নিতাইচন্দ্র সেনের সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে শশীকান্ত পাল।
‘নিতাই দাপুটে লোক। জমিদারের শেষ উত্তরাধিকার তাকেই বলা যায়। বাপের সূত্রে জমিদারির এক-আটটু ঘ মাখন তার পাতে জুটেছে। আর তার বরাতে সে মোটামুটি পাড়া দাপিয়ে বেড়ায়। এ পাড়ায় শশির ভাগ্যে নিচু বংশের হীনপ্রভা বাস করে। ফলে নিতাইয়ের কাছে তারা যেন বসদবধ ভূতা। পাশের গ্রামের মুসলিমদের সাথেও নিতাইয়ের গলাগল্লি সম্পর্ক। পলিতির তার ভালো জানা। চেয়ারম্যান-মেথরদের খুশি রেখে চলে। শশীকান্ত পাল পাশের গ্রামের গুনি ভাস্কর। নিতাই যখন এ বছর দুর্গাপূজার মানত করল, মঠ তৈরির দায়িত্ব শশীকান্তকে দিতে একটু ভাবতে হয়নি। শশীকান্তের আনন্দের সীমা রইল না। এলাইটে শশীকান্তের হাত এখন আর আগের মতো চলে না। বয়স হয়েছে। তার ওপর চোথে ছানি পড়েছে। অপারেশন করানো দরকার। পেরে উঠছে না। আর এসব তার বয়স যায়। যদিও চোখের ছানি ফেলে দেওয়া এবোবরই মামুলি ব্যাপার, কিন্তু শশীকান্তের মনে হয় বড কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
তবে মূর্তি বানাতে শুরু করলে শশীকান্তের চোখের এইসব অসুবিধাযুক্ত কোনো ব্যাপার হয়ে ওঠে না। তার অন্তর-চক্ষু খুলে যায়। সব সূক্ষ্ম দেখতে শুরু করে। দেবীর দেহের ভাজ, রেখা, শক্তি, মায়া সব সে টের পায় ভেতর থেকে। দেবীর সেই বীরতূপূর্ণ মৃদু হাসি, তা শশীকান্ত মূর্ততো আঁকতে পারে, এমন কারিগর দশ গ্রামে নাই। লোকে ও বেশ তারিফ করে তার। একবার গ্রামের সিনেমাপাগেল হেল্টা, কী নাম যেন, ও হ্যালো, রাজকুমার, বল্লে, দেবীর মুখ নাকি গোছের খেয়া ম্যাপিনী। সে মোবাইলে তার ছবি দেখেছিল। মিলেন গিয়েছিল বেশ। মূর্তির আসল কাজ কাঠামোতে। বাঁশ কাঠ ধরে পটল্লা যে কাঠামো তৈরি হবে তার ওপরই তো মেদ-মাতা পড়বে। মানুষের দেহেদ সাথে তার কোনো তফাত নেই। শশীকান্ত কাজের ব্যাপারে একদম নিখুঁত। কোথাও কোনো খাস রাখবে না। মূর্তির যে কাদামাটি জোগাড় করবে, তাও যেই সেইভাবে না। দফাদার হাতে নিয়ে প্রবন্ধ করে, গুণাঘুন বিচার করে তারপর কাজে লাগাতে। দেবীর হাত পা আঙুল নখ সবকিছু এত সূক্ষ্মভাবে সে এঁকে তোলে, যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে শশীকান্ত জানে সবকিছুর পর আসল মায়ান্না হলো দেবীর চোখ আঁকা। সেই চোখে থাকফে অসূন্দরমনের সূক্ষ্ম হাসি। জগতের সবকল অপশক্তিকে পরাভূত করার যে দিব্যজ্যোতি আনন্দ, হত্যার মায়া দিয়ে দৃষ্টিকে মুক্তি দেবার যে গভীর আনন্দের রেখা, তা যদি ফুটিয়ে তুলতে না পারো তাহলে কিসের শিল্পী তুমি! এ কথা তাকে বলেছিল তার গুরু অরুণপালও। মানুষটা মূর্তি বানাতে বানাতে মারা গেল। পূজার দশ কি এরানো দিন আগের কথা। শশীকান্ত মাঝরাতে মূর্তি বানানোর কাজে শুরুকে সঙ্গ দিতে দিতে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ চোখ খেয়া কী যেন আওয়াজ শুনতে পায়! সে চোখে মেলে দেখে অরুণপাল কাচা কাদামাটির নড়চড়ে দেবীমূর্তির পায়ে লুটিয়ে পড়েপাচ্ছে। শশীকান্ত তাকে ধরতে যাবে, এর মধ্যেই সব শেষ। আহা বড়ো পলের মরণ! দেবীর পায়েই কাজে প্রাণত্যাগ!
