শিরোনাম
Advertisement
শিক্ষাঙ্গন

আইএমইডির প্রতিবেদন

শিশুদের জন্য আনন্দময় হয়নি ‘আনন্দ স্কুল’, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

Advertisement

কখনও স্কুলে যায়নি কিংবা আর্থিক অনটনে স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে– এমন শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আলোয় ফেরাতে দ্বিতীয়বার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ ছিল সরকারের। নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থায় ‘আনন্দ স্কুল’-এর মাধ্যমে এসব শিশুর ফেরা নিশ্চিত করার কথা ছিল। তবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আনন্দ স্কুল আসলে শিশুদের জন্য ‘আনন্দময়’ হয়নি। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পে উপকারভোগী বাছাইয়ে অনিয়ম হয়েছে। তালিকায় এমন অনেক শিশুর নাম রাখা হয়েছে, যারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আবার প্রকল্প প্রস্তাবে না থাকলেও শতাধিক কর্মকর্তা বিদেশ সফর করেছেন।

রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (দ্বিতীয় পর্যায়) নামে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রভাব, দুর্নীতি ও অনিয়ম পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। গত এপ্রিল মাসে সরেজমিন পরিদর্শন, প্রকল্পের দলিল এবং ২০ জেলার ৬০ উপজেলার সুবিধাভোগীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে হাউস অব কনসালট্যান্টস প্রাইভেট লিমিটেড (এইচসিএল) আইএমইডির পক্ষে কাজ করেছে। তিন দফা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পর রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২১ সালে। এর মূল কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালে। এক হাজার ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যন্ত এক হাজার ৩১৩ কোটি টাকায় এসে ঠেকে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই বিদেশি ঋণ। এক হাজার ২৫৫ কোটি টাকার কিছু বেশি ঋণ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মাত্র ৫৮ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব জোগান থেকে দেওয়া হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রকল্প সমাপ্তির পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্তির প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা না হওয়া প্রশাসনিক জাবাবদিহি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বলে উল্লেখ করেছে আইএমইডি। আইএমইডির মূল্যায়ন বিষয়ে জানতে চাইলে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মহাপরিচালক মনোয়ার ইশরাত বলেন, ‘বিষয়টি তাঁর জানা নেই। আইএমইডির প্রতিবেদন তিনি দেখেননি।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ব্যাধির পর্যায়ে চলে গেছে। এ খাত নিয়ে লুটপাটকে বাণিজ্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শিশুদের স্কুলে ফেরানোর প্রকল্পটি এর বড় উদাহরণ। অভাব-অনটনে থাকা দরিদ্র পরিবারের শিক্ষাবঞ্চিত শিশু ও দরিদ্র বয়স্করা প্রকল্পটি থেকে সুবিধা পায়নি। ভোগবিলাস ও বিদেশ ভ্রমণে প্রকল্পটি ভোগ করেছে একটি অসাধু চক্র।

অনানুষ্ঠানিক পাঠদানে কর্মকর্তাদের কেন বিদেশ সফর করতে হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, সরকারের উচিত এই প্রতিবেদনকে ভিত্তি ধরে তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়, দেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ঘটলেও বিদ্যালয়বহির্ভূত, ঝরে পড়া, দরিদ্র, প্রান্তিক, শহরের বস্তি ও দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তকরণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় শিশুদের পুনরায় প্রাথমিক শিক্ষার আলোয় আনতে নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘আনন্দ স্কুল’ বা শিখন কেন্দ্রের মাধ্যমে সহজ ও মানানসই শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করা ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

