শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

কিভাবে কাটবে দেশে প্রাথমিক শিক্ষার শিখনঘাটতি

Advertisement

গত ১৩ আগস্ট নিউইয়র্ক পোস্টে প্রকাশিত একটি খবর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে খুব আলোচনা হচ্ছিল। ‘সিনিয়র (দ্বাদশ শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের পড়তে, লিখতে হিমশিম খেতে দেখে শিক্ষক কান্নায় ভেঙে পড়েন’ শিরোনামে প্রকাশিত সেই খবরের মূল বিষয় ছিল এই যে ডারিয়াস উইলিয়ামস নামে টেক্সাসের এক স্কুল শিক্ষক দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দুটি অনুচ্ছেদ পড়ে একটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে দিলেন।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের অনেকেই এই সহজ কাজটি করতে ব্যর্থ হলে তিনি প্রচণ্ড হতাশায় ভেঙে পড়েন। তিনি ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই মতামত দিতে শুরু করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কি এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা?
যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব এডুকেশনাল প্রোগ্রেসের (এনএইপি) মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ, অষ্টম ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী স্যাম্পলের ভিত্তিতে শিখন অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। এর ফলাফল ‘দ্য নেশনস রিপোর্ট কার্ড’ নামে প্রকাশিত হয়।

এর আওতায় পঠন ও গণিতের মূল্যায়ন চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণত দুই বছর পর পর এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় চার বছর পর পর করা হয়। ২০২৪ সালের মূল্যায়নে দেখা যায়, দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গড় পঠন দক্ষতার স্কোর ২০১৯ সালের তুলনায় কমেছে। গাণিতিক দক্ষতার ক্ষেত্রেও তাই। চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই রকম প্রবণতা লক্ষণীয়। এই রিপোর্ট কার্ড যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার মান জানতে একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার মান বোঝার উপায় কী?

বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণা ও মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে একটি মূল্যায়নব্যবস্থাও চালু আছে। এটি জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বা ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (এনএসএ) নামে পরিচিত। মূল্যায়নপদ্ধতি, টুলস বা প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণভাবে বলা যায় যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই মূল্যায়ন (এনএসএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর জন্য নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা, পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে এটি শুধু একটি দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

দেশে প্রাথমিক শিক্ষার শিখনঘাটতি কাটবে কিভাবেজাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২ রিপোর্টের ফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে (তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণিতে) প্রায় অর্ধেক শিশুই বাংলা বিষয়ে শ্রেণিভিত্তিক কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না (তৃতীয় শ্রেণিতে ৪৯ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ)। গণিতের ক্ষেত্রে অবস্থা আরো করুণ (তৃতীয় শ্রেণিতে ৬১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ)। যারা শ্রেণিভিত্তিক দক্ষতাগুলো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করেছে, তারা পরবর্তী পর্যায়েও ভালো করবে এমনটা আশা করা যায়। কিন্তু বাদবাকি বিপুলসংখ্যক শিশু দীর্ঘ তিন থেকে পাঁচ বছর স্কুলে যাওয়ার পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক এই দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারছে না? প্রাথমিক স্তরের এই ঘাটতি নিয়েই যখন এই শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়তে যাবে, তখন তার সম্ভাব্য ফলাফল কী হতে পারে? টেক্সাসের শিক্ষক ডারিয়াস উইলিয়ামসের হতাশার কারণ বুঝতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ বা এশিয়া থেকে আফ্রিকা—যেখানেই তাকানো যায়, সেখানেই শিক্ষায় এক ব্যাপক নীরব ‘শিখন দুর্ভিক্ষ’ চলছে অনেক দিন ধরে। শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা এই ‘লার্নিং ক্রাইসিস’ বিষয়ে বারবার সতর্ক করছেন, কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ শিক্ষাবিদ বা গবেষকরা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করেন না। সেটি করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার।