খানিক দুলেই পূজামণ্ডপে ছাকের বাদা বেজে চলেছে। বাড়ির লোকজনের ফুর্তি শেষ নেই। মষ্টিপূজার দিন থেকেই বায়না পাটি জোগাড় করে ফেলেছে। কিন্তু খানাটো তারা এখনও জানতে পারেনি। ছালকে নিষ্কল তাদের সব আনন্দ গহ্বরে খেয়ে যেত। নিতাই সূক্ষ্ম কুত্রির লোক। খুব ঠিক চোখ। ধানের কোন গোছায় পোকা ধরেছে দূর থেকেই জমির দিকে তাকিয়ে সে বলে দিতে পারে। ব্যাপারটা কেবল তার চোখে পড়েছে। এরপর থেকে নিতাই আর ঠিক থাকতে পারেনি। ব্যাপারটা প্রথম যখন তার চোখে পড়ে, সে ভেবেছিল তার সেবার ভুল। কিন্তু পরে বার কাছে গিয়ে আবার দূরে এসে নানান দুপুরে দাঁড়িয়ে সে দেবীমূর্তির দিকে তাকিয়েছে। না, তার দেখার ভুল হতেই পারে না। সে অনাদের লক্ষ করেছে তারাও কিছু দেখতে পাচ্ছে কিনা। কিন্তু তাদের দেখে মনে হলো না তারা কিছু দেখতে পেয়েছে। বুকটা ছ্য্যাৎ করে ওঠে নিতাইয়েরেই। কিন্তু পুজা শুরু হয়ে খাচ্ছে, এর মধ্যে ব্যাপারটা জানাজানি হলে বা অনবরা ব্যাপারটি লক্ষ করে ফেললে হুনকুল লেগে যাবে। তার চাইতে চেপে যাওয়াই ভালো। কিন্তু তার মতো আর কেউ এই ব্যাপারটা খেয়াল করবে না, তাও তো না। একটা সংখ্যা পড়ে যায় নিতাই। ফোভও তার কম নয়। কেন এমন হলো!
এবারেই আশ্বিন মাস পুজোর মাসের মতো না। মনে হয় ভাদরের আছড পরে আছে তার ওপর। প্রচণ্ড গরম। বৃষ্টি নামতে পারে। কে যেন নোট হোটে বলেছিল পূজায় এবার বৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা। নিতাই এবিতে অন্য গমঘটে নেমে যায়। আজ বেশি থামছে। পাঞ্জাবিটা ভিজে চ্যাবচকে। পূজার মণ্ডপ ফেলে সে যে এখানে নির্জনে শশীকান্তের সাথে বসেছে, গাঁয়ের লোক দেখলে মহাকাহিনি বানাবে। যাওয়া গেছে অবশ্য অংশ নিচ্ছে চর ছোট ভাই কানাই। নিতাইকে লোকেদের সাথে সৌজন্য রক্ষা করতে হবে। তার কিছু মানী লোক আসে শহর থেকে। তাদেরকে সময দিতে হবে। এজন্য পূজার কুত্তা কর্মের দাদাসাহিত্য ছোট ভাই কনাকীরের ওপর পড়েছে। ঠাকাপাসা থেকে শুরু করে অন্যান্য সামাজিকতার দায়িত্ব নিতাইয়ের। আকাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে কালো মেঘ জমেছে। লঙ্ঘন সুবিধার না। অবশ্য বড় করে প্যান্ডেল বাধা হয়েছে। পুরোটি টিনের ছাউনি। তার ওপর আবার রঙিন কাপড়ের চাঁদোয়া। কিন্তু বৃষ্টি হলে লোকজন কমবে। আহা, প্রসাদের এত আয়োজন করে কে?
