শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

জুলাই জাদুঘর তৈরির পেছনের গল্প

আমরা জীবন দিয়ে এক বছরের মধ্যে জুলাই জাদুঘর দাঁড় করিয়েছি। যখন প্রথম আমাকে জুলাই জাদুঘরের দায়িত্ব দেওয়া হলো, তখন আমাদের সামনে কোনো পরিষ্কার পথ ছিল না। আমি ফেসবুকে লিখেছিলাম, আমার মনে হচ্ছে গভীর সমুদ্রের মধ্যে একা আমি আছি। কোথায় যাব, কী করব, কিছুই জানি না। তখন আমি দেখার চেষ্টা করলাম, আমাদের সামনে মিউজিয়ামের রেফারেন্স কী আছে! জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং আরও যা যা আছে। কিন্তু আমার পার্সোনাল ফিলিং ছিল, এগুলো যথেষ্ট এনগেজিং না। অনেক প্রদর্শনযোগ্য সামগ্রী আছে, কিন্তু সেই সামগ্রীগুলো আমাকে একটা ইমোশনাল জার্নির মধ্যদিয়ে নিয়ে যায় না। ফলে আমরা আরেকটা ওরকম জাদুঘর বানাতে চাইনি। তখন প্রশ্ন হলো আমাদের জাদুঘর কোথা থেকে শুরু হবে, কোথায় শেষ হবে, কী কী থাকবে?

এখন জুলাই জাদুঘর হয়ে গেছে। এ জাদুঘর দেখার পর ভবিষ্যতে আরেকটা জাদুঘর যদি কেউ বানাতে চায়, তার জন্য কাজটা ইজি হয়ে যাবে। সে আরও ভালো চিন্তা নিয়ে আসতে পারবে। কিন্তু আমরা যখন শুরু করেছি, তখন আমাদের সামনে ভালো কোনো রেফারেন্স ছিল না। তখন এখানে কিছুই ছিল না, গাছতলা ছিল। গাছতলায় টেবিল নিয়ে আমরা কয়েকজন বসে অফিস করতাম। আমি তানজিম ওয়াহাবকে শিল্পকলা একাডেমি থেকে জাতীয় জাদুঘরে ডিজি করে নিয়ে আসি এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে তাকে জুলাই জাদুঘরের ডিজিও করা হয়।

তিনি আগে বিদেশে জাদুঘরে কাজ করেছেন এবং তার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা ছিল। আমি যে ভিশনটা দেখছি, তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য আমাদের এমন একজন লোক দরকার ছিল, যার কিউরেটরিয়াল নলেজের পাশাপাশি প্রোডাকশন এবং এগজিবিশন সম্পর্কে ধারণা আছে।

তানজিমকে নিয়ে আসার পর আমরা একটা কোর রিসার্চ টিম করলাম। সেই রিসার্চ টিমে ছিলেন কবি হাসান রোবায়েত, সহুল আহমেদ মুন্না, খন্দকার রাকিব, এহসান মাহমুদ, মশফিকুর রহমান জোহান এবং শুরুর দিকে বেশ কিছুদিন সাঈদ খান সাগর। তাদের সঙ্গে ছিলেন ফটোগ্রাফার ও কিউরেটর শামসুল আলম (হেলাল), হাদী উদ্দিন এবং সহন।

কিছুদিন পরে গবেষক হিসাবে যোগ দেন কবি রুম্মানা জান্নাত, ফান্তাসির মাহমুদ, মালিহা নামলাহ এবং হাসান ইনাম। আরও পরে যোগ দেন জুবায়ের ইবনে কামাল, আবু বকর সাঈম এবং সাবিহা নাহলা। হাসান ইনাম এবং আবু বকর সাঈম জুলাই শহীদদের স্মারক সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। এ কাজে পরে যুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শহীদ সৈকতের বোন সেবন্তী। জুলাই আন্দোলনের বেশির ভাগ আর্কাইভাল ফুটেজ জাদুঘরকে সরবরাহ করেছে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স। জাদুঘরের অনেক ডকুমেন্টারিতে ব্যবহৃত হয়েছে এই ফুটেজ।