বেশির ভাগ মানুষ, বিশেষ করে শিশুর মা-বাবারা অভিজ্ঞতা থেকে জানেন শিক্ষার মানের প্রকৃত অবস্থাটি কী। আরো ভালোভাবে জানেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। মাধ্যমিকের শিক্ষকরা জানেন, কারণ শিশুরা যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে যায়, তখন তাদের অনেকেরই ভাষা ও গণিতে মৌলিক ঘাটতি থেকে যায়, যা মাধ্যমিকের শিক্ষকদের পূরণের চেষ্টা করতে হয়। এর জন্য তাঁদের সময় বা সহায়তা কোনোটিই থাকে না। কারণ তাঁদের নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করার তাড়া থাকে। শেষ পর্যন্ত এসব তথাকথিত দুর্বল শিক্ষার্থী ক্রমেই ব্যর্থতার দিকে এগোতে থাকে।

একটু ভালোভাবে তাকালেই দেখা যাবে, এই শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগের ব্যর্থতার মূলে আছে প্রাথমিক স্তরে স্বনির্ভরভাবে পড়া, লেখা ও মৌলিক গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে না পারা। কারণ কোনো কিছু পড়ে বুঝতে না পারলে বা পড়ে যা বুঝলাম, তা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করার দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে অন্য বিষয় শেখাও কঠিন হয়ে যায়। স্বনির্ভর শিক্ষার্থী হতে হলে স্বনির্ভর পঠন-লিখন ও গণিতের দক্ষতা আবশ্যিক। অথচ এখনো পৃথিবীতে লক্ষ-কোটি শিশু এই দক্ষতাগুলো অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা দিনের পর দিন স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থাটি শুধুই তাদের হতাশ করছে। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, সামান্য পড়া-লেখা বা গণিতের মৌলিক দক্ষতা শেখানো এ আর এমন কঠিন কী! সেটি বোঝার জন্য প্রথমে পড়তে শেখার বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক।

শিশু সাধারণত ভাষা শেখার সহজাত প্রস্তুতি নিয়ে জন্মায়। আশপাশের মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সে কথা বলতে ও বুঝতে শেখে, যার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু পড়তে শেখার জন্য মস্তিষ্কে জন্মগতভাবে বিশেষায়িত কোনো আলাদা স্নায়ুব্যবস্থা নেই। তার জন্য স্নায়ুব্যবস্থার কিছু অংশ, যা আগে অন্য কাজে ব্যবহৃত হতো, সেগুলোকে শিখন ও অনুশীলনের মাধ্যমে পড়তে শেখার কাজের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হয়। ফ্রান্সের স্নায়ুবিজ্ঞানী স্টানিসলাস ডিহান তাঁর বহুল আলোচিত বই ‘রিডিং ইন দ্য ব্রেইন’ (২০০৯)-এ ব্যাখ্যা করেছেন, পড়তে শেখার সময় মস্তিষ্কের স্নায়ুব্যবস্থা কিভাবে নতুন কাজে অভিযোজিত বা রিসাইকল হয়। মূলত এ কারণেই পড়তে-লিখতে শেখার জন্য দরকার একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

