় যা আগের বছর ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৭০ জন। যা অর্ধেকেরও কম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই তারুণ্য যাচ্ছে কোথায়? নিশ্চয়ই তারা সাধারণ শিক্ষা বা মাদ্রাসায় ফিরে যাচ্ছে না। আমার ব্যক্তিগত ধারণা দৈনিক মজুরি, রিকশা চালানোর কাজে যুক্ত হচ্ছে অথবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হচ্ছে। কারণ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আসলে যাওয়ার আর জায়গা থাকে না। সচেতনতা না থাকায় এসব মানুষকে সহজেই ভুল পথে পরিচালিত করা যায়।

    সমস্যা হচ্ছে সবাইকে আইএ, বিএ পাস হওয়ার সেই ব্রিটিশ আমলের গর্বের চিহ্ন হিসেবে আজও আমরা শিক্ষাকে ভুল পথে পরিচালিত করছি। এখানে কোন পরিকল্পনা নাই। যে অংক পারে না সে হয় অংকের শিক্ষক, যে সমাজ, পৌরনীতি, রাষ্ট্রনীতি বোঝে না সে গিয়ে বাচ্চাদের সমাজবিজ্ঞান পড়ায়। মুখস্ত করতে দিয়ে ক্লাসরুমে ঘুমায়। এতে আমরা দীর্ঘ দশবছর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজবিজ্ঞান পড়িয়েও সভ্য নাগরিক তৈরি করতে পারি না। ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবে আমাদের জনগোষ্ঠীর মানুষ ইংরেজি ভাষাটাকে রীতিমতো ভয় পায়। অন্যান্য ভাষায় তো দক্ষতা অর্জন করেই না।

    এদিকে যারা করে তারা কিন্তু বসে থাকে না। কোন দক্ষতা অর্জনই বৃথা যায় না। অনলাইনে হোক, বাইরে যেয়ে হোক, নিজে উদ্যোক্তা হয়ে কিছু না কিছু কাজ তারা করেই। অন্যদিকে হাজার হাজার এমএ, বিএ’র কোন কাজ নাই। এসব তো কর্মমুখী শিক্ষা না, এতো এতো গ্রাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট দিয়ে কাজ নাই তো! বাংলা, ইংরেজি, সমাজ, অংক, পদার্থের মতো সাবজেক্ট পড়ে শিক্ষক হওয়া যায়। কিন্তু আমাদের কারিকুলাম ডিজাইন সেরকম না। ফলে গাদা গাদা সাবজেক্টের গ্র্যাজুয়েট আর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট আসলে সার্টিফিকেটধারী বেকার আর কম বেতনের কামলা ছাড়া কিছুই বানাতে পারছে না।

    এখন আপনি যে শিক্ষাতেই শিক্ষিত হোন, যখন কাজের মধ্যে থাকবেন তখন আসলে আপনার দুনিয়ার সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় আসবে না। রিয়্যাক্ট করা তো অনেক দূরের চিন্তা। সুস্থ ও সুন্দর চিন্তার মধ্যে থাকলে ও ঘৃণার বাণী না শুনলে আপনিও মানবিক মানুষ হবেন। আপনার প্রতিবাদের ভাষা হবে সভ্য। আপনাকে তখন লোকে গুরুত্ব দেবে। আপনার কথা শুনবে। কিন্তু আপনারা যখন যুক্তিতর্ক, ভব্যতা-সভ্যতার ধার না ধেরে শুধু অন্ধ আক্রোশ আর রাগ দেখান, তখন আর মানুষ আপনাদের সিরিয়াসলি নেয় না। কিন্তু এটা বোঝানোর মতো মানুষ নাই খুব একটা।

    আমি বা আমার মতো দুয়েকজন বললে নানা ট্যাগে ট্যাগায়িত করে কেউ আসবো জান নিতে, কেউ আসবে গালি দিতে। যারা সচেতন বাবা-মা, তারা রিয়েলিটি বোঝার চেষ্টা করুন।