গ্রাফিক ডিজাইনের জন্য আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন আল হেলাল সম্রাট, তানভীরুল ইসলাম। আর যাদের নাম না বললেই নয়-পাঠশালা ও চারুকলার একদল তরুণ ছেলেমেয়ে আমাদের দারুণ সহযোগিতা করেছে। আমরা প্রতিদিনই বসতাম। ওই মিটিংগুলোতে প্রতিদিনই আলোচনা হতো-জাদুঘরে আমরা কী দেখাব, কোথায় থেকে গল্পটা শুরু করব, কতদূর পর্যন্ত যাব।

একদিন অনেক আলোচনার মধ্যে আমি একটা প্রশ্ন তুললাম-আমরা কি শুধু জুলাইয়ের ছত্রিশ দিনের গল্প বলব? নাকি এ ছত্রিশ দিনকে একটা দীর্ঘ টাইমলাইনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখব? এ প্রশ্নটা এসেছে, কারণ আমার কাছে জুলাই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো আন্দোলন নয়। এর পেছনের পলিটিক্যাল এবং কালচারাল ইনফ্লুয়েন্সও অনেক বিস্তৃত।

আমাদের জীবনে এত বড় ঘটনা কয়েকশ বছরে খুব বেশি ঘটেনি। সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। তারপর যদি আরেকটা ঘটনা বিবেচনা করি, আমার বিচারে সেটা জুলাই। আমি তখন বললাম, জুলাই একটা পলিটিক্যাল ঘটনা বটে, কিন্তু আমার কাছে এটা একটা সাংস্কৃতিক ঘটনাও। জুলাইয়ের স্লোগান এবং হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরের স্লোগানগুলো দেখেন। মানুষ শুধু একটা সরকার পরিবর্তনের কথা বলছিল না, তারা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল।

হ্যাঁ, আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য সরকার ছিল এটা। গুম, খুন, হিটলারি কায়দার নির্যাতন-এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেনি। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করেনি যে, এ সরকার শুধু নিজের ক্ষমতায় এসব করেছে। মানুষ পরিষ্কার জানত, এ ক্ষমতাটা সে একটা আধিপত্যবাদী শক্তির কাছ থেকে পেয়েছে। ফলে জুলাইয়ে মানুষ জানত সে কার সঙ্গে লড়াই করছে। বিজয়ের পর মানুষের স্লোগানগুলোর বেশির ভাগই ছিল আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।

ফলে আমি বললাম, জাদুঘরে এ রিফ্লেকশনটা আসতে হবে। শুধু ছত্রিশ দিনে কী ঘটেছে, তা দেখানো পর্যাপ্ত নয়। তখন আমরা ঠিক করলাম-লেটস স্টার্ট ফ্রম একাত্তর। পরবর্তী সময়ে এখানে আরও রিসার্চ হবে। জুলাই এবং ষোলো বছরের গল্প তো মহাসাগরের মতো। একদিনে এর সব তুলে ধরা যাবে না। নিয়মিত কিউরেশনের মধ্য দিয়ে এখানে কনটেন্ট যুক্ত করা চলমান থাকবে। পাশাপাশি আমাদের শত শত বছরের রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগ্রামের ইতিহাসও নিয়ে আসা হবে।

তিতুমির, ফরায়েজি আন্দোলন, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, মুজিব, জিয়াউর রহমান, ওসমানী, সেক্টর কমান্ডার, স্বাধীনতাযুদ্ধ, জিয়াউর রহমানের শাসনামল, এরশাদের স্বৈরশাসন, বেগম খালেদা জিয়া-সব গল্পই আসবে। আমাদের সব সময়ের পরিকল্পনা ছিল, জুলাই জাদুঘর যেন একবার দেখে শেষ হয়ে যাওয়া জাদুঘর না হয়। এখানে ক্রমাগত নতুন নতুন প্রদর্শনী এবং কনটেন্ট ঢুকবে, যাতে মানুষ বারবার এটা দেখতে পারে।

পাশাপাশি আরেকটা বড় পরিকল্পনা ছিল এটাকে আমাদের কালচারাল এবং পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের একটা কেন্দ্রস্থলে পরিণত করা। এজন্য প্রতি উইকেন্ডে মিউজিক্যাল প্রোগ্রামের পাশাপাশি পাবলিক টক আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলাম। পাবলিক টক শুনলেই বোরিং কিছু একটা মনে হয়। কিন্তু এটা যদি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিকল্পনা করা যায়, দারুণ ইমপ্যাক্টফুল হতে পারে।

