‘দিন থেকেই মনটা বিষণ্ণ। একটি মোবাইল ফোনের কারণে নিষ্পাপ শিশু অপ্রতিমের করুণ মৃত্যু মেনে ক নিতে কষ্ট হচ্ছে। শিশুটির ছবির দিকে তাকালে যে কারও নিজের সন্তানকে মনে পড়ার কথা। আমার ছেলেটি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন ওকে আমার ব্যবহার করা একটি বাটন ফোন দিয়েছিলাম বাইরে গেলে যোগাযোগ করার জন্য। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কয়েক তরুণ চাকু দেখিয়ে তার কাছ থেকে সেটি কেড়ে নেয়। বিষন্ন মনে বাসায় এসে ওর মাকে বলেছিল সে ঘটনা। ভয় পাচ্ছিল, আমি বকাঝকা করি কি না। কিছু বলিনি ওকে। বরং দুর্বৃত্তদের বিনা বাধায় ফোন সেটটি দিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে বলে আশ্বস্ত করেছিলাম। প্রথম পাওয়া মোবাইল ফোন হারিয়ে খুব কষ্ট পেয়েছিল ছেলেটি। যে এলাকায় ফোনটি ছিনতাই হয়েছিল, সে এলাকা আমার পরিচিত এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গেও জানাশোনা ছিল। কিন্তু ওই ফোন উদ্ধারের কোনো চেষ্টাই করিনি। সেটাও ছেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আসলে জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাদের মতো অসহায় সাধারণ মানুষ অনেক অন্যায়-অবিচারকে নীরবে সহ্য করে যায়। তারপরও অনেকেই রেহাই পায় না দুর্বৃত্তদের থাবা থেকে।
হয়তো শখের বশেই মায়ের আইফোন সেটটি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম। সে হয়ত জানত না, এ ফোনটিই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। জানলে সে এটা করত না। এখন কেউ কেউ অপ্রতিমের মৃত্যুর নানা কারণ খুঁজে বের করতে ব্যস্ত। কেউ বলছেন, তার মা-বাবার অসতর্কতা এজন্য দায়ী। কারণ ছেলে তাদের অজান্তে দামি ফোন নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল, অথচ তারা কোনো খবরই রাখলেন না! আবার কেউ বলছেন, সপ্তম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর কেন তার চেয়ে বেশি বয়সী বন্ধু থাকবে? অন্যদিকে এর বাইরেও অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার ছেলের হত্যার সম্ভাব্য আরও দুটি কারণ বলেছেন গণমাধ্যমকে। একটি হলো অপ্রতিমের বাবার দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে টাকা পাওনাজনিত বিরোধ, অন্যটি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর থাকাকালে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্যকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তার অনুমান, তার ও অপ্রতিমের প্রতি ক্ষোভের কারণে দুর্বৃত্তরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
কিশোর অপ্রতিমের হত্যার মূল কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের। তারা নিশ্চয়ই সেটা করবে। যদিও অনেকেই সে বিষয়ে আশাবাদী হতে পারছেন না। তারা সংশয়ে আছেন, শেষ অবধি হত্যার বিশ্বাসযোগ্য মোটিভ পুলিশ উদঘাটন করতে পারে কি না। কেউ কেউ এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলারও উদাহরণ টানছেন। তারা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে হত্যার মোটিভসম্পর্কে স্পষ্ট কিছু না বলছে, ততক্ষণ এই বীভৎস হত্যার কারণ রহস্যঘেরাই থাকবে।
পরিচিতজনদের বক্তব্য-মন্তব্য থেকে অনুমান করতে পারছি, অপ্রতিমের বয়সী সন্তানদের অভিভাবকগণ এখন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। শিশুপুত্র বা কন্যাটি স্কুলে গেলে কিংবা বাসার বাইরে খেলতে গেলে অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে কিনা তা নিয়ে তাদের উদ্বেগের অন্ত নেই। একধরনের নিরাপত্তাহীনতাবোধ তাদের ঘিরে ধরেছে। কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন এজন্য। তাদের এ অভিযোগকে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। কেননা চারপাশে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্নের উদ্রেক করা স্বাভাবিক। অবশ্য কেউ কেউ এজন্য চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে জনরোষের মুখে পড়ে পুলিশের নাস্তানাবুদ হওয়াকে কৈফিয়ৎ হিসেবে সামনে আনতে চান। তারা বলেন, জনরোষের সে ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনীটি হারানো সক্ষমতায় ফিরে আসতে পারছে না। তবে ঘটনার দুই বছর পরে এ কৈফিয়ৎ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জনগণের জানমাল রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এ বাহিনীটিকে কেন এখনও সক্ষম ও কার্যকর করে তোলা হলো না, এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে সরকার। লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও পুলিশ বাহিনীতে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালিয়ে যাচ্ছে। বহুসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তাকে ইউনিফরম খুলে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে ‘ফ্যাসিস্ট দোসরমুক্ত’ করার এই অভিযানের পাশাপাশি এর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