    ট্রাস্ট মি, বাংলাদেশের এসব প্রতিবাদ, প্রতিরোধে কিছুই যায় আসে না। বিশ্বের আর কোন মুসলিম দেশের মানুষ এগুলো করে না। অন্যদের প্রতিবাদের ভাষা সভ্য, দক্ষিণ এশিয়ানদের মতো এত ভায়োলন্ট না। পুরো দেশের চিন্তা না করে আপনি নিজ নিজ সন্তানকে যদি দুনিয়ায় কিছু করে খাওয়ার ও ঘৃণাজীবী না হওয়ায় শিক্ষা দেন, তাতেও লাভ হবে। একশটা ঘৃণাজীবীর মধ্যে দশজন মানবিক মানুষ থাকলেও লাভ। আমাদের বাবা-মায়েদের সচেতনতাই পারে দুনিয়ার বুকে ছোট্ট এই দেশটাকে মাথা উঁচু করে টিকায়ে রাখতে।


    রাজনীন ফারজানা: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ভ্রিজ ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস (ভিইউবি)|


  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে তো!

    রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে তো!

    বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১৩ লাখ রোহিঙ্গার মধ্য থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে মিয়ানমার ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার গণমাধ্যম শাখা। তদুপরি আরও ৭০ হাজারের চিহ্নিতকরণ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে ওই শাখা থেকে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চরম অনিশ্চয়তায় থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এটি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক খবর। এখন কথা হচ্ছে, মিয়ানমারে ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত এ রোহিঙ্গাদের বাস্তব প্রত্যাবাসন কবে থেকে শুরু হয়ে কবে নাগাদ শেষ হবে এবং অনুরূপ প্রক্রিয়ায় বাকিদের চিহ্নিতকরণ ও প্রত্যাবাসনের কাজ কবের মধ্যে সম্পন্ন হবে? আগামী বছরের ঈদের আগে সম্পন্ন হবে তো, যেটি প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় ঘোষণা করেছেন।

    মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অংশবিশেষকে ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিতকরণের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে মনে হতে পারে যে, উল্লিখিত শরণার্থীরা হয়তো সহসাই নিজ দেশে ফিরে যাবে। তবে সাদা চোখে এমনটি মনে হলেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা ও মারপ্যাঁচ এতটাই জটিল ও রহস্যময় যে, প্রকৃতপক্ষে ওই শরণার্থীরা কবে স্বদেশে ফিরে যেতে পারবে, তা শুধু প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়ার পরই নিশ্চিত বলা সম্ভব। তবে আশা করব যে, এটি অবশ্যই প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী বছরের ঈদের আগে সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাস্তবে হবে তো? এমনটি জিজ্ঞেস করার কারণ একাধিক, যা নিয়ে এখানে খানিকটা আলোচনা করছি।

    রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন এমন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, রোহিঙ্গা ও অন্যান্য আরও কিছু জাতিগত সমস্যার কারণে মিয়ানমারে এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক মাত্রায় রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিরাজমান। মিয়ানমারের অন্যান্য রাজ্যের কথা বাদ দিয়ে শুধু রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকানের বিষয়ে বলতে গেলেও স্বীকার করতে হবে যে, সেখানকার অবস্থা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক নাজুক। বিদ্রোহী আরাকান লিবারেশন আর্মি (এএলএ) এবং অন্যান্য আরও কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আরাকানসহ মিয়ানমারের অন্যত্রও ব্যাপক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মিয়ানমারে স্থিতিশীল পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা; অতঃপর সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন বস্তুত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তার ওপর সেখানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের ফলে এটি আরও খানিকটা সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে বৈকি! এ অবস্থায় মিয়ানমার ফেরতযোগ্য রোহিঙ্গাদের তালিকা তৈরির কথা বললেও বাস্তবে এ শরণার্থীদের তারা সহসাই ফিরিয়ে নেবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

    রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যে দেশটি এই মুহূর্তে মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হয়, সেটি হচ্ছে চীন। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক চীন সফরকালে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাহলেও ১৩ থেকে ১৪ লাখ শরণার্থী রোহিঙ্গার সে দেশে ফিরে যেতে বেশ লম্বা একটা সময় লেগে যাবে। কারণ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আগে সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে মিয়ানমার সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেখানে এখনো অনেক কাজ করতে হবে। রাখাইন প্রদেশ এখন বলতে গেলে সাম্প্রদায়িক হানাহানি ও লুণ্ঠন-উত্তর এক বিধ্বস্ত জনপদ, যেখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার কোনো পরিবেশই নেই—ন্যূনতম নিরাপত্তা তো নেই-ই। ফলে সেখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে সেখানকার একাধিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। উল্লেখ্য, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়িঘর, জমিজমা ও সহায়সম্পত্তির অধিকাংশই এখন অপরাপর বর্মীদের দ্বারা জবরদখল হয়ে আছে। ফলে রোহিঙ্গাদের সেখানে ফিরিয়ে নেওয়ার আগে সরকার কর্তৃক ওইসব পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।

    মিয়ানমারের সামরিক সরকার এবং দেশটির স্থানীয় জনগণের মধ্যকার একটি বড় অংশই রোহিঙ্গাদের সে দেশের স্থায়ী নাগরিক হিসেবে তো নয়ই, এমনকি রোহিঙ্গা হিসেবেও মানতে রাজি নয়। তাদের ভাষায় রোহিঙ্গারা হচ্ছে অভিবাসী মুসলমান। বস্তুত তাদের এ ধরনের আন্তঃসাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট সংঘাতের কারণেই রোহিঙ্গাদের পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এ অবস্থায় তাদের সে দেশে ফেরত পাঠাতে হলে সর্বাগ্রে সে দেশের সরকার কর্তৃক তাদের ওই দেশের স্থায়ী নাগরিক হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তা দিলেই শুধু তাদের পক্ষে সে দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে। নইলে এ ধরনের প্রত্যাবাসন কখনোই স্থায়ী বা টেকসই হবে না। কিন্তু কথা হচ্ছে, মিয়ানমার সরকার কি সেটি করতে রাজি হবে কিংবা বিশ্বসম্প্রদায় কি তা করতে তাদের রাজি করাতে পারবে? তদুপরি এ ক্ষেত্রে এটাও মনে রাখা দরকার যে, রোহিঙ্গা সমস্যার সঙ্গে শুধু মিয়ানমারের নিজস্ব জাতিগত সমস্যাই জড়িয়ে নেই—এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশও অন্তরাল থেকে নানাভাবে কাজ করছে। ফলে বিশ্বরাজনীতির ওইসব কূটচাল অতিক্রম করে রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিদানের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকে রাজি করানোর কাজটি যথেষ্টই জটিল ও কষ্টসাধ্য।

    মোটকথা, আরাকান ছেড়ে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের বিষয়টি শুধু নাফ নদী পার হয়ে পশ্চিম পাড়ে চলে আসার মতো সরল বিষয় নয় এবং তাদের ফিরে যাওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এর চেয়েও অধিক জটিলতা। তদুপরি এর সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী পক্ষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ফলে এরকম একটি জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড়ানো রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান রাতারাতি হয়ে যাবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। বিষয়টি আমরা সাধারণ মানুষ যতটা বুঝি, তার চেয়ে অনেক ভালো বোঝেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং তার চেয়েও অধিক বোঝেন বিশ্বসমাজের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসার অভিজ্ঞতায় হৃদ্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু এতসব বুঝেও গত ১৪ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিবের পাশে বসে তিনি বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা যেন আগামী বছর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে তাদের নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে ঈদ উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জাতিসংঘের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছি।’ (প্রথম আলো, ১৫ মার্চ, ২০২৫)। এ অবস্থায় মিয়ানমার যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরতযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানাল, তা ওই বক্তব্যের সঙ্গে খুবই ধারাবাহিকতাপূর্ণ। কিন্তু কথা হচ্ছে, এটি কি সত্যি সত্যি ১৪ লাখ রোহিঙ্গার পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া, নাকি এদের মধ্য থেকে প্রতীকী কতিপয়কে পুনর্বাসন করে সেটিকেই সাফল্য হিসেবে দেখানোর কোনো কূটনৈতিক কৌশল?

