ত্রিশের প্রধান পাঁচজন আধুনিক কবির মধ্যে জীবনানন্দ দাশ সর্বাধিক প্রভাবকারী ও প্রতিনিধিত্বকারী কবি হিসেবে তাঁর পরের কবিদের আলোড়িত করেছেন, তাঁদের নতুন ভাষায় নতুন কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আজ কবিদের কবি। ক্লিনটন বি সিলি লেখেন—
‘ভাষার বাধা সত্ত্বেও জীবনানন্দের কবিতার এমন ক্ষমতা আছে, যা আমাদের সবাইকে বুঝিয়ে দিতে পারে সূক্ষ্মভাবে জড়িত আবেগঘমিত কল্পনাশক্তি কেমন জিনিস। যাঁর এমন কল্পনাশক্তি, তিনি সাধারণ মানুষ, আবার অসাধারণ কবি; এবং সাধারণ কবিদের চেয়ে পৃথকও বটে।’ (আ পোয়েট অ্যাপার্ট, ৩৪০)
জীবনানন্দ দাশ কবিতার সংসারে সেই মেনে যাওয়া মানুষ, যাঁকে কবিতার বারামখানায় আকাশ ও নক্ষত্রের ঐশী আলোয় চিত-বিমোচনের সাধারণয় আমরা সিক্ত হতে দেখেছি। নক্ষত্র আর অন্ধকারের এক যৌথ খেলার মধ্যে তাঁর পয়েটিক গ্লেজার যে জটিল চিত্রকল্পের জন্ম দেয়, তা হঠাৎ জেগে ওঠা জীবনেরই এক বিষাদ ও উল্লাস একই সঙ্গে। স্বপ্ন ও কল্পনার গহীন থেকে উঠে আসা নতুন নতুন চিত্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে তিনি পরাবাস্তবতার জগৎ তৈরি করেছেন। বাংলা কবিতায় তিনিই প্রথম সার্থক পরাবাস্তব কবি। ‘সমস্ত মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল—আকাশে এক তিল/ফাঁক ছিলো না;/পৃথিবীর সমস্ত প্রিয়া মৃত্যের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর দেখেছি আমি;/ অন্ধকার রাতে অন্ধেরের চুড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিবির-ভেজা চোখের মতো/তলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা;/জোস্নারাতে বেবিলনের রানীর ঘাডের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার/শালের মতো ঝপঝপ্লিা বিশাল আকাশ!/কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিলো।’ (হাওয়ার রাত, বনলতা সেন)
‘হাওয়ার রাত’ কবিতাটি আমার কাছে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরাবাস্তব কবিতা বলে মনে হয়েছে। এই কবিতার ব্যাপ্তি ও গভীর উজ্জ্বল শব্দসংস্কারের সংকেতময় আবহ কোনো কবিতা-পাঠককে নিয়ে যায় অনেক দূরের শুনো, এ যেন এক মহান দ্রষ্টার তৃতীয় নয়নের অবিরাম ছুটে চলা আকাশ-নক্ষত্রের বারান্দায় বারান্দায়। বোধের কোনো পরিসীমায় পৌঁছলে এ রকম কবিতা লেখা সম্ভব, তা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। আকাশ ও পৃথিবী তাঁর কবিতার বিস্তৃত দুনিয়ায় এমন এক ছায়া ফেলে আছে যে আমরা কখনোই এই ছায়ার কুহকী অবয়ব ছেড়ে তাঁর কবিতার কোনো দরজা খুঁজে পাব না।