নিতাই আগ্রহের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শশীকান্ত চুপচাপ তার পায়ের কাছে, খানিক দূরে বসে আছে। এখনও সে নিতাইয়ের কথার গ্রহণযোগ্য কোনো উত্তর দিতে পারেনি। সে নিতোতে বোনাতো চেষ্টা করেছে এটি তার চোখের দেখার ভুল। তার মনে কোনো কারণে একটা বিক্ষিপ্ততা চলেছে, যার কারণে এমনটা মনে হতো। নিতাই রাগী চোখে তার দিকে তাকালে শশি মাথা নিচু করে চুপ ধরে থাকে।তুমি কি কাওটা অনিচ্ছায় নিয়েছিলে শশি?
কোনোটা দাদাবাবু?
আমার পূজার মঠ তৈরির কাজটা?
ছি ছি, এমন বলছেন কেন?
তোমার মেয়ে নাকি আপসি করেছিলে?
শশীকান্ত একটু চমকে ওঠে। একবার থুক থুকে কাশে।
মায়ের কাজে অমত করলে কোন পালি, দাদাবাবু! ওসব লোকের মনগড়া আলাপ। তোমায় মেয়েকে তো মণ্ডপে একবারও দেখলাম না।
মেয়েটার যেন কী হয়েছে দাদাবাবু! চুপচাপ থাকে। মা মারা মেয়ে, বেশি খাটতে পারে না।
নিতাই পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা পানখিলি বের করে মুখে পুরে নেয়। শশির দিকে ছোয়াল মতো করে তার পাশে পানের পিক ফেলে দেয়।ওকে পুজোয় আসতে বলো। মনের যত কালি আছে ধেদ আছে মা সব দূরে করে দেব। মায়ের নাম বিপদতারিণী।
আজ্রে দাদাবাবু। তা কি আর বলতে!
এখন বলো যেন এমনটা হলো, শশি?
শশি অসহায় তাকিয়ে থাকে।
তুমি গুণী শিল্পী। তোমার তৈরি মূর্তির গুণগান করে দশ গাঁয়ের লোক। এ রকম বলে তবে!
আমি সত্যিই আপনার কথা বুঝতে পারি না দাদাবাবু! আপনি নিশ্চয় কোথাও ভুল করছেন। ভুল দেখছেন!
চোখে তোমার ছানি পড়লেও আমার পড়েনি শশীকান্ত। শোনো, তোমাকে আজ সন্ধ্যা অব্দি সময় দিচ্ছি। ব্যাপারটা আর চোখে চোহে পড়ার আগে তুমি ঠিক করে নিও।
পূজা তো শুরু হয়ে গেছে। মূর্তির ভেতর দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে দাদাবাবু। এখন সে তো আর মূর্তি নেই। ওখানে হাত দিতে যাবে কার সাধ্য!
নিতাই ত্রুল চোখে শশীকান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। দাঁতে দাঁত ঘষে রাগা জমাতে চেষ্টা করে।
পুজোয় ঢাক-বালা ছ্য-হুল্লা গান আরতি সব দূরে রেখে ধীর ধীরে নিজের বাড়ির কাছে আসে শশীকান্ত। তখন গোধূলির আলো ক্ষণবিদ্যায় ঘরের চারপাশ সাজিয়ে তুলেছে। শশীকান্তের মেয়ে অঞ্জলি দাওয়ায় বসে আছে চুপচাপ। গত তিনটে মাস মেয়েটাকে প্রায় এমনভাবেই দেখেছে শশীকান্ত। কিন্তু পুজো শুরু হয়ে যাবার পর, চারদিকে যখন মায়ের আগমনের আনন্দে সবাই মাতোয়ারা, তখনো তার এমন রূপ শশির মনটা দুমুড়ে মুচড়ে দেয়।মাস তিনেক আগে একদিন সন্ধ্যার আগে আগে ঠিক যেন এমনটাই সময় মেয়েটা প্রাণপণে বাড়িদি দিকে ছুটে এসেছিল। শশি উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাপড়গুলো ঘরে নিতে যাচ্ছি। ঠিক এমন সময়! মেয়েটার পরনের শাড়ি, চুলুল এলোমেলো। চোখেমুখে ভয়, বিস্ময়! এসেই বাড়ির ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। শশি বাইরে থেকে তার কান্না শুনতে পেয়েছিল। মেয়েটার তখন সামনে পরিধান। ফরম ফিলপারের বেশ কিছু ট্যাকা দরকার। শশির পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। অঞ্জলির মারের হাতের দুইখানা বালা ছিল। নিতাইচন্দ্র নিজেই বলেছিল বালা দুটো নিয়ে যেতে। নিতাই সোনার কারবার করে। সবাই জানে। সেখানে সেদিন কী হয়েছে কিছুই জানতে পারল না শশি। দরজার বাইরে থেকে মেয়েটাকে সে বারবার জিজ্ঞেস করছো, মা গো, কী হয়েছে মা! দরজা বন্ধ বরোচ্ছিস কেন? খুল মা! মা গো!
মেয়ে তার মুখ থেকে কথা বের করতে পারছিল না। তার সব কথা যেন বুক চেরা আর্তনাদ গ্রাস করে ফেলেছিল। এরকম সব-ত্রাসিয়ে-দেওয়া কান্নাকেনোদিন মেয়েটাকে কাঁদতে দেখেনি শশি। এমনকি ওর মা যখন মারা যায় তখনও না। মেয়ে তার এতটা নরম নয়। পাড়াপড়শি বলেছিল, মা অঞ্জলি, জনে জনে জড়িয়ে একটু কাঁদো মা। মায়ের জন্য এভাবে কাঁদতে হয। অঞ্জলি পারেনি। তার চোখ ভরা উন। কিন্তু কান্নার কোনো আওয়াজ নেই।
চোখে বাপের প্রতি পুষে রাখা অভিযোগ নিয়ে দাওয়ায় ঠায় বসে ছিল অঞ্জলি। শশি গিয়ে তার পাশে বসে। আঙ্গুলের চোখে ভীষণ উদাসীনতা। অন্যদিকে চোখ পেয়োয়।
পুজোয় দিন এভাবে বসে থাকতে নেই মা।
আঞ্জলি কিছু বলে না।
যা সাজসজ্জার করে মণ্ডপে বেরিয়ে আয়। নিতাই তোকে যেতে বলেছে।
অঞ্জলি পায়ের আঙুলের নখে মাটি খুঁটে চলে।
শশীকান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
লোকাতকে তো চিনি! কোথাকার জল কোথা নিয়ে ছেড়ে দেয় কে জানে!
বাপের কথা শুনে অঞ্জলি প্রশ্নাত্মক তাকায়।
দেবীর চোখে নাকি হাসি নেই, দেবীর চোখে জল! আজব কথা! চোখে তার মশের ঘোর লেগে আছে।
আশ্চর্য অবাক! শশীকান্ত তাকে পুরো বুঝতে খুলে বলে।
ঘটনাটা বলতে বলতে শশীকান্ত থমকে আফসোসও করে।
মাথায় যার এর রকম আজব পাকা ঢুকে যায়, তার কি আর পূজা হয় মা? লোকটার জেনা মায়া হয়। মালিকর হিসেবে সে আমারে ভালো টাকাই দিয়েছিল। কিন্তু…
বাপের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অঞ্জলির বিস্ময় চোখে অদ্ভুত এক হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সে হাসির আবেশ জীর্ণ কুটিরের চারপাশ শঙ্খধ্বনিতে ঝলমল করে ওঠে। সামান্ন এই কালিরাতের বাড়িড আঙিনা জুড়ে আকেক বাজার ঢাক বাদা মনে বাজাতে শুরু করল। ঘুমোতে যাওয়া পাখিরাও যেন শিস দিয়ে উঠছে গাছে গাছে। মুখ কালো করে আকাশটাও শর্মায়ে শঙ্খ শাড়ি পরে নিয়েছে।
মেয়ে অঞ্জলির চোখে এখন যে হাসির রেখা, তার ভেতর যেন সূক্ষ্ম এক প্রতিশ্রুতির আগুন জ্বলকাছে। শশীকান্ত তার অর্থ ঠিক বুঝতে পারে না।
অঞ্জলি সহসা উঠে দাঁড়ায়। শশীকান্ত ঘরের দিকে টুটে যায়। একটু পরেই ঘরের ভেতর নূপুর-চূড়ির কনকনানি শোনা যায়। মেয়েটা কি পুজোয় যাবার জন্য সাজগোজ করতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পর লাল এক শাড়ি পরে অঞ্জলি বের হয়ে আসে। দাওয়ায় বস যায় পরে। তার হাতে আলতার শিশি। গুনগুনিতে গান করতে করতে পায়ে রঙের নকশা আঁকতে শুরু করে মেজেতে। তার দুই পায়ে যেন আলতা নয়, দেবীর করুণাখানা গোধূলির রং আছড়ে পড়েছে। কী সুন্দর লাগছে দেখতে!