যেমন ধরেন, যখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খুনি ধরা পড়ল, তারপরের উইকেন্ডে যদি তানভীর জোহাকে পাবলিক টকের স্পিকার বানানো হয় এবং সে যদি ব্যাখ্যা করে কীভাবে মোজাফফরের ফোন কলের ট্রেইল ধরে তাকে ধরা হয়েছে, সে এত দিন কীভাবে দেশে লুকিয়ে ছিল, ওয়ান-ইলেভেনের মাসুদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কেমন ছিল-আপনি কিন্তু আগ্রহী হয়ে শুনতে বসে যাবেন। আবার ব্যারিস্টার আরমানের গুম থেকে ফিরে আসার দিন তাকে স্পিকার করলে তার গল্প শুনতে মানুষ আসবে। আবার ষোলোই ডিসেম্বরে বিজয়ের গানের পর জেনারেল ওসমানী এবং আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান নিয়ে পাবলিক টক হলে মানুষ উপচে পড়বে।

ঢোকার প্রথম মুহূর্তটা কেমন হবে: আমি দায়িত্ব ছেড়ে আসার পর একদিন তানজিমের সঙ্গে গল্প করতে করতেই বললাম-জুলাই জাদুঘরে ঢোকার মুখে যে মাঠটা আছে সেখানে জুলাই জাদুঘরের একটা সাইন বা লোগোর মতো কিছু থাকা উচিত। তার পাশে থাকবে আবু সাঈদের একটা লাইন-ড্রয়িং স্কাল্পচার, অনেকটা ডুডলের মতো। পুরোপুরি আবু সাঈদের ছবি না, আবার দেখলেই বোঝা যাবে-এটা আবু সাঈদ। আর তার নিচে লেখা থাকবে-‘বাকিডি যায় না।’ এই ‘বাকিডি যায় না’ আমার কাছে একটা ঐতিহাসিক লাইন। ‘গুলি করি একটা।’ ‘একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না।’ এই বাকিডি কে? আমার কাছে এই বাকিটা হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ।

আমি চেয়েছিলাম, একজন মানুষ যখন প্রথম জুলাই জাদুঘরে ঢুকবে, আবু সাঈদের ওই ডুডল স্কাল্পচার আর ‘বাকিডি যায় না’-এই দুইটা দেখেই যেন জুলাইয়ের পাওয়ারটা ফিল করে। তার নিচে থাকবে-‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। সময়ের অভাবে এটা শেষ পর্যন্ত করা হয়নি। কিন্তু আমি এখনো মনে করি, এটা ইমিডিয়েটলি করে ফেলা উচিত। জুলাই জাদুঘরে ঢোকার প্রথম জিনিসটাই এটা হওয়া উচিত।

জাদুঘরের শুরু ও শেষ: লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি- সিনেমা বা একটা উপন্যাসের শুরু এবং শেষ কোথায় হবে এটা যেমন সবচেয়ে কঠিন একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপার, মিউজিয়াম নিয়েও আমরা সেই অবস্থায় পড়লাম। আমরা প্রথম থেকেই একমত হয়েছিলাম যে এই মিউজিয়াম জাস্ট কিছু স্মারক আর ছবিতে ঠাসা র‌্যানডম কোনো কিছু হবে না। আমরা চেয়েছি এটা একটা ইমোশনাল জার্নির মতো হোক। অনেক দিন স্ট্রাগল করার পর হঠাৎ কোত্থেকে মাথায় নাজিল হলো-জাদুঘরের শুরু হবে ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ দিয়ে। আর জাদুঘরের শেষ হবে হাসান রোবায়েতের কবিতা ‘তোমরা হয়তো যাইবা ভুলে/খুনী হাসিনার ইতিহাস/সেই মায়ে রাখবো মনে/যে ছুঁইছে পোলার লাশ’। টিমের সবাই এক বাক্যে রাজি হলো। অর্থাৎ আপনি যখন ঢুকছেন, তখন বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ যাত্রার মধ্যে ঢুকছেন। আর যখন বের হচ্ছেন, তখন শহীদের মায়ের কষ্টটা বুকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন। ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ আমরা শুরু করলাম একাত্তর থেকে। এখানে আমাদের একটা জিনিস খুব পরিষ্কার ছিল-ইতিহাসকে আমরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড় করাব না। ইতিহাসে যার যে ভূমিকা, সেটা সেভাবেই বলব।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণসহ স্বাধীনতার আগের তার যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, তা আমরা রেখেছি। আবার ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাও রেখেছি। কারণ একটা ইতিহাসকে সামনে আনার জন্য আরেকটা ইতিহাসকে মুছে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই। একইভাবে শেখ মুজিবের একাত্তরের আগের ভূমিকা আর একাত্তরের পরের শাসনকালকে আমরা এক জিনিস হিসাবে দেখিনি।