দীপ্তি ত্রিপাঠী লিখেছেন, ‘এক বিমুঢ় যুগের বিভ্রান্ত কবি জীবনানন্দ। পৌষের চন্দ্রালোকিত মধ্যরাত্রির প্রকৃতির মতো তাঁর কাব্য কুহেলীকুহকে আচ্ছন্ন। স্বাভাবিক অলংকার ও বাক্-প্রয়োগের দেশজ রীতির মিলনে সৃষ্ট তাঁর আপাতসুযোগতার অন্তরালে এক দুর্গেয় রহস্য বিরাজিত। বলতে কি, আধুনিক কবিদের মধ্যে একমাত্র তাঁর কাব্যেী এ-যুগসংশয়ী মানবাত্মার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয়টি ফুটে উঠেছে।…সাতোর অহচনায় তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গিত কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে তিনি লাভ করেননি।…কিন্তু জীবনানন্দের অন্তর্লোকে যে-সদ্বন্দহন চলেছে তার ওপরানো বিষ তাঁকেই পান করে নীলকণ্ঠ হতে হয়েছে। এজন্য তাঁর কাব্যে ট্রাজিক মহিমা এত বেশি মর্মভেদী।’ (আধুনিক বাংলা কাব্যপরিচয়, পৃষ্ঠা-১১৭)
অনুভূতির গভীরতা থেকে কিংবা অবচেতনতের দেশ থেকে আলো না এলে কবিতা হয় না। আমরা জীবনানন্দ দাশ থেকে পাই: ‘মানুষের ভাষা তবু অনুভূতির দেশ থেকে আলো/না এলে নিধক ক্রিয়া; বিশেষণ: এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল’। ব্যাপারটির এক অভিনব বিন্যাস, স্বপ্নের স্বাভাবিক প্রীতিরিষ্ক ব্যবহার ও স্বরচন্দ্রে চলনের কারিশমা জীবনানন্দ দাশ অবিরাম কসরতেই আয়ত্ত করেছিলেন।
‘আমলকি গাছ ছায়ে তিনটি শালিথ/কার্তিকের রোদে আর জলে/আমারি হৃদয় দিয়ে ডেনা তিন নারীর মতন/সূর্য? নাকি সূর্যের চপ্পলে/পা গলিয়ে পৃথিবীতে এসে/পৃথিবীর থেকে উড়ে যায়/এ জীবনে আমি তের শালিথ দেখেছি/তবু সেই তিনজন শালিথ কোথায়?’ (কার্তিকের ভোরেরবেলা)
অলোকঞ্জন দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘ভাষার এই অকৃতোদঢ় ব্যবহার, এই অনায়াস সংস্করণ, বাংলা কবিতায় এর আগে কিংবা পরে হয়েছে কি না, সেই মর্মে সবিনয়ত সন্দেহ প্রকাশ করা যায়।’ (জীবনানন্দ)
জীবনানন্দজ ‘সাতটি তারার তিমির’ গ্রন্থে ‘রাত্রি’ নামের যে কবিতাটি রয়েছে, সেই কবিতায় যেসব শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন, তা ছিল অনেকের মতে অকালবিক। বিশেষ করে প্রগতিশীল গোষ্ঠীর যারা তাঁর বিরুদ্ধে সরস্ব ছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ এই কবিতার শব্দ ব্যবহার নিয়ে চরম আপত্তি তুলেছিলেন। এই আপত্তির কারণ ছিল এই যে সে সময় এ রকম শব্দ তিনি ছাড়া আর কেউ ব্যবহারের সাহস দেখানি এবং কবিতা-পাঠকরা, এমনকি কোনো কোনো কবিও এ রকম কবিতা ব্যবহার করা যায়, তা ভাবতেতেও পারেননি। এলিটিয়ার নগর-সসভ্যতার ফাঁপা-অন্তঃসারশূন্যতা, যৌনতা, পাপ, কদর্যতা—যেগুলো বোলোয়েরিয়ার জগতের প্রতিফলনও বটে, তার কবিতায় দেখা যায়। কলকাতার নাগরিক জীবনের বিচিত্র, বিষয় কিছুটা পরাবাস্তব দৃশ্যের প্রতিফলন দেখি ‘রাত্রি’ কবিতায়।
‘হাইড্যান্ট খুলে দিয়ে কুন্ঠরোগী চেটে নেয় জল;
অথবা সে হাইড্যান্ট হয়তো বা গিয়েছিস ফেঁসে।
এখন দুপুর রাত নগরীতে দোল বেধে নামে
একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে
অস্থির পেট্রোল খেড়ে;’
(রাত্রি, সাতটি তারার তিমির)
মৃগাঙ্ক রায় এই কবিতার সমালোচনায় সে সময় লিখেছিলেন, ‘এই রবীন্দ্রোত্তর যুগের পাঠক এর প্রতিটি ছাদে হোঁচট খেতে বাধ্য। চেটে নেয় জল, ফেঁসে, গাড়ল, পেট্রোল খেড়ে ইত্যাদি শব্দের কোনো কাব্য পরিমণ্ডল আজও এদেশে গড়ে ওঠেনি। জীবনের কোনো মূল আবেগের সঙ্গে এসব শব্দ যুক্ত হতে পারেনি।’ (নতুন সাহিত্য, ভাষা ১৯৬০)
উল্লেখ্য, সে সময় প্রগতিশীল লেখক বলে যাঁরা নিজেদের মনে করতেন, তাঁদের মধ্যে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মৃগাঙ্ক রায় ও ধনী ভৌমিক জীবনানন্দ দাপের কবিতার কটূ সমালোচনা করেন; যদিও পরে তাঁরা তাঁদের সেইসব আক্রমণাত্মক ভূমিকা থেকে সরে এসেছিলেন। মুখের ভাষা ও কাব্যের ভাষার পার্থক্য ঘুটিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জীবনানন্দের দাগের অবদান অনন্যসাধারণ। এ ক্ষেত্রে অবশ্য আমাদের ওয়ার্ডসওয়ার্থের কথা মনে আসে। জীবনানন্দ দাশ সাড়-চালিতের মিশ্রণেও কাব্যের শরীর গড়েছেন এবং যা নিয়ে শরদকুমার মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই প্রথমে মেনে না নিলেও পরে যে তা তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, সে কথা স্বীকার করেছেন। দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন, ‘বলা বাহুল্য, আধুনিক কবিদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুখের ভাষা এবং কাব্যের ভাষার ব্যবধান বিলোপ। মৌখিক ভাষার ইতিবৃত্ত অর্থাত্ বিশিষ্ট দেশজ রীতি ব্যবহারকে কবিতাকে স্বাভাবিক ও সহজ করে তোলার প্রচেষ্টা তাঁরা সকলেই করেছেন। তবে জীবনানন্দের মতো এমন স্বচ্ছদ ও প্রখর ব্যবহার আর কেউ করতে পারেননি।’ (আধুনিক বাংলা কাব্য পরিচয়, ২০৩)
কবিকে সংগ্রাম করে যেতে হয়। আজীবন। সেই সংগ্রাম অবশ্যই বহুপ্রতীক ও বহুবহুরিক—জীবনের অনেক অনেক না-পাওয়ার মধ্যে সেই সংগ্রাম যেমন গ্রথিত, তেমনি সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রকল্পের মধ্যেও যার রয়েছে সাহসিক বিস্তৃতি। তবে কবির এই সংগ্রাম মূলত কবিতার জন্য সংগ্রাম। একটি ভালো কবিতা লেখার জন্য কবিকে যে সংগ্রাম করতে হয়, তা কবি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। প্রস্তুত কবি সব সময় কবিতার মধ্যে থাকেন, এমনকি তিনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন, তখনো। জীবনানন্দ দাশ যখন ট্রামের তলে চাপা পড়েছিলেন, তখনো তিনি কবিতার মধ্যেই ছিলেন। বাংলা ভাষার এই একমাত্র কবি, যিনি কবিতার নিয়ম প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর নিজে যায় বাংলা আধুনিক কবিতার এই প্রোজ্জ্বল শিখাটি।