ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণায় শিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন জরুরি। দেশের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় গ্রাম বা শহরে কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত মনিটরিং মান অর্জিত হয়নি। যদিও ডিজিটাল পাঠদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশের শিক্ষক সমাজ সুপরিচিত। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা, শিক্ষক হাজিরা, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং শিখন ফল অর্জনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার মানোন্নয়ন এখন একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। প্রায়ই শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা মনিটরিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা উঠলেই বড় অঙ্কের বাজেট, প্রকল্প গ্রহণ, নতুন অবকাঠামো বা বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ের কথা সামনে আনলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখা যায় না। ফাইল চাপা দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে বিদ্যমান সম্পদ ও অবকাঠামো ব্যবহার করে, কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই একটি কঠোর ও যুগান্তকারী ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
দেশের শিক্ষা অবকাঠামোর বাস্তবতা হলো, দেশের প্রায় প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ এবং কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস রয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। আর যাদের নেই, খুব সামান্য ব্যয়ে তা দ্রুত তৈরি করতে বাধ্য করতে হবে। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন নেই এমন শিক্ষক খুব কমই আছেন। তাদের ফোন নম্বর রুটিনেই দেওয়া থাকবে। এই বিদ্যমান সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার এখনই সময়। এর প্রথম ধাপ হবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ রুটিন প্রকাশ করা। এ রুটিনে প্রতিটি ক্লাসের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নাম, বিষয় এবং ক্লাস শুরুর নিখুঁত সময় উল্লেখ থাকতে হবে। এই রুটিন যেন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ না থাকে, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নিশ্চিত করতে হবে।
এ ব্যবস্থার মূল শক্তি হবে এর কঠোর ও আপসহীন তদারকি প্রক্রিয়া। এটি কেন্দ্রীয়ভাবেই করতে হবে। মাঠপর্যায়ে দিলেই এর শিথিলতা দেখা যাবে। নানা দুর্নীতি ও অবহেলা দেখা দেবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), শিক্ষা বোর্ড কিংবা সুবিধামতো একটি ডেডিকেটেড ‘ডিজিটাল মনিটরিং সেল’ থেকে সরাসরি ভিডিওকলের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের ক্লাসগুলো তদারকি করা হবে। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই সম্পূর্ণ ‘রেনডম সিলেকশন’ বা দৈবচয়ন পদ্ধতিতে যে কোনো দিন, যে কোনো সময়, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কিংবা সরাসরি ক্লাসরুমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে ভিডিও কলে সংযোগ স্থাপন করা হবে।
এর জন্য কোনো বাড়তি বাজেট বা নতুন জনবলের প্রয়োজন নেই। শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অসংখ্য দায়িত্বশীল ও সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞ শিক্ষক/অধ্যাপক এবং শিক্ষার বিভিন্ন দপ্তরের এই কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে রুটিন-প্যানেল তৈরি করা হবে। তারা মাসে মাত্র একটি দিন এই ডেডিকেটেড মনিটরিং সেলে এসে দায়িত্ব পালন করবেন।
এবার আসা যাক, এর নিখুঁত গাণিতিক ও কার্যকর ছকে (এটি মডেল মাত্র)। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন ২০ জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা চার কর্মঘণ্টায় ২৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি ভিডিওকলের মাধ্যমে লাইভ তদারকি সম্পন্ন করতে পারবেন। এরপর এক ঘণ্টায় ডিজিটাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করবেন।
তাৎক্ষণিক ডিজিটাল সাবমিশন ও কর্মঘণ্টা শেষ: প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে (স্কুল-কলেজের মূল কর্মঘণ্টা) কমপক্ষে ২০ জন মনিটরিং অফিসার এই সেলে কাজ করবেন। প্রত্যেক অফিসার একটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ২০ মিনিট করে সময় দেবেন। অর্থাৎ, একজন কর্মকর্তা ঘণ্টায় ৩টি প্রতিষ্ঠান এবং ৫ ঘণ্টার ডিউটিতে (প্রতিবেদনের জন্য ১ ঘণ্টাসহ) মোট ১২টি স্কুল বা কলেজ মনিটরিং করতে পারবেন। ফলে ২০ জন মনিটরিং অফিসারের মাধ্যমে প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ২৪০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি কঠোর নজরদারির আওতায় আসবে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকও জানবেন, যে কোনো মুহূর্তে মনিটরিং সেলের লাইভ নজরদারি তার ওপর পড়তে পারে। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ মাঠপর্যায়ে ফাঁকিবাজির সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে বাধ্য।
এই মনিটরিং কেবল ‘শিক্ষক ক্লাসে আছেন কি না’ তা দেখার উপরিউক্ত হাজিরা পরীক্ষা নয়। মনিটরিং অফিসার সরাসরি শ্রেণি শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (NCTB) নতুন কারিকুলামের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই করবেন। অধিদপ্তর থেকে সরবরাহকৃত ডিজিটাল প্রতিবেদন ফর্মে কারিকুলামের আলোকে ‘শিখন ফল অর্জনের অগ্রগতিভিত্তিক’ সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন সাজানো থাকবে। মনিটরিং অফিসার শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে সেই পাঠের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করবেন এবং প্রশ্নের উত্তরগুলো তাৎক্ষণিক ওই ডিজিটাল ফর্মে লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য থাকবেন। কোনো গড়িমসি বা পরে রিপোর্ট জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। প্রতিদিনের দায়িত্ব শেষে সেই ডিজিটাল রিপোর্টটি সাবমিট করেই মনিটরিং অফিসাররা তাদের দিনের কর্ম শেষ করবেন। একে একটি অলঙ্ঘনীয় নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এই কঠোর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে দিনশেষে স্ক্রিনে ভেসে উঠবে—কোন শিক্ষক পাঠদানে পিছিয়ে আছেন, কোন শিক্ষার্থী পড়া বুঝতে পারছে না, কিংবা কোন বিদ্যালয়টি সামগ্রিকভাবে কারিকুলাম বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর শূন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়। নতুন কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা বা যন্ত্রাংশ কেনার কোনো প্রয়োজন নেই; শিক্ষকের হাতে থাকা স্মার্টফোন বা বিদ্যালয়ের ল্যাপটপটিই এর জন্য যথেষ্ট। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের কঠোর ও আপসহীন মনোভাব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কাগুজে পরিদর্শনের ফাঁকফোকর গলানোর দিন শেষ। সশরীরে পরিদর্শনে যে বিপুল সময়, অর্থ ও প্রটোকলের অপচয় হয়—এই ডিজিটাল রেনডম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তার চেয়ে শতগুণ বেশি শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা অর্জন সম্ভব। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল যদি এই সাশ্রয়ী, গণিতনির্ভর ও অভিনব ফর্মুলাটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করেন, তবে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার স্তরে ফাঁকিবাজির দেয়াল ভেঙে এক নতুন সুশৃঙ্খল যুগের সূচনা হবে।