স্বাধীনতার পরে মানুষের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষা কীভাবে ধাক্কা খেল, কীভাবে একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দিকে দেশ গেল এবং শেষ পর্যন্ত বাকশালের মধ্য দিয়ে একদলীয় ব্যবস্থায় পৌঁছাল-তাও এ ইতিহাসের অংশ।

এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ, বাংলাদেশের ফ্যাসিজমের জেনেসিসটা বুঝতে হলে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের দিকে তাকাতে হবে। হাসিনার ষোলো বছরের ফ্যাসিজমকে আলাদা কোনো ঘটনা না। এর ডিএনএ আমাদের ইতিহাসের আগের অধ্যায়ের মধ্যেই আছে। তারপর আসে জিয়াউর রহমানের সময়। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একজন সামরিক শাসক হিসাবে আসেন না। তার সময় বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে। পরে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আবার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার অধ্যায়ের সূচনা হয়।

এরপর আসে একানব্বইয়ে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। অর্থাৎ এই ভূখণ্ডের মানুষ বারবার একটা জিনিসের জন্যই লড়েছে-সে নিজের দেশ নিজের মতো করে চালাতে চায়, নিজের ভোট দিতে চায়, নিজের সরকার বেছে নিতে চায়। সে কারও প্রজা হয়ে থাকতে চায় না। ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ আমরা ওয়ান-ইলেভেনে এসে থামাই।

ওয়ান-ইলেভেন কীভাবে এলো, তাও আমরা দেখিয়েছি। সেখানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বইয়ের একটা রেফারেন্স ছিল। প্রণব মুখার্জি তার বইয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ভারতে গিয়ে তার কাছে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছিলেন-নির্বাচনের পরে তার কী হবে। প্রণব মুখার্জি তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে তার নিরাপত্তার বিষয়টি তিনি দেখবেন।

কিন্তু ৫ আগস্ট জাদুঘর উদ্বোধনের পর দেখলাম, ‘লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ সেকশন থেকে প্রণব মুখার্জির বইয়ের এ রেফারেন্সটা বাদ পড়েছে। কেন তা আমি জানি না। আমার কাছে এটা আরও বিস্ময়কর, কারণ এ রেফারেন্স তো বিএনপি সরকারের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপিই তো ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী নির্বাচনের ভিকটিম। একই রেফারেন্স আমরা ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’-এর ষোলো বছরের নির্বাচনবিষয়ক অংশেও রেখেছিলাম। সেখানে প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্সের পাশাপাশি আমরা দেখিয়েছিলাম, ২০০৮-এর নির্বাচনে কীভাবে অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ৮৫ ভাগ ভোট পড়েছিল। এখন দেখছি, দুই জায়গা থেকেই প্রণব মুখার্জির বইয়ের রেফারেন্সটা আর নাই।

লং ওয়াক টু ডেমোক্রেসির পরেই ফাঁকা মাঠে মেমোরিয়াল করা উচিত-এটা প্রথম দিন বিধ্বস্ত গণভবন ভিজিটের পরেই আমি টিমের সঙ্গে শেয়ার করি। মেমোরিয়ালটা কীরকম হবে, এটা নিয়ে আমরা অনেক ভেবেছি। একদিন মিটিংয়ে বললাম, এ বাড়িতে বসেই একজন ফ্যাসিস্ট ষোলো বছর দেশ চালিয়েছে, অসংখ্য মানুষকে গুম-খুনের হুকুম দিয়েছে। একদিন জনগণের আন্দোলনের মুখে সে পালিয়ে গেছে, জনতা তার বাড়ির দখল নিয়েছে। গণভবন সত্যিকার অর্থে জনতার ভবন হয়ে গেছে। তো যাদের সে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, তারাই যদি এসে তার বাড়ির দখল বুঝে নেয়?