    সে যাই হোক, থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বিমসটেক সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকে বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি (হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ) ড. খলিলুর রহমানকে মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী উ থান সোয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ফেরতযোগ্য রাখাইন শরণার্থীর তালিকা তৈরির তথ্য দিয়েছেন মর্মে গণমাধ্যমকে যা জানানো হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। আর এ ধারাবাহিকতায় ১৩ লাখ শরণার্থী রোহিঙ্গা যদি আগামী বছরের ঈদ তাদের আরাকানের নিজ বাড়িতে করতে পারে, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি হবে বিশ্ব শান্তির পক্ষে বিজয়লাভের অন্যতম বড় ঘটনা। কিন্তু বাস্তবে সত্যি সত্যি তেমনটি হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

    • লেখক: অ্যাজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
  • স্বাধীনতা কি তবে ছিনতাই হয়ে গেছে

    স্বাধীনতা কি তবে ছিনতাই হয়ে গেছে

    অনেকেই মনে করেন যে আমাদের স্বাধীনতা ছিনতাই হয়ে গেছে। মনে করাটা যে একেবারে অযৌক্তিক তাও বলবার উপায় নেই। মুক্তি তো পরের কথা, এমনকি স্বাধীনতাও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ তো তাকে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু ছিনতাইয়ের ঘটনা যদি ঘটেই থাকে, তবে কে করল ওই মর্মান্তিক কাজটা? কেউ কেউ বলেন, ছিনতাই করেছে মৌলবাদীরা।

    দেখাই তো যাচ্ছে তাদের জঙ্গি তৎপরতা ক্রমবর্ধমান, কেউ নেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো; হয়তো সামনে এমন সময় অপেক্ষা করছে যখন লেজই বরং কর্তৃত্ব করবে মাথার ওপর, মৌলবাদীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে সমাজ ও রাষ্ট্রে। অন্যরা বলেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, স্বাধীনতা চলে গেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর হাতে। তারা এখন হর্তাকর্তা। সাম্রাজ্যবাদীরা পুঁজিবাদী; এবং পুঁজিবাদী ও মৌলবাদীদের ভেতর একটা আপাতদূরত্ব, বলা যায় প্রায় বৈরিতা থাকলেও অন্তরে তারা পরস্পর থেকে মোটেই দূরে নয়। উভয়ে গণবিরোধী, ব্যক্তিগত মালিকানায় ও মুনাফায় বিশ্বাসী এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের শত্রুপক্ষ। তাদের নিকটবর্তিতা প্রশ্নাতীত।

    ওই যে উপলব্ধি, স্বাধীনতা ছিনতাই হয়ে যাবার, সেটা কি সঠিক? আরও একটি মৌলিক জিজ্ঞাসা অবশ্য দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতা কি সত্যিকার অর্থে এসেছিল, নাকি যা ঘটেছিল সেটি হলো ক্ষমতার হস্তান্তর। সাতচল্লিশের ‘স্বাধীনতাটা’ যে মোটেই স্বাধীনতা ছিল না, ছিল ব্রিটিশ শাসকদের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে-দেওয়া, ছেড়ে দিয়ে সেটি তুলে দিয়ে-যাওয়া তাদের অনুগত পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির হাতে, তা তো আজ আর মোটেই অস্পষ্ট নয়। একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকেরা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষমতা চলে এসেছে বাংলাদেশি শাসকশ্রেণির হাতে, সরাসরি না-হলেও তাকেও তো এক ধরনের ক্ষমতার হস্তান্তরই বলা চলে। ক্ষমতা যাদের কাছে যাবে বলে আশা ছিল তাদের কাছে যায়নি, যায়নি জনগণের কাছে, রয়ে গেছে ওই শ্রেণির হাতে।

    সংখ্যার হিসাবে দল যতই হোক শ্রেণি কিন্তু একটাই, শাসকশ্রেণি। ওই শাসকশ্রেণির বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে, নানা রকম পোশাকে, এমনকি পরস্পরবিরোধী আদর্শের আওয়াজ তুলে ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করে। ওদের ভেতর পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব রয়েছে, হিংস্রভাবে তারা একে অপরকে আক্রমণ করে। পারলে শেষ করে দিতে চায়। কিন্তু এদের মূল আদর্শ ও লক্ষ্য একটাই। সেটি হলো ক্ষমতায় যাওয়া এবং সেখানে টিকে থাকা; আর ক্ষমতায় থেকে তারা যা করতে চায় সেটি হলো অবাধ লুণ্ঠন এবং ক্ষমতাকে যাতে স্থায়ী করা যায় সে-ব্যবস্থা গ্রহণ। তাদের ভেতর যে লড়াইটা সেটি ওই ক্ষমতা দখল ও ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে। সেটি তাদের রাজনীতি; এবং এ বিষয়ে তো সন্দেহের কোনো সুযোগ নেই যে, ওই রাজনীতিই হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে রাজনীতির মূলধারা। বিশ্ব এখন গণমাধ্যমের (ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট) আওতাধীন।

    ছবি সংগৃহীত

    গণমাধ্যম আসলে প্রচারমাধ্যম। বাংলাদেশের প্রচারমাধ্যম সম্পূর্ণরূপে শাসকশ্রেণির কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে রয়েছে; ফলে আমরা, সাধারণ মানুষেরা, প্রতিনিয়ত তাদের ঝগড়াবিবাদ তো বটেই, আরও যেটি গুরুত্বপূর্ণ সে লুণ্ঠনের আদর্শের সঙ্গে প্রত্যক্ষে-অপ্রত্যক্ষে পরিচিত হই। এই লুণ্ঠনকারীরা আমাদের বীর, তাদের বীরত্বই অনুকরণীয়।

    এ দেশে কখনোই জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি জনবিচ্ছিন্ন ও ক্ষুদ্র শাসকশ্রেণি দেশ শাসন করেছে। এটা ব্রিটিশ আমলে ঘটেছে, পাকিস্তান আমলেও সত্য ছিল, বাংলাদেশের কালেও মিথ্যা নয়। আগের দুই সময়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভেতর যে বুদ্ধিজীবীরা ছিল, শাসকশ্রেণিকে তারা বলত, ‘তোমরা ও আমরা’; তোমরা শাসক, আমরা শাসিত। এখন মধ্যবিত্তের ছোট একটি খণ্ড শাসকশ্রেণির অংশ হয়ে গেছে, বড় খণ্ড নেমে গেছে নিচে, জনগণের কাছাকাছি। এখনকার প্রধান বুদ্ধিজীবীরা শাসকশ্রেণির সঙ্গে আছে, যদিও দলীয়ভাবে তারা বিভক্ত, রাজনৈতিক নেতাদের মতো। তারা তাই ‘তোমরা ও আমরা’ কথাটা বলতে পারে না, বলে ‘আমরা ও তোমরা’, আমরা শাসকদের সহযোগী, আর তোমরা হচ্ছো জনসাধারণ। সশব্দে বলে না, কিন্তু তাদের অবস্থান, চিন্তাধারা ও বক্তব্য ওই বিভাজনটাকে জানিয়ে দেয়।

    এই যে শাসকশ্রেণি, সেটি অখণ্ড বটে। তাদের ভেতরকার যে কলহ সেটি শরিকদের যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে ভাইয়ে-ভাইয়ে শত্রুতা হয়, রাজনীতিকে-রাজনীতিকে লড়াই বাধবে না কেন। এই শ্রেণি নানা উপাদানে গঠিত। এদের ভেতর ব্যবসায়ী, আমলা, পেশাজীবী সবাই রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে যেটুকু স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তা যে এরা এনেছে তা নয়; ‘স্বাধীনতা’ এনেছে জনগণ, একবার ভোট দিয়ে; দ্বিতীয়বার ভোট এবং রক্ত দুটোর বিনিময়ে।