প্রকল্পে গ্রামীণ শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত লাখ ২০ হাজার শিশুকে কার্যক্রমে নিয়ে আসা। তবে তিন দফা বর্ধিত মেয়াদ সত্ত্বেও ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৬ শিশুকে প্রকল্পভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ৩২ হাজার ৪৪৪ শিশুই প্রকল্পভুক্ত হয়নি। গ্রামে শিখন কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার ৬৩২টি। বাস্তবে হয়েছে ২০ হাজার ২৩৯টি। এক হাজার ৩৯৩টি কেন্দ্রই স্থাপন করা হয়নি। রোহিঙ্গা শিশুদের ক্ষেত্রে এক হাজার ৫০০ শিখন কেন্দ্রের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে এক হাজার ৩৩১টি। রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৫০ হাজার। বাস্তবে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৪০০ জন। বিদ্যালয় সংস্কার ও শিক্ষক নিয়োগ কোনো ক্ষেত্রেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। লক্ষ্য অর্জন থেকে এত বেশি পেছনে থাকার কারণ হিসেবে মনিটরিং দুর্বলতার কথা বলা হয় প্রতিবেদেন। এ ছাড়া পাইলট প্রকল্প ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুর্বলতার কথা এসেছে। প্রকল্পে মোট পাঁচজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল হওয়ার কারণেও বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হয়।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লেখ না থাকলেও ১১৬ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। ১০ দিন করে অবস্থান করেছেন তারা। এই প্রশিক্ষণ কতটা পরিকল্পিত, প্রয়োজনভিত্তিক এবং প্রকল্পের চূড়ান্ত ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, তা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১৬ কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণ, কর্মকর্তা নির্বাচন পদ্ধতি এবং ব্যয়ের হিসাব স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া দেশে ফেরার পর তাদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী দক্ষতা মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষে প্রশিক্ষণের জ্ঞান কাজে লাগানো কিংবা ফলোআপ সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত দেয়নি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এ কারণে বিদেশ সফরের গুণগত ফলাফল নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে একটি গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রকৃত বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশুদের প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা। কিন্তু কোনো কোনো আনন্দ স্কুলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং বয়সসীমা বা ভর্তি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। এতে প্রকল্পের লক্ষ্যভিত্তিক অন্তর্ভুক্তি দুর্বল হয়েছে। অর্থাৎ, নকশাগতভাবে প্রকল্পটি দরিদ্র ও শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রাসঙ্গিক হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে উপকারভোগী যাচাই পদ্ধতি সব জায়গায় যথেষ্ট কার্যকরী ছিল না। উপবৃত্তি বা আর্থিক সহায়তার গড় পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৪২৬ টাকা। ৮৮ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত উপবৃত্তি পেয়েছে।

বিভিন্ন অর্থবছরে একাধিক আর্থিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন, রাজস্ব ক্ষতি এবং অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্প থেকে অন্য একটি প্রকল্পে এক কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রকল্পের অর্থ নির্দিষ্ট অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার বা স্থানান্তরের সুযোগ নেই। ব্যাংক সুদবাবদ অর্জিত ৫০ লাখ টাকা সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সোনালী ব্যাংকের পরিবর্তে কর্মচারীর মাধ্যমে ভ্যাট কর্তনের কারণে এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মনিটরিং অফিসারদের চুক্তির অতিরিক্ত বেতন দেওয়া হয়েছে। এতে ১৫ লাখ টাকা ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আউটসোর্সিং স্টাফদের চুক্তির অতিরিক্ত বেতন দেওয়ার কারণে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতি হয়। ভ্রমণ ভাতা বাবদ তিন লাখ টাকা কাল্পনিক ব্যয় এবং প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে ক্রয় পরামর্শক নিয়োগের কারণে ২০ লাখ টাকা অপব্যয়ের অডিট আপত্তি ওঠে।

সমীক্ষার ফলাফলের আলোকে আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রমকে আলাদা প্রকল্প না রেখে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে ‘দ্বিতীয় সুযোগ শিক্ষা কর্মসূচি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া পরিচয়পত্রভিত্তিক শিক্ষার্থী ডেটাবেজ করার পরামর্শ দিয়েছে। আইএমইডি বলেছে, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নির্বাচন এবং কর্মসংস্থান সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়মিত শিখন মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।

এ বিভাগের আরও সংবাদ