যদিও এই পড়তে শেখানোর কাজটি বিদ্যালয়ে হওয়ার কথা, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার থেকেই শিশুর পড়া-লেখার হাতেখড়ি হয়। আমাদের দেশে অভিভাবকদের যেমন এই বিষয়ে পর্যাপ্ত ধারণার অভাব আছে, তেমনি বেশির ভাগ শিক্ষকেরও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে পড়া-লেখা শেখানোর কার্যকর প্রশিক্ষণেরও অভাব আছে। ফলে তাঁদের অনেকেই নিজেরা শৈশবে যেভাবে পড়তে শিখেছিলেন, সেটিই শিশুদের শেখানোর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। এতে অনেক শিশুরই পড়তে শেখার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থেকে যায়। এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অথচ শিশুরা কিভাবে পড়তে শেখে এবং কিভাবে তাদের পড়া শেখানো যায়, সে বিষয়ে প্রচুর বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ রয়েছে। এর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ‘সায়েন্স অব রিডিং’ বা ‘পঠনবিজ্ঞান’ যা পড়তে ও লিখতে শেখার প্রক্রিয়াটি কিভাবে ঘটে, তা জানার জন্য করা হাজার হাজার গবেষণার এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। প্রাথমিক, প্রাক-প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরের শিশুদের পঠন-লিখন শেখানোর জন্য কোন কোন পদ্ধতি কার্যকর, তা জানার ক্ষেত্রে একটি সমৃদ্ধ সম্পদ হচ্ছে এই সায়েন্স অব রিডিং।

সায়েন্স অব রিডিং জানায় যে শিশুর পঠন দক্ষতা তৈরির ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক দক্ষতা সব শিশুকে আয়ত্ত করতে শেখানো প্রয়োজন। সেগুলো হচ্ছে ফনিক্স (বর্ণ ও ধ্বনির সম্পর্ক শেখানো), ফোনোলজিক্যাল অ্যাওয়্যারনেস বা ধ্বনিসচেতনতা (ধ্বনি শনাক্ত করতে ও তা ব্যবহার করতে পারার দক্ষতা), ভোকাবুলারি বা শব্দভাণ্ডার (শব্দের অর্থ, উচ্চারণ জানা ও তা ব্যবহার করার দক্ষতা), ফ্লুয়েন্সি বা সাবলীল পঠন (সঠিকভাবে, সাবলীলভাবে ও উপযুক্ত অভিব্যক্তিতে পড়ার দক্ষতা), কম্প্রিহেনশন বা বোধগম্যতা, লেখার দক্ষতা ও ভাষার অভিজ্ঞতা (কথা বলার/শোনার অভিজ্ঞতা)। এই দক্ষতাগুলো শ্রেণিকক্ষে একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হয়। এর জন্য প্রয়োজনীয় কারিকুলাম, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইত্যাকার নানা বিষয় মিলিয়ে কাজটি খুব সহজ নয়। তবে এনএসএর ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই কঠিন কাজটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

বিদ্যালয়ে শিশুর ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে প্রচুর। এখন প্রয়োজন সায়েন্স অব রিডিং ভিত্তিক একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গবেষণায় প্রমাণিত পদ্ধতির পরিকল্পিত বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে এরই মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে কারিকুলাম পর্যালোচনা-পরিমার্জনার কাজটি শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালের এনএসএর বাস্তবায়ন বর্তমানে চলছে, যার রিপোর্ট সম্ভবত পাওয়া যাবে আগামী বছর। এই দুইয়ের সমন্বয় কিভাবে করা হচ্ছে, তা খুব স্পষ্ট নয়। শিক্ষাক্রম পরিমার্জন এবং জাতীয় মূল্যায়নের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে একই কাজ বারবার করার প্রয়োজন হতে পারে। এতে সময় ও সম্পদের অপচয়ই বাড়বে। তাই এরই মধ্যে হওয়া এনএসএর ফল নিয়ে কাজ শুরু করার পাশাপাশি নতুন মূল্যায়নের ফল অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় রাখা প্রয়োজন। সেখানে ডিপিই, এনসিটিবি, পিটিআই—সর্বোপরি স্কুলসহ কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিবর্তন করবে, কত দিনের মধ্যে করবে এবং তার ফল কিভাবে যাচাই হবে, তা অন্তর্ভুক্ত হওয়াও জরুরি। জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী মূল্যায়নের সার্থকতা প্রধানত নির্ভর করে তার ফল কাজে লাগিয়ে শিশুদের শেখার অভিজ্ঞতা ও শিখনফল কতটা উন্নত করা যাচ্ছে, তার ওপর।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

এ বিভাগের আরও সংবাদ