    শাসকশ্রেণির একাংশ তো স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল; কেউ কেউ প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেছে। ঘোরতর শত্রুতা করেছে জামায়াতিরা। পরে তারা ক্ষমতার একাংশ হয়ে গেছে। এই যে আপাত-অদ্ভুত ঘটনা, এর ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা অন্য কিছু নয়, সেটি এই যে, শ্রেণিগতভাবে এ মৌলবাদীরাও শাসকশ্রেণির বাইরে নয়, ভেতরেই আছে। আওয়ামী লীগ এদের সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে, তাতে কোনো অসুবিধা হয়নি, যদিও ইতিহাসের নির্দেশ মানলে দু’পক্ষের থাকার কথা ছিল পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। বিএনপির তো কথাই নেই, তারা তো জামায়াতকে কোলে টেনে নিয়েছে। দল সত্য নয়, সত্য হচ্ছে শ্রেণি। দল বা ইতিহাস দিয়ে লোক চেনা যায় না, খুব সহজে চেনা যায় শ্রেণিগত পরিচয় দিয়ে।

    আন্দোলন সংগ্রাম যা করবার তা মূলত জনগণকে করতে হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে এটা সত্য ছিল, পাকিস্তান আমলেও সত্য থেকেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সব কিছুতে জনগণ ছিল; কেবল ছিল না, তাদের কারণে ওইসব ঘটনায় সাফল্য এসেছে, দুর্ভোগ যা তাদের পোহাতে হয়েছে। কিন্তু সংগ্রামের যা অর্জন সেটি তাদের ঘরে যায়নি, পৌঁছে গেছে এখন যারা শাসক অর্থাৎ জনগণের শত্রু তাদের হাতে, তারাই ক্রমাগত হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে জনগণ থেকে এবং নিপীড়ন চালিয়েছে ওই জনগণের ওপরই।

    ব্রিটিশ শাসনের কালে এই শাসকশ্রেণির যাত্রার সূত্রপাত ঘটে। সে সময়ে তারা উঠতি শ্রেণি, তারা চাইছিল ব্রিটিশ যখন চলে যাবে তখন তাদের হাতে যেন ক্ষমতা দিয়ে যায়; ক্ষমতা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব ছিল, যে দ্বন্দ্ব রূপ নিয়েছিল নির্মম সাম্প্রদায়িকতার। জনগণের ভেতর সাম্প্রদায়িকতা ছিল না, প্রতিবেশীকে তারা প্রতিবেশী হিসেবে দেখত, শাসনক্ষমতা পাবার জন্য লোলুপ শ্রেণিটি সাধারণ মানুষকে আত্মঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত করেছে। দুর্ভোগ যা সেটা সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হয়েছে, আর দুই দিকের দুই বিত্তবান শ্রেণি শাসনক্ষমতা পেয়ে নিজেদের বিত্তবেসাত বাড়িয়ে তুলেছে।

    পাকিস্তান আমলে শাসনক্ষমতা ছিল অবাঙালিদের হাতে; বাঙালি মধ্যবিত্ত কিছুটা সুযোগ-সুবিধা পেল ঠিকই, কিন্তু অবাঙালিদের তুলনায় সে প্রাপ্তিটা ছিল সামান্য; অবধারিত রূপেই একটা দ্বন্দ্ব বেধে উঠল দু’পক্ষের মধ্যে। জনগণের অসন্তোষটা ছিল আরও বড়; তারা কিছুই পায়নি, তারা ছিল বিক্ষুব্ধ। বাঙালি মধ্যবিত্ত চেয়েছে স্বায়ত্তশাসন, জনগণ চেয়েছে মুক্তি। কিন্তু জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক দল ছিল না। তারা ওই স্বায়ত্তশাসনকামী জাতীয়তাবাদীদের পেছনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এবং তাদের কারণে অবাঙালি শাসকেরা এই দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। যুদ্ধটা ছিল জনযুদ্ধ।

    • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

    লেখাটি দৈনিক সমকাল থেকে নেওয়া।