শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

কেমন চাই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা

কেমন চাই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা
Advertisement

লেখাপড়া শেখাটা বাইসাইকেল চালানো শেখার মতো হওয়া উচিত। একবার যদি কেউ বাইসাইকেল চালানো শিখে যায়, সে নিজের আনন্দেই বাইসাইকেল চালাতে থাকবে। অর্থাৎ লেখাপড়ার আনন্দটাও এমন হওয়া উচিত, যেন শিক্ষার্থীরা সে আনন্দ পায়। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলে হয়তো দেশ তথা জাতি আরো বেশি উপকৃত হতো। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের কাজ হলো শিক্ষার্থীদের সে আনন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমাজে বারবার বিতর্ক, অসন্তোষ নতুন নয়।

আমরা প্রায়ই উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করে থাকি। উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে ওঠেনি, বরং বছরের পর বছর পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উপযুক্ত অবকাঠামো, দায়িত্বশীল শিক্ষক ও অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর তুলনায় পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক, অবকাঠামো ও মানসম্মত শিক্ষা সহায়ক উপকরণের ঘাটতি রয়েছে।

কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অনেক উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান অনেকাংশেই নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষকদের ওপর। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন, বরং তিনি একজন পথপ্রদর্শক, চরিত্র নির্মাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের কারিগরও বটে। তাই শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন কল্পনা করা কঠিন। আমাদের কোমলমতি শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।

তাই এ স্তরের শিক্ষা আনন্দময়, সহজবোধ্য ও কৌতূহল উদ্দীপক হওয়া উচিত। এ ছাড়া বইগুলো সহজ ভাষায় লেখা ও আকর্ষণীয় রঙিন চিত্রসমৃদ্ধ হওয়া উচিত। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের মূলত ভাষাজ্ঞান, বাক্য গঠন, দ্রুত পঠন ও মৌলিক সামাজিক আচরণ শেখানো উচিত। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা, পরিবেশসচেতনতা, ট্রাফিক আইন ও পারস্পরিক সম্মানবোধের মতো বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই চর্চার মাধ্যমে শেখানো যেতে পারে। বিষয়টি লক্ষণীয় যে অতিরিক্ত পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতার চাপ না দিয়ে শিশুদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। যারা নিয়মিত পাঠ অনুসরণ করবে এবং শৃঙ্খলা মেনে চলবে, তাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। এর ফলে পড়ার প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়তে পারে। অন্যদিকে যারা পিছিয়ে পড়বে, তাদের শাস্তি না দিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে সহায়তা করতে হবে। এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে মাধ্যমিক শিক্ষার প্রস্তুতিপর্ব। এ সময় ধীরে ধীরে পাঠভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি দায়িত্ববোধ চর্চার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

অর্থাৎ বিদ্যালয়ে সময়মতো উপস্থিত হওয়া, বিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন মেনে চলা, দলগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং নিজের আচরণের জন্য জবাবদিহির মানসিকতা ইত্যাদি। এসব অভ্যাস পরবর্তী জীবনে একজন শিক্ষার্থীকে আত্মনির্ভরশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। তাই মাধ্যমিক পর্যায় একজন শিক্ষার্থীর জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ পর্যায়ে শিশুরা ধীরে ধীরে কৈশোরে পদার্পণ করে। এ ক্ষেত্রে তাদের চিন্তা-ভাবনা, ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করে। তাই এ স্তরের শিক্ষা শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক, নৈতিক, সামাজিক ও ব্যাবহারিক দক্ষতা বিকাশের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো, অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পড়াশোনা করে। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে না। এর অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভরতা, কোচিং এবং নোটভিত্তিক শিক্ষার ফলে অনেক শিক্ষার্থী সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে শুধু কিভাবে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সেই মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। এই শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা আজ কী ভাবছি, এর কী মূল্যবোধ ধারণ করছি এবং আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই। এ জন্য যদি সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, মানসিক ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, সে ক্ষেত্রে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষানির্ভর প্রতিযোগিতা থেকে বের করে এনে শেখার আনন্দ, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাই একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ কিন্তু তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। এর বড় সম্পদ হচ্ছে শিক্ষিত সমাজ, সচেতন ও মানবিক মানুষ গড়ে তোলা।

লেখক : গ্রন্থাগার বিভাগের প্রধান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম

এ বিভাগের আরও সংবাদ