আমি প্রস্তাব করলাম, এই বিশাল মাঠে সারি সারি কবরের আদলে মেমোরিয়াল হোক। চারপাশে লেখা থাকবে সেই মানুষগুলোর নাম। বাড়ির সামনে হাজার হাজার কবর দেখলে আর কাউকে এই বাড়ির ইতিহাস বুঝিয়ে বলতে হবে না। প্রথমে আইডিয়াটা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর লেগেছিল। টিমের মধ্যে একমাত্র তানজিম ওয়াহাব প্রথম থেকেই এটার পক্ষে ছিল। বাকিরা একটু দ্বিধায় পড়েছিল। ধীরে ধীরে অবশ্য সবাই একমত হয়। ষোলো বছরে গুম-খুনের শিকার এবং জুলাইয়ের শহীদ মিলিয়ে আমরা প্রায় ৪,২০০ মানুষের নাম পাই। তালিকা তৈরিতে সহযোগিতা করেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। মেরিনা তাবাসসুম আপা সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ভাবনাটাকে স্থাপত্যে রূপ দিলেন। চিফ অ্যাডভাইজার প্রফেসর ইউনূসকে ডিজাইন এবং এর পেছনের ভাবনাটা দেখানোর পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘প্লিজ গো অ্যাহেড।’ আজ সেখানে শত শত ভিজিটরকে কবরগুলোর পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হয়, এ মেমোরিয়াল নিয়ে আমাদের দীর্ঘ চিন্তা, তর্ক আর লড়াইটা কাজে লেগেছে। সবশেষে ধন্যবাদ মালিহা নামলাহকে-মেমোরিয়ালের জন্য তার লেখা দুই লাইনের কবিতা আমাদের মূল ভাবনাটাকে রূপ দিয়েছে।

‘দেশপ্রেমীদের রক্ত খেয়ে বাঁচত যাহার সিংহাসন
সব শহীদের দখলে আজ সেই খুনিটার আবাসন’!
এ কবিতার এডিটিংয়ে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ হাসান রোবায়েতকে।

মেমোরিয়ালের চারপাশে স্কাল্পচার গার্ডেন : মেমোরিয়ালটা আসলে একটা বিশাল প্লাজার মতো। এখন এ প্লাজার চারপাশে অনেক স্কাল্পচার আছে। অনেকটা স্কাল্পচার গার্ডেনের মতো হয়ে গেছে। জুলাইয়ের বেশ কিছু আইকনিক মোমেন্টকে আমরা স্কাল্পচারে ধরেছি। এর সঙ্গে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের স্মৃতিও একটা স্কাল্পচারে এসেছে। মজার ব্যাপার হলো, এ স্কাল্পচারগুলো শুরুতে এখানে রাখার কথাই ছিল না। স্কাল্পচারের কাজ যখন শুরু করি, আমি তানজিমকে বললাম, যসের (তেজস হালদার যস) স্কাল্পচার আমার খুব ভালো লাগে, আপনার তো ওর সঙ্গে আলাপ আছে, ওকে ডাকেন। যসকে ডেকে জুলাইয়ের অনেক আইকনিক ইমেজগুলো দিলাম। বললাম, এগুলোকে স্কাল্পচারে রূপ দাও। যস একটা রাফ ডিজাইন তৈরি করল। তারপর আমি, তানজিম আর যস একসঙ্গে বসলাম। কোথাও বললাম-আরেকটু চেঞ্জ করো, কোথাও আরেকটু শার্প করো। এভাবে একসময় স্কাল্পচারগুলো রেডি হয়ে মিউজিয়ামে চলে এলো; কিন্তু তখনো আমরা ঠিক করিনি এগুলো কোথায় থাকবে। তানজিম আর্কিটেক্টদের সঙ্গে ভাবছিল, কোথায় কোনটা রাখা যায়। সেই চিন্তাভাবনা চলছিল। আপাতত স্কাল্পচারগুলো এনে মেমোরিয়ালের এক পাশে ডাম্প করে রাখার মতো করে রাখা হলো।

আমি প্রতিদিন মিউজিয়ামে যাই, আসি। প্রতিদিন ওই স্কাল্পচারগুলো দেখি, আবার মেমোরিয়ালটা দেখি। দেখতে দেখতে একটা সময় আমি স্কাল্পচারগুলোর সঙ্গে মেমোরিয়ালের একটা সম্পর্ক দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ মনে হলো-আরে, এগুলো তো অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। এগুলো এ মেমোরিয়ালেরই অংশ। প্লাজার চারপাশে একটা বৃত্তের মতো করে এগুলো থাকা উচিত। আমি কথাটা বলামাত্র তানজিমের খুব পছন্দ হলো। কিন্তু আর্কিটেক্ট সালাহউদ্দিন সাহেব একটু কনফিউজড হয়ে গেলেন। বললেন, না, আমরা তো এখানে এগুলো ভাবিনি। এখানে যাবে না।