অপ্রতিম হত্যা আমাদের সামনে পুনরায় একটি সত্যকে প্রকটভাবে তুলে ধরেছে- তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের এ অংশটি বইপুস্তকের সঙ্গে সম্পর্কহীন, তাদের মধ্যে রয়েছে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের তীব্র অভাব। আমরা যখন বালক-কিশোর ছিলাম, উ পড়াশোনার বাইরে আমাদের বিচরণ ছিল খেলার মাঠে। যেখানে সুযোগ-সুবিধা ছিল, সেখানে পাঠাগারে সময় কাটত কিশোর-তরুণদের। একসময় প্রতিটি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে একটি করে লাইব্রেরি ছিল। আমরা সে লাইব্রেরি থেকে গল্প-উপন্যাস, কবিতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইতিহাস-সংস্কৃতি বিষয়ক বই নিয়ে পড়তাম। এখন স্কুলগুলোতে তেমন কোনো পাঠাগার আছে কি না সন্দেহ। বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, তাদের স্কুল বা কলেজে তা নেই। পরীক্ষা পাসের জন্য বই পড়া আর ‘মানুষ’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য বই পড়া এক নয়। বই মানুষের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করে। জীবন সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ইতিহাসের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের জীবনী অধ্যয়ন একজন কিশোরের মনে তার মতো আদর্শবান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে।
প্রতিটি মানুষের আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার পরিবারের ভূমিকা বিরাট। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, ‘পরিবার হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’ তার এ উক্তির সঙ্গে দ্বিমতের কোনো সুযোগ যে নেই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ একটি শিশু তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুর আগে পরিবারের মধ্য থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। শিশুটি তার পরিবারের অপর সদস্যদের যেভাবে আচরণ করতে দেখে, সেও সেভাবেই আচরণ করে। তাছাড়া একটি শিশু বা কিশোরের মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। যে পরিবারে সততা ও আদর্শের লালন হয়, সে পরিবারের শিশুরা বিপথে যায় খুব কম। তারপরও সৎ পিতার সন্তান যে পরবর্তী জীবনে অসৎকর্মে লিপ্ত হয়না তা নয়। সেক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবেশে সে চলাফেরা করে বা বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে, তার প্রভাব কাজ করে। আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ে মা-বাবারা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন আমরা কাদের সঙ্গে ওঠাবসা করছি, মেলামেশা করছি। আমি বড় হয়েছি গ্রামে। কঠিন পারিবারিক অনুশাসনে থাকতে হয়েছে আমাদের। আমার স্বশিক্ষিত বাবা-মার কঠিন নির্দেশ ছিল-যেখানেই থাকি, মাগরিবের নামাজের আগে ঘরে ফিরতে হবে।
আমরা মেনে চলেছি সে নির্দেশনা। আর এখন? বাবা-মা খবরই রাখেন না তাদের সন্তানরা কে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী করে? যে কিশোর-তরুণরা অপ্রতিমকে হত্যা করেছে, তারা যে মনুষ্যত্বের শিক্ষা পায়নি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই উঠতি বয়সে যারা তাদের চেয়ে কম বয়সী একটি শিশুকে মেরে ফেলতে পারে, ভবিষ্যতে তারা যে কতটা ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে আবির্ভূত হবে, ভাবলে গা শিউরে ওঠে।
কথা উঠেছে মায়ের আইফোন নিয়ে অপ্রতিমের ঘুরতে যাওয়া নিয়েও। প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া একটি বালক তার মায়ের ফোন নিয়ে টিকটক করতে বাইরে চলে গেল, অথচ তারা কোনো খবরই রাখলেন না, এটা কেমন কথা! শুধু কি তাই? ওই পিচ্চি ছেলেটির বন্ধুত্ব হয়েছিল ওর চেয়ে বয়সে বড় ছেলেগুলোর সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মা কিংবা দোকানদার বাবা তাদের সন্তানটি কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। তাদের উদাসীনতা অপ্রতিমের অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে নিঃসন্দেহে। তারা যদি তাদের শিশুপুত্রটির দিকে নজর রাখতেন, তাহলে হয়তো সে বখাটেদের সঙ্গে মিশতে পারত না, আর নির্মমতারও শিকার হতো না।
মনে পড়ে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন দৈনিক বাংলার ‘জনমত’ বিভাগে বখাটেদের উৎপাত ও কিশোর অপরাধ প্রসঙ্গে একটি চিঠি লিখেছিলাম। তাতে বলেছিলাম, কিশোররা যাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য তাদের অভিভাবকদেরই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করা উচিত। সে সময় আজকের মতো ‘কিশোর গ্যাং’ কথাটির প্রচলন হয়নি। বখাটে কিশোর-তরুণ নামেই তারা চিহ্নিত হতো। তারা সামাজিক অনেক অপরাধে জড়ালেও খুন-খারাবির মতো গর্হিত অপরাধে সাধারণত সম্পৃক্ত হতো না। এখন সময় বদলেছে। তখন বখাটেদের হাতে থাকত লাঠি-ছোরা। আর এখন তারা হাত বাড়ালেই পেয়ে যায় পিস্তল-রিভলবারের মতো মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র।
শিশু অপ্রতিমের করুণ মৃত্যু আমাদের সেই পুরনো প্রশ্নের সামনে আবারও দাঁড় করিয়ে দিল- আমরা আমাদের এই দেশ, এই রাষ্ট্রকে কি শিশুদের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত করতে পারব না? কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় বলেছেন- ‘এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ কবির এ অঙ্গীকার শুধু তার নিজের ছিল না, ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের জন্য। তারপর কত যুগ পার হয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী তো দূরের কথা, বাংলাদেশ নামের এ ছোট্ট ভূখণ্ডটিকে আমরা শিশুদের নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিণত করতে পারিনি। আমাদের এ অক্ষমতা কি ক্ষমার যোগ্য?
অপ্রতিম খুন হওয়ার পর অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ‘অপ্রতিম, ক্ষমা করিস বাবা’ বলে পোস্ট দিয়েছেন। কিন্তু আমি বলব, ‘বাবা অপ্রতিম, তোকে আমরা বেঁচে থাকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের তুই ক্ষমা করিস না।’ -প্রতিদিনের বাংলাদেশ