দেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণে ৩২টি বৃহৎ জেলায় প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। তবে প্রকল্প-ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ, জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক খাতে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৭৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রশিক্ষণের চেয়ে ভবন-অবকাঠামোতেই কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্পে আদৌ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে প্রশিক্ষণ, আর কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে অবকাঠামো? তবে মাউশি বলছে, এ উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে দেশের ৪ হাজার ১৭১টি বেসরকারি কলেজের প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৩৫ জন শিক্ষক আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আসবেন। একই সঙ্গে প্রকল্পটির আওতায় আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে একটি দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত অবকাঠামোর দরকার নেই। তার থেকে অকাঠামো কমিয়ে প্রশিক্ষণের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প হিসেবে এই দুটি প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাউশি। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাইকা থেকে এই প্রকল্পের জন্য অনুদান পাওয়া যেতে পারে। প্রকল্পটির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে শিগগির এসব প্রকল্পের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। মূল প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ৫ বছর, যা ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত।
মাউশির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, একসময় এসএসসি, এইচএসসিসহ পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল তাক লাগিয়ে দিত সবাইকে। প্রতিবছরই পাসের হার ও জিপিএ-৫ অর্জনে ভাঙত আগের বছরের রেকর্ড। তবে সেই চিত্র এখন আর নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিক বড় ধরনের পতনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে।
শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মূল্যায়নে কড়াকড়িকে পতনের কারণ হিসেবে দেখানো হলেও শিক্ষাবিদদের মতে, সাম্প্রতিক ফলাফলই দীর্ঘদিনের দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে আনছে। এই পতন শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রতিফলনও হতে পারে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা। শিক্ষকদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তার মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। এ জন্য শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করার দাবি সবার।
মাউশি জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার দ্রুত বিকাশের প্রেক্ষাপটে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ বাস্তবতায় দেশের ৩২টি বৃহৎ জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা একটি সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের ৪ হাজার ১৭১টি বেসরকারি কলেজের প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৩৫ শিক্ষক আধুনিক ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের আওতায় আসবেন। তাদের জন্য বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান পদ্ধতি যেমন স্মার্ট ক্লাসরুম পরিচালনা, ডিজিটাল কনটেন্ট প্রস্তুত ও অনলাইন শিক্ষাদান কৌশল আয়ত্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ-পদ্ধতির প্রয়োগ, আধুনিক মূল্যায়ন কৌশল, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং নিয়মিত রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ তাদের পেশাগত দক্ষতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এসব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শিতা, নেতৃত্বগুণের বিকাশ এবং পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে, যা একজন শিক্ষককে আরও আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ করে তুলবে। ফলে প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষকরাও সমানভাবে প্রশিক্ষণ সুবিধা পেয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারবেন, যা শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবমিলিয়ে এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের মানোন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং তাদের পেশাগত গুণগত পরিবর্তন শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে একটি ইতিবাচক, কার্যকর ও টেকসই প্রভাব ফেলবে। এ উদ্যোগ শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস করবে এবং শিক্ষার গুণগত মানে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। তাই এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, শিক্ষাখাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান সামাজিক-ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করা নির্বাচনি ইশতেহারের এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্যকরভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পের ফলে প্রশিক্ষণ সুবিধা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকেন্দ্রীকরণ হবে, যার ফলে প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর এলাকার শিক্ষকরাও সমান সুযোগে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন।