আমি হেসে বললাম, না, এখানেই যাবে। আমি জেনেই বলছি। ডোন্ট ওরি অ্যাবাউট ইট। কোনটা কোথায় যাবে, ঠিক করে দিচ্ছি। তারপর একদিন আমি, তানজিমসহ টিমের সবাই দাঁড়াল! যসও তার শ্রমিকদের নিয়ে এলো। একটা একটা করে স্কাল্পচার সরিয়ে জায়গা মেপে প্লেস করতে শুরু করলাম। একটা স্কাল্পচার এক জায়গায় রাখার পর সেটাকে তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেখছি-কোন অ্যাঙ্গেল থেকে কেমন দেখায়, মেমোরিয়ালের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কী দাঁড়ায়। আবার সরাচ্ছি, আবার দেখছি।

সারা দিন ধরে এ কাজ করে আমরা একসময় সব স্কাল্পচার প্লেস করলাম। এখন আমার মনে হয়, মেমোরিয়াল এবং এ স্কাল্পচারগুলো একসঙ্গে মিলে একটা অসম্ভব পাওয়ারফুল আর্ট ইনস্টলেশন হয়ে উঠেছে। এবং এর জন্য যস একটা বিরাট ক্রেডিট পাবে। কারণ ওর স্কাল্পচারগুলো এত পাওয়ারফুল যে সেগুলোর সামনে দাঁড়ালে জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো যেন আবার ফিরে আসে।

আনাসের চিঠি : মেমোরিয়াল আর স্কাল্পচার গার্ডেন পার হয়ে আমরা জুলাইয়ের মেইন সেকশনের দিকে যাই। আমরা জুলাইয়ের পুরো ঘটনা থেকে একটা সিঙ্গুলার অবজেক্ট নিতে চাইলাম। কী হতে পারে? জুলাই অনির্বাণ নামে ডকুমেন্টারি বানাতে গিয়ে আনাসের মায়ের কণ্ঠে ওই চিঠিটা শোনার পর থেকেই আমার বুক এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়। তখন থেকেই এ চিঠিটা আমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে ভারী চিঠি। তখন মিটিংয়ে এটার প্রসঙ্গ তুলতে আমরা সবাই একমত হলাম। প্রথম অবজেক্ট হোক আনাসের চিঠি। এই একটা চিঠিই জুলাই আন্দোলনের গভীরতা, ব্যাপকতা এবং ইমোশনাল ডেপথ বলে দেয়। ফলে আনাসের চিঠিকেই আমরা মেইন মিউজিয়ামে ঢোকার আগে প্রথম সিঙ্গুলার অবজেক্ট হিসাবে রাখলাম।

জুলাই উইমেন : একটু সামনে গেলেই দ্বিতীয় সেকশন-‘জুলাই উইমেন’। কারণ নারীরা শুধু ১৪ জুলাইয়ের রাতে না, গোটা জুলাই আন্দোলনেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলন যখন থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, নারীরা বারবার সেটাকে জাগিয়ে তুলেছেন। নুসরাত, তামান্না, শহীদ রাব্বির দুই বোন, উত্তরায় শশী, উমামা ফাতেমা, সংগীতশিল্পী শায়ান-এবং আরও অসংখ্য নারী মাঠে, রাস্তায়, আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। এই মুহূর্তে সবার নাম হয়তো আমার মনে আসছে না; কিন্তু আমার কাছে বিষয়টা খুব পরিষ্কার ছিল-জুলাইকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, নেতৃত্বও দিয়েছেন। ফলে মূল ভবনে ঢোকার আগেই তাদের জন্য আলাদা একটা সেকশন রাখলাম আমরা।

