শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

শিক্ষিত তরুণের হাতে সনদ, সামনে অনিশ্চয়তা

Advertisement

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংকটকে কেবল কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে দিয়ে বোঝা যাবে না। এটি একটি পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ, একজন তরুণের আত্মমর্যাদার লড়াই এবং একটি দেশের উন্নয়ন-প্রতিরশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানের গল্প। তুলনায় বিকৃত হয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষা এখন আর কেবল একটি বিশেষ শ্রেণির নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষার এই বিস্তারের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার গুণমান এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সমন্বয় কতটা ঘটে গেছে, সেই প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের চূড়ান্ত শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে স্নাতক বা তার চেয়ে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এই জনগোষ্ঠীর বেকারের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ—সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে জাতীয় বেকারের হার ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না; বরং শিক্ষিত তরুণদের জন্য চাকরির বাজারে প্রবেশের পথ অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা। বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা কী শিখছেন, আর নিয়োগকর্তারা কী ধরনের দক্ষতা খুঁজছেন, এর তিনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ দুর্বল। অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর তৃতীয় বিষয় মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো করেন, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান, দলগতভাবে কাজ করা, তথ্য বিশ্লেষণ, যোগাযোগ কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান সীমিতভাবে। কর্মজীবনে প্রবেশের পর তারা বুঝতে পারেন, সনদ তাদের দরজা পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করার প্রস্তুতি যথেষ্ট হয়নি।

এ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকরির পরীক্ষার দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতা। সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আকর্ষণের পেছনে শুধু সামাজিক মর্যাদা নয়, রয়েছে নিয়মিত বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তুলনামূলক নিশ্চয়তার আকাঙ্ক্ষা। বেসরকারি খাতে অনিশ্চিত চাকরি, সীমিত বেতন, পদোন্নতির অস্পষ্ট পথ এবং কর্মঘণ্টার চাপ অনেককে সরকারি চাকরির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে একটি পদের বিপরীতে হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ে।

চাকরির পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কর্মসংস্থানের সংকটের সমাধান কেবল নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতি বদলে সম্ভব নয়। সরকারি পদ সীমিত; রাষ্ট্রের পক্ষে সব শিক্ষিত তরুণকে সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। সমস্যা হলো, সরকারি চাকরির বাইরে সম্মানজনক, স্থিতিশীল ও সম্ভাবনাময় কাজের ক্ষেত্র যথেষ্ট বিস্তৃত হচ্ছে না। ফলে তরুণদের কাছে একটি চাকরি শুধু পেশা থাকে না, হয়ে ওঠে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের একমাত্র পথ। যে সমাজে উদ্যোক্তা হওয়া, কারিগরি কাজ কিংবা নতুন পেশায় প্রবেশকে সমান মর্যাদায় দেখা হয় না, সেখানে চাকরির প্রতিযোগিতাও আরও সংকীর্ণ ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ও কাজের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে নতুন কাজ যুক্ত হয়েছিল ৮৭ লাখের মতো। একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ২০২৩ সালে ছিল ১৪ শতাংশ। উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না বাড়লে জনসংখ্যার এই তরুণ অংশ দেশের শক্তি হওয়ার বদলে হতাশার উৎসে পরিণত হতে পারে।

শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কিছু নতুন বিষয় যোগ করলেই চলবে না; শিক্ষার উদ্দেশ্য ও কর্মসংস্থান নীতিকে একসাথে দেখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও হতে হবে আরও কার্যকর। শুধু আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর কিংবা সেমিনারের আয়োজন নয়, শিক্ষার্থীদের ইন্টারশিপ, শিক্ষানবিশি, বাস্তব প্রকল্পে অংশগ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে হাতেকলমে শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো জরুরি। সমাজের এখনো অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিসিএস কর্মকর্তা কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী হওয়াকে বোঝে। অথচ দক্ষ বৈদ্যুতিক কারিগর, যন্ত্র প্রকৌশলী, কৃষি প্রযুক্তিবিদ, স্বাস্থ্যসেবা সহকারী, লজিস্টিকস কর্মী কিংবা দক্ষ ডিজিটাল সেবাদাতারা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কাজের মর্যাদা নির্ধারিত হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা ও সামাজিক অবদান দিয়ে, শুধু পদবি দিয়ে নয়। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাদের নতুন কাজ সৃষ্টির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে। নতুন ব্যবসা শুরু করতে ঋণ, পরামর্শ, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ দরকার। শুধু ঋণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; ব্যবসা পরিচালনা, হিসাবরক্ষণ, পণ্য বিপণন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা দিতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, স্থানীয় সেবা এবং ডিজিটাল ব্যবসার বিকাশ ঘটানো গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে থাকবে না। এক্ষেত্রে নারীরদের কর্মসংস্থানের বাধাগুসোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নিরাপদ যাতায়াত, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধ, শিশুকরের সুবিধা এবং বৈষম্যহীন নিয়োগ নিশ্চিত না হলে শিক্ষিত নারীদের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারের বাইরে থেকে যাবেন।

আরেকটি বিষয় উপেক্ষা করা চলে না। চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণদের মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত দুর্বলতা বলে উড়িয়ে দিই। অথচ দীর্ঘদিন বেকার থাকা, পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এবং বন্ধুদের সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনা করা একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের সামনে এখনো তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। কাজের বাজারের চাহিদা বুঝে শিক্ষা, বিনিয়োগ ও শিল্পনীতির সমন্বয় না ঘটলে এই সম্ভাবনা ধীরে ধীরে চাপ হয়ে উঠবে।

যে তরুণ আজ চাকরির বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায় দিন গুনছেন, তিনি কেবল একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নন; তিনি দেশের ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও নাগরিক। তার সময়, মেধা ও সম্ভাবনাকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় আটকে রাখা উন্নয়নের কোনো সাফল্য হতে পারে না। সনদের সংখ্যা বাড়ানো সহজ; সনদের মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। সেই কঠিন কাজটি এখন রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

এ বিভাগের আরও সংবাদ