শিরোনাম
Advertisement
ক্যাম্পাসের ভেতরে

জাতীয় অর্থনীতির প্রতিবেদন

শিক্ষক সংকটে মান হারাচ্ছে উচ্চশিক্ষা

Advertisement

মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতি ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষকের মানদণ্ড ধরলে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী রয়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি। বাড়তি শিক্ষার্থী সামলানো ও অতিরিক্ত পাঠদানের চাপে গবেষণার সময় কমে যাচ্ছে শিক্ষকদের। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠদানপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা সাধারণত বছরে পাঁচ থেকে ছয়টি কোর্স পড়ান। অথচ শিক্ষকসংকটে বাংলাদেশে কোথাও কোথাও একজন শিক্ষককে বছরে ১০টি পর্যন্ত কোর্সের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এতে পাঠদান ও গবেষণা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে সেশনজটের শঙ্কা।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস ২০২৫’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪৩। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৪৩ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনুপাত ১:২২। সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে গড়ে প্রতি ৩২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একজন শিক্ষক।

শিক্ষকসংকটের একটি উদাহরণ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। সেখানে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ছয়জন। ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষকের ভাষ্য, কোর্সের সংখ্যা ও শিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রমের পরিধি বিবেচনায় প্রায় ৩৬ জন শিক্ষক প্রয়োজন। অল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে পাঠদান, পরীক্ষা ও গবেষণা তত্ত্বাবধানসহ সব কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষকসংকটে নিয়মিত পাঠদানের চাপ অনেক বেড়েছে। একজন শিক্ষককে বছরে সাত থেকে ১০টি পর্যন্ত কোর্সের দায়িত্ব নিতে হয়। এতে গবেষণা, ফল প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা দেওয়ার কাজ ব্যাহত হয়।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে সেমিস্টার শেষ না হওয়ায় শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে প্রবেশ করতে চান এমন শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরিস্থিতি বাড়তি অনিশ্চয়তার কারণ। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়াও অন্তত নয়টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটে শিক্ষকসংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সংকট নিরসনে নতুন পদ সৃষ্টির চাহিদা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিভাগগুলোর প্রকৃত চাহিদা ও সংকটের ধরন জানতে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। বিভাগগুলোর তথ্য পাওয়ার পর সামগ্রিক চাহিদা নিরূপণ করা হবে। এরপর যৌক্তিক চাহিদার ভিত্তিতে ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়েও সংকট প্রকট। সেখানে ১০ হাজার ১৪৫ শিক্ষার্থীর বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক ২১০ জন। তাদের মধ্যে ৬২ জন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে শিক্ষাছুটিতে আছেন। ফলে নিয়মিত পাঠদানে যুক্ত রয়েছেন ১৪৮ জন। এই হিসাবে পাঠদানে যুক্ত প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৬৯ জন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ২০৪ জন। সেই হিসাবে প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী প্রায় ৩৯ জন। শিক্ষকসংকটে সেখানে একজন শিক্ষককে বছরে আট থেকে ১০টি কোর্সের দায়িত্ব নিতে হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ৩৪ হাজার ৮৩১ জন এবং শিক্ষার্থী ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯৮২ জন। সামগ্রিক গড় অনুপাত দিয়ে অবশ্য বিভাগভিত্তিক সংকটের পুরো চিত্র বোঝা যায় না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানে যুক্ত শিক্ষকদের হিসাব সেই ব্যবধান তুলে ধরে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনেও শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে ৪৮টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১৩টি, বেসরকারি ৩৫টি।

ইউজিসির ওই প্রতিবেদনে দেশে ৫০টি সরকারি ও ১১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে ১৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপাত মানদণ্ড পূরণ করেনি। অন্যদিকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত ৯৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিতে এই মানদণ্ড বজায় ছিল না।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় জগন্নাথ, রাজশাহী, ইসলামী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কুমিল্লা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বেগম রোকেয়া, বরিশাল ও রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তালিকায় আরও রয়েছে প্রতিবেদনে উল্লিখিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নর্থ সাউথ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল, ইস্ট ওয়েস্ট, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ ৩৫টির অনুপাত ওই মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

উচ্চশিক্ষার অন্য স্তরেও শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে কলেজ পর্যায়ে সামগ্রিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩৪। উচ্চমাধ্যমিক কলেজে অনুপাত ১:১৪, ডিগ্রি পাস কলেজে ১:২১ এবং ডিগ্রি অনার্স কলেজে ১:৪২। মাস্টার্স কলেজে প্রতি ১১৪ শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একজন শিক্ষক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাস্টার্স কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৩২ জন এবং শিক্ষক ১৪ হাজার ৯২২ জন। ডিগ্রি অনার্স কলেজে ১৩ লাখ ২৯ হাজার ১০২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ৩১ হাজার ৯৪৬ জন।

সোসাইটি ফর এডুকেশনাল জাস্টিসের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও নতুন বিভাগগুলোতে শিক্ষকসংকট বেশি প্রকট। তবে কোথাও সংকট থাকলেও কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা রয়েছে। তাই নিয়োগ ও পদ বণ্টনে বিভাগভিত্তিক বাস্তব চাহিদা বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই সংকট কাটবে না; যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের প্রক্রিয়াও দ্রুত করা জরুরি। একটি বিভাগে কতটি কোর্স, কতটি শিক্ষাবর্ষ, কতজন শিক্ষার্থী এবং কী ধরনের গবেষণা কার্যক্রম রয়েছে এসব বিবেচনায় চাহিদা নির্ধারণ করতে হবে। সংকট প্রকট এমন বিভাগগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ কেবল পাঠদান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে গবেষণা করতে হয়, নতুন জ্ঞান তৈরি করতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করে দক্ষতা গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু শিক্ষক সংকটে একের পর এক ক্লাস নিতে গিয়ে গবেষণা, পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনার সময় কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীকে পাঠ্যবিষয় শেখানোর পাশাপাশি গবেষণাপত্র লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ ও নতুন জ্ঞান তৈরির পদ্ধতি শেখানোও শিক্ষকের দায়িত্ব। অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ থাকলে শিক্ষার্থীদের এসব দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগ কমে যায়। তাই সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত বাংলাদেশি শিক্ষকদের দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষক সংকটের প্রভাব শুধু ক্লাস কমে যাওয়া কিংবা পরীক্ষা পিছিয়ে পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দেওয়া এবং গবেষণার কাজে সময় দেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়। তাই শিক্ষার্থী সংখ্যার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পাঠদান ও গবেষণার কাজের পরিধি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক নিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে দুই দিন ধরে ফোন, এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। পরে তার একান্ত সহকারী সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বক্তব্য পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে তা পাওয়া যায়নি।

এ বিভাগের আরও সংবাদ