জুলাই আন্দোলনে 'ঢাল' হয়ে থাকা নারী মুখগুলো কেন হারিয়ে গেল? | The Daily Star

মিউজিয়ামে কোন রুমে কী দেখাব? মেমোরিয়াল, আনাসের চিঠি, জুলাই উইমেন-এই বেসিক জার্নিটা যখন আমাদের দাঁড়িয়ে গেল, তখন সামনে বড় প্রশ্ন-মেইন বিল্ডিংয়ে কোন রুমে কী দেখাব? ষোলো বছরের এত কিছু, আবার জুলাইয়ের এত কিছু-এটাকে কীভাবে সাজাব? স্ট্রাকচারটা কী হবে? এটা ছিল একটা মেজর কিউরেটোরিয়াল ডিসিশন। এসময় আমাদের রিসার্চাররা নিয়মিত মিটিংয়ে বসত। যাদের নাম আগে বলেছি, তাদের পাশাপাশি ড্যানিয়েল রহমানও থাকত অনেক মিটিংয়ে। আবদুল হালিম চঞ্চলও থাকত। অ্যাকচুয়ালি, এই মিউজিয়াম নিয়ে মূল গবেষকদলসহ আমরা কক্সবাজারে একটা ওয়ার্কশপও করেছিলাম। কোন রুমে কী থাকবে, কীভাবে রুম ভাগ হবে-এসব নিয়ে সেখানে কাজ করেছি। ওই ওয়ার্কশপেই একদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং আমাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়। ড্যানিয়েল সেই মিটিংয়েও ছিল। এর বাইরেও আরও অনেক মিটিংয়ে ছিল সে। মেইন বিল্ডিং নিয়ে যখন আলোচনা হচ্ছিল, তখন আমরা একটা বেসিক প্রিন্সিপাল ঠিক করলাম। আমি বললাম, দেখুন, আমরা একটা কাজ করি-নিচতলা হবে হাসিনা রেজিমের ষোলো বছরের পুরোটা, আর উপরতলা হবে মেইনলি জুলাই। তবে নিচতলায় একটা জায়গায় আমরা ব্যতিক্রম ঘটাব। তা হচ্ছে হাসিনার অফিস রুম। সেখানে আমরা জুলাইয়ের শহীদদের সবার ছবি রেখে দেব।

টেক্সট, রিসার্চ এবং আমার কাজের ধরন : পুরো মিউজিয়ামের টেক্সট সবচেয়ে বেশি লিখেছে হাসান রোবায়েত এবং কবি রুম্মানা জান্নাত। বাকিরাও অনেক সেকশনের টেক্সট ডেভেলপ করেছে। শুরুর দিকে আমি মুখে মুখে বলে দিতাম-কোন সাবজেক্টে কী থাকতে হবে, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে লিখতে হবে, কী কী তথ্য বা ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। ওরা আমার কথাগুলো অডিও রেকর্ড করে নিত। তারপর সেই অডিও থেকে নিজের মতো করে একটা টেক্সট দাঁড় করাত।

এরপর আবার সেটা আমার কাছে আসত। আমি বসে বসে লাইন ধরে এডিট করতাম। কোথাও কিছু যোগ করতাম, কোথাও কাটতাম, কোথাও ভাষা বদলাতাম, কোথাও আবার পুরো স্ট্রাকচার পালটে দিতাম। অর্থাৎ এখানে আমি শুধু মন্ত্রী বা আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করিনি। আমি আসলে রিসার্চারদের সঙ্গে প্রায় কর্মী পর্যায়ে নেমে কাজ করেছি। ওদের সঙ্গে বসে রিসার্চ করা, টেক্সট নিয়ে কাজ করা, একেকটা রুমের ন্যারেটিভ দাঁড় করানো-এ কাজগুলো করতে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি।

গণভবনকে আমরা যেভাবে পেয়েছিলাম : এই মিউজিয়ামের বিষয়ে একটা বড় দার্শনিক সিদ্ধান্ত আসে চিফ অ্যাডভাইজার প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে আমার একান্ত বৈঠকের পর। আমাদের কাজের ধরন ছিল একসঙ্গে বসে ব্রেইনস্টর্মিং। সেখানে তিনি বললেন, এই যে মানুষের ক্ষোভের চিহ্ন লেগে আছে গণভবনে, এটা না মুছে কীভাবে মিউজিয়ামটা করা যায় সেটা ভাবো, ফারুকী।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, এগজাক্টলি এ কথাটা গণভবন পরিদর্শনের সময় আমি মেরিনা আপা এবং তানজিমকে বলেছি। ওই মিটিংয়েই এটা আমাদের একটা দার্শনিক ফাউন্ডেশন হয়ে গেল। এর ভিত্তিতেই অনেক ক্রিয়েটিভ ডিসিশন হয় এরপরে।

