দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ ঠিক নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে দায়িত্বে রেখে তা সম্ভব নয়। তিনি অলরেডি ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির আহবায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, এমপি। তিনি দাবি করেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আগে বলা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সরকার নিজেদের দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং প্রশাসনের সহযোগিতায় সারা দেশে দখলবাণিজ্য চলছে।
আজ সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রাজনৈতিক পর্ষদের জরুরি সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিভিন্ন সময় বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। সংস্কার ইস্যুতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের সঙ্গে প্রতারণামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রেখে তা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অলরেডি ব্যর্থ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দেশের আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ যে ঠিক নেই, সেটা আজ পুরো জনগণের সামনে স্পষ্ট। এটার জন্য বর্তমান সরকার, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়ী।
এনসিপির নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সারা দেশে যেখানে দখলদারি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস হচ্ছে, সেখানে জনগণের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর বিএনপি সারা দেশে যে তাণ্ডব, দখলবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি শুরু করেছিল, রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা-ভাঙচুর তারই ধারাবাহিকতা। রাতের আঁধারে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে একটি প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হলেও পুলিশ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসনের নীরবতা ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া রাজধানীর মতো জায়গায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে না।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভাঙচুরের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ঘটনাটিতে স্থানীয় বিএনপির সংশ্লিষ্টতা এবং সেখানকার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের নাম এসেছে। পুলিশ প্রশাসনের নীরবতার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা শহরের মতো রাজধানীতে রাতের বেলা তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর হবে, আর প্রশাসন সেখানে কিছুই করতে পারবে না—এটা হতে পারে না। ফলে এটা সরকারি ইন্ধনে, রাষ্ট্রীয় মদদে এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদে ঘটেছে।
কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে প্রকাশ্যে ভাঙচুর হয়েছে এবং একটি ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন তা ঠেকাতে পারেনি। এখন সেখানে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হচ্ছে। কারা হামলা করেছে, ভুক্তভোগীর দায় কী—এ ধরনের নানা বিষয় সামনে এনে সরকার নাটক সাজাচ্ছে।
রাজধানীতে আলোচিত হওয়ার কারণে রাড্ডা সেন্টার ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এসেছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সারা দেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। তিনি হবিগঞ্জে সিএনজি ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে সংঘর্ষসহ আরও কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং দেশে কার্যকরভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতিসংঘ সফর ও সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যের জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে জনগণের প্রত্যাশা উঠে আসেনি বলে মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা এবং দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আমরা মনে করি, জাতিসংঘে যে বক্তব্য তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিয়েছেন, সেখানে জনগণের প্রত্যাশা উঠে আসেনি, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা উঠে আসেনি।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, সেখানে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খননের মতো বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এসব কর্মসূচি নিয়ে দেশে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ দলীয় কর্মসূচির বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পরিবর্তে দেশের চলমান সংকট ও জনগণের প্রত্যাশার বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বিচার; বিশেষ করে গণহত্যার বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার বিষয়গুলোও জাতিসংঘে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছ থেকে কীভাবে সহযোগিতা নেওয়া যায়, সেই বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যথাযথভাবে আসেনি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিন প্রজন্মের তিনজন সেখানে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অর্থাৎ পরিবারতান্ত্রিক যে উত্তরাধিকার, সেই উত্তরাধিকারের কারণে তিনি সেখানে গিয়ে বক্তব্য দিতে পারছেন—এটাই হচ্ছে বিএনপির অর্জন। গণ-অভ্যুত্থানের পরও যদি পরিবারতান্ত্রিক উত্তরাধিকারই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকে, তাহলে তা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ওনার নিজের অর্জন থাকলে তো উনি সেটাই তুলে ধরতেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রম নিয়েও সমালোচনা করেন। সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের নামে সরকার সময়ক্ষেপণ ও সংস্কার প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, দ্রুত এই ‘নাটক’ বন্ধ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে। অন্যথায় দলীয় ও জোটগত কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবে এনসিপি।
সংবিধান সংশোধন কমিটির কার্যক্রমের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, কমিটি তিনটি বৈঠক করেছে। সর্বশেষ বৈঠকে জানুয়ারি মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে এর আইনি ভিত্তি কী এবং কীভাবে তা করা হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুরো প্রক্রিয়াটাই আমাদের কাছে মনে হচ্ছে সময়ক্ষেপণ করার এবং সংস্কার প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যাওয়ার একটা কৌশল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও আমরা এই কৌশল দেখেছি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রধান হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই সংসদে স্বীকার করেছেন যে, নির্বাচনের স্বার্থে তিনি সংস্কারে রাজি হয়েছিলেন। বিএনপি গণভোট ও জুলাই সনদের বিষয়ে রাজি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—প্রস্তাবনা, মূলনীতি, বিচার কাঠামো থেকে শুরু করে উচ্চকক্ষ—পরিবর্তন করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রয়োজন। সাধারণ সংশোধনের মাধ্যমে এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এর আগে সংবিধানের ১৭টি সংশোধনী হয়েছে। কিন্তু কোনো সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়নি। তাই সংশোধন কমিটির নামে আবার আলোচনা ও সময়ক্ষেপণ করে কিছুই না করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছে এনসিপি।
দেশে কথা বলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে অভিযোগ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারকে বা মন্ত্রীদের সমালোচনা করলেই গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে এনসিপির নেতা কর্মীদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পুলিশের এক কর্মকর্তার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত—এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। পুলিশ প্রশাসন কি পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে, নাকি কোনো রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করবে। অতীতে ‘পুলিশ লীগ’ দেখা গেছে, এখন ‘পুলিশ দল’ তৈরির কোনো প্রক্রিয়া চলছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পুলিশ সংস্কার না হওয়ায় পদোন্নতি ও পদায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব রয়ে গেছে বলেও অভিযোগ করেন এনসিপির এই নেতা।
দেশে জ্বালানিসংকট এখনো চলছে দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সংকটের পাশাপাশি তেলের দাম তৃতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে। বাজেটের সময় বলা হয়েছিল দ্রব্যমূল্য বাড়বে না। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য কয়েক দিনের মধ্যেই বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়ে করার দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন দফায় দফায় পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন প্রকৌশলের কোনো চেষ্টা হলে এনসিপি তা প্রতিহত করবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেও এনসিপির নেতারা অংশ নেবেন বলে জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই নির্বাচনকে আমরা শুধু সাধারণ নির্বাচন হিসেবে দেখছি না। সংস্কারের পক্ষে, বিচারের পক্ষে এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আমরা নিচ্ছি।’