প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, এর রাজস্ব খাতে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা। এ অর্থের মধ্যে প্রকল্পের ১৫০ জন জনবলের পেছনে ৫০ কোটি টাকা, তাদের শিক্ষাভাতায় ১ কোটি, বাড়ি ভাড়ায় ২৫ কোটি, চিকিৎসা ভাতায় ১ কোটি, উৎসব ভাতায় ৮ কোটি, শ্রান্তি ও বিনোদনে ২ কোটি, প্রশিক্ষণ ভাতায় ৪ কোটি, আপ্যায়নে ২ কোটি ও সম্মানিতে ১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটে একদল দক্ষ জনবল থাকবেন। যারা প্রেষণে, সরাসরি ও আউট সোসিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয় হবে ৬৭ কোটি টাকা। আর প্রশিক্ষণে ব্যয় হবে ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণে ১৫০ কোটি ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণে ৬০০ কোটি টাকা। আর মূলধন ব্যয় হবে ৩ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। এই টাকা ব্যয় হবে ৩২টি একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, হোস্টেল, জিম ও কালচারাল কমপ্লেক্স নির্মাণ ছাড়াও আইসিটি সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, অফিস সরঞ্জাম ও শিক্ষা উপকরণ কেনায়। এ ছাড়া ল্যাব সরঞ্জাম, লাইব্রেরি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনা হবে। তা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬৪টি যানবাহনের পেছনে ব্যয় হবে ৫০ কোটি টাকা, ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় হবে ৩২ কোটি টাকা। এর বাইরে ফিজিক্যাল ও প্রাইস কন্টিনজেন্সির পেছনে ব্যয় হবে আরও ১০ কোটি টাকা। তবে পুরো প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ ব্যয় হবে অবকাঠামো, প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়ে। অর্থাৎ ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার প্রকল্পের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৭৫০ কোটি টাকা। ফলে অবকাঠামোনির্ভর প্রকল্প নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনেকেই।
একাধিক শিক্ষা বিশ্লেষক বলেন, এই প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষণের চেয়ে অবকাঠামো তৈরিতেই কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে নতুন নতুন ভবন নির্মাণই কি প্রধান সমাধান? শিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পনির্ভরতার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই উদ্যোগেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। নতুন প্রকল্প মানেই নতুন ভবন, নতুন জনবল ও নতুন সরঞ্জাম—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে প্রশিক্ষণের মান, ধারাবাহিকতা ও ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। শিক্ষার মানোন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি অবকাঠামো নয়, দক্ষ শিক্ষক। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব কিংবা প্রশিক্ষণ ভবন থাকলেও শিক্ষক যদি আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, মূল্যায়ন কৌশল ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পাঠদানে দক্ষ না হন, তাহলে এসব অবকাঠামো শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে না। তাই সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে প্রশিক্ষণের গুণগত মান, প্রশিক্ষণের সংখ্যা এবং শিক্ষকদের সরাসরি অংশগ্রহণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান বলেন, এসব প্রকল্প অবকাঠামো নির্মাণ ও ক্রয়নির্ভর। এগুলো শিক্ষার উন্নয়নে দুই শতাংশও কাজে আসবে না। আমাদের যেসব শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, সেগুলোতেই ঠিকমতো প্রশিক্ষণ হচ্ছে না। সেগুলো আরও কার্যকর করা দরকার। তার পরও কিছু প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজন আছে। অনুসন্ধান করে বের করতে হবে, কতটি প্রতিষ্ঠান দরকার। পরিকল্পনা করে প্রতিষ্ঠান তৈরি করা না হলে তা টাকা খরচ ছাড়া কোনো কাজে আসবে না। নতুন প্রতিষ্ঠান করার থেকে বরং বর্তমান প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট দূর করা, সংস্কার বরাদ্দ, সম্প্রসারণ বরাদ্দ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক সাংবাৎসরিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ চালু রাখলে বেশি উপকার হবে।
তবে মাউশির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ৩২টি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হলেও এত প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজন আছে কি না তা নিয়ে মাউশিরও প্রশ্ন রয়েছে। মাউশির ৯টি অঞ্চলে ৯টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করার পক্ষে অনেকের মত। তবে প্রকল্পের সক্ষমতা যাচাই হলেই মূলত উঠে আসবে কতটি প্রতিষ্ঠান দরকার। সেই অনুযায়ী প্রকল্পের ডিপিপি তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হবে।
মাউশির পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, প্রকল্পগুলো বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে ‘সবুজ তালিকায়’ অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় আছে। সবুজ তালিকায় অনুমোদিত হওয়ার পর এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে।