সেই অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ৫ আগস্টে ক্ষোভের চিহ্ন মুছে ফেলা যাবে না। পাশাপাশি গণভবনকে আমরা যেভাবে পেয়েছিলাম, সেটাকেও জাদুঘরের এক্সিবিট করতে হবে। তাই ভবনের সেই অবস্থাকে আমরা থ্রি-ডি স্ক্যান করে রাখলাম। মেইন মিউজিয়ামে ঢোকার মুখে দুপাশে সেই স্ক্যান রাখা হয়েছে। যে কেউ জয়স্টিক দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে পারবেন, ৫ আগস্ট জনতা গণভবনকে কী অবস্থায় রেখে গিয়েছিল।

হাসিনা ইউনিভার্স : এটা পার হয়ে জাদুঘরের প্রথম ঘর। ঘরটার নাম-‘হাসিনা ইউনিভার্স’। আমরা দেখাতে চেয়েছি, একজন ফ্যাসিস্টের ইউনিভার্সটা আসলে কী ছিল। ঘরের মধ্যে একটা বিশাল গোল গ্লোবের মতো স্ট্রাকচার। সেই গ্লোবজুড়ে হাসিনা এবং তার সভাসদদের বিভিন্ন ভিজ্যুয়াল কোলাজ। আর গ্লোবের সামনে হাসিনার মুখের একটা স্কাল্পচার।

তানজিম ওয়াহাব আমাকে আশিক নামে একজন স্কাল্পচারের কাজ দেখাল। তার স্কাল্পচারগুলোর একটা ইন্টারেস্টিং বৈশিষ্ট্য ছিল-মুখ তৈরি করেন, কিন্তু মুখের মাঝখানটা ফাঁকা রাখেন। আমার কাছে আইডিয়াটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগল। আমি বললাম, হাসিনারও এরকম একটা মুখ করেন। কিন্তু মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় একটা চেয়ার বসিয়ে দেন। কারণ, দ্যাটস হোয়াট শি কেয়ার্ড ফর। তার কাছে দেশ, দেশের মানুষ, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব-কিছুই ম্যাটার করেনি। ম্যাটার করেছে শুধু চেয়ার। ফলে হাসিনার মুখের মাঝখানে বসে গেল একটা চেয়ার। আমার মনে হয়, একটা স্কাল্পচারের মধ্যে ওই একটা চেয়ারই অনেক কথা বলে দেয়।

এর পেছনের বিশাল গ্লোবটার ভিজ্যুয়াল কোলাজ তৈরি করছিল দেবাশিস চক্রবর্তী এবং জাহিন ফারুক আমিন। কিন্তু হাসিনার নিজের অংশে কী কথা লিখব তা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক দিন মিটিং করতে করতে হঠাৎ আমার মাথায় এলো-হাসিনার গোটা জীবনকে যদি সিদ্ধ করে গরম পানি ফেলে দেওয়া হয়, শেষে কী থাকে?

‘আমি, আমি, আমি।’
‘তোমাদের কে খাওয়ায়?’
‘আমার বাবা। আমার বাবা। আমার বাবা।’
ব্যস।

ফলে গ্লোবের একটা অংশজুড়ে লেখা হলো-‘আমি, আমি, আমি, আমি, আমি।’ আরেক জায়গায়-‘তোমাদের কে খাওয়ায়? কে খাওয়ায়? কে খাওয়ায়?’ আরেক জায়গায়-‘আমার বাবা, আমার বাবা, আমার বাবা।’ আমার কাছে মনে হয়েছে, তার সারা জীবনের বক্তৃতা আর সংলাপ সিদ্ধ করে ফেললে শেষ পর্যন্ত এ তিনটাই পড়ে থাকবে।

একই রুমে তার পরিবার, সভাসদ, গুম-খুনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা, তার ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট-এ পুরো ইউনিভার্সটাকেও আমরা ধরার চেষ্টা করেছি। তারেক সিদ্দিকী, জিয়াউল আহসান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্ররা সেখানে এসেছে। স্কাল্পচারগুলোর মুখের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় প্রত্যেকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আলাদা সিম্বল রাখা হয়েছে। কোথাও ব্যাংