শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

গণতন্ত্র বেঁচে থাকে স্পর্ধিত প্রশ্নে

প্রতিকী ছবিসংগৃহীত

গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর অন্তর ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করা কিংবা সরকারের নীতির সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র হল যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ‘ক্ষমতা’কে প্রশ্ন করার মৌলিক অধিকার। আমরা সাধারণত ধরে নিই যে ‘ক্ষমতা’ কেবল সিংহদরজায় বসা রাষ্ট্র বা নির্বাচিত শাসকের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল ও আশঙ্কাজনক। ক্ষমতা আজ বহুবিভক্ত। তা লুকিয়ে রয়েছে সংগঠিত রাজনৈতিক দল, অরাজনৈতিক গোষ্ঠী, স্বাতন্ত্র্যবাদী সংগঠন, স্বার্থান্বেষী লবি, এমনকি রাজপথে গড়ে ওঠা কোনও ক্ষণস্থায়ী অথচ আগ্রাসী জমায়েতের মধ্যেও। যখন প্রশ্ন করার এই জন্মগত অধিকার রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশাপাশি কোনও সংঘবদ্ধ শক্তি বা জনতার আস্ফালনে স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে সমাজ এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শাসক যখন নিঃশর্ত আনুগত্য চায়, তা বিপজ্জনক। কিন্তু যখন সমাজ বা কোনও সংগঠিত গোষ্ঠী নিজেদের প্রশ্নের অতীত বলে মনে করে, তা রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী।

গণতন্ত্র একটি নিরন্তর কথোপকথন, একটি প্রবহমান চুক্তি— যা শাসক ও শাসিতের মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে রচিত হয়। আর প্রশ্ন করার অধিকার হল এই চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী শর্ত। যখন কোনও রাষ্ট্রে এই অধিকারকে খর্ব করা হয়, যখন প্রশ্নকর্তাকে দেশদ্রোহী বা চক্রান্তকারী তকমা দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্র তার খোলস ছেড়ে স্বৈরতন্ত্রের রূপ ধারণ করেছে।

আমাদের ভারতীয় দর্শনের ভিত্তি কখনোই অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দেয়নি। প্রাচীন বেদ ও উপনিষদ হল সত্যানুসন্ধান ও প্রশ্নের এক অবিচল দলিল। ঋগবেদে সৃষ্টির আদি রহস্য নিয়ে ঈশ্বর বা স্রষ্টার জ্ঞানকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। কঠোপনিষদে কিশোর নচিকেতা মৃত্যুদেবতা যমরাজকে একের পর এক প্রশ্নে বিদ্ধ করে চূড়ান্ত সত্য আদায় করেছিল। যে দেশের আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক ভিত্তি রচিত হয়েছে স্বয়ং ঈশ্বরকে প্রশ্ন করার স্পর্ধার ওপর, সেই দেশে আজ একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা শাসক বা সংগঠিত শক্তিকে প্রশ্ন করলে জেলের ঘানি টানতে হয় বা টানার ভয় থাকে- এর চেয়ে বড় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি আর বোধহয় কিছু হয় না।

দেশজুড়ে ক্ষমতার হুমকি এখন কেবল সরকারি নির্দেশ বা পুলিশি এফআইআর-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা বিস্তৃত হয়েছে পাড়ার মোড়ে, সামাজিক মাধ্যমের সংগঠিত আক্রমণের মধ্যে এবং বিভিন্ন অরাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ফতোয়ায়। শাসকদলকে প্রশ্ন করা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কোনও শক্তিশালী সিন্ডিকেট, ধর্মীয় সংগঠন কিংবা উত্তেজিত জনতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুখ খোলাও সমান বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অতীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানেরা প্রশ্নকর্তাকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘মাওবাদী’ তকমা দিয়ে জেলে পুরেছে। আর আজ, শাসকের সঙ্গে সঙ্গে কোনও সামাজিক বা অরাজনৈতিক সংগঠনের সিদ্ধান্তের ভিন্নমত পোষণ করলে সাধারণ মানুষকে ‘জনতার বিচারে’ শারীরিক নির্যাতন বা বয়কটের শিকার হতে হচ্ছে। এই অঘোষিত ‘জনতা-স্বৈরতন্ত্র’ গণতন্ত্রের কাঠামোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে।

আজকের ডিজিটাল যুগে বিপদটি আরও সূক্ষ্ম। সরাসরি মুখ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। এমন পরিবেশ তৈরি করলেই হয়, যেখানে মানুষ নিজেই কথা বলার আগে দশবার ভাবে- কী বললে বিপদ হবে, কার বিরুদ্ধে বললে সমস্যা হবে, কোন প্রশ্ন করলে চাকরি যাবে, কোন পোস্টে মামলা হতে পারে ইত্যাদি। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে ভয়ংকর সেন্সরশিপ। কারণ তখন পাহারাদার বাইরে থাকে না, মানুষের মাথার ভিতরেই বসে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন— ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’— তা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর বিরোধিতা ছিল না। তা ছিল ক্ষমতা ও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের, কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দৃঢ় উচ্চারণ। আজ ক্ষমতার প্রতিটি রূপ— তা রাজনৈতিক সিংহাসন হোক, অরাজনৈতিক কোনও প্রভাবশালী সংঘ হোক কিংবা হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনও ক্রুদ্ধ জমায়েত— নাগরিকের থেকে কেবল একটাই বস্তু দাবি করে, সমবেত স্তব্ধতা। তারা চায় নাগরিক যেন নিজের বিবেক বন্ধক রেখে কেবল তাদের সুরে সুর মিলায়।

রাজপ্রাসাদে বসা শাসক হোক কিংবা রাজপথ দখল করে রাখা কোনও সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী— সবারই মনে রাখা প্রয়োজন, ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করানো যায়, কিন্তু চিন্তা স্তব্ধ করা যায় না। আথেন্সে সক্রেটিসকে হেমলক পান করিয়ে হত্যা করেছিল তৎকালীন সমাজের প্রভাবশালী অংশ এবং তথাকথিত ‘জনতার বিচারালয়’। সক্রেটিসের অপরাধ ছিল, তিনি প্রচলিত ক্ষমতা ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন। সেই নৃশংসতার পরেও গ্রিসে প্রশ্ন করা বন্ধ হয়নি। যে সমাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, যে সমাজ কোনও সংগঠিত গোষ্ঠীর সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নতজানু হয়, সেই সমাজ ধীরে ধীরে তার গণতান্ত্রিক আত্মাকে হারিয়ে ফেলে।

শুধু শাসক বা নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দল নয়, প্রতিটি ক্ষমতার উৎস যারা নিজেদের আইনের বা পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে, তাদের মনে রাখা দরকার, প্রশ্ন করা কোনও অপরাধ নয়, তা নাগরিকের পরম দায়িত্ব। প্রশ্নহীন আনুগত্যের এই সংস্কৃতি ভাঙা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র, দল কিংবা কোনও শক্তিশালী জমায়েত— কেউই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আর স্পর্ধিত প্রশ্নের সেই আলোতেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে পায়।

লেখাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত উত্তরবঙ্গ সংবাদ থেকে নেওয়া।

এ বিভাগের আরও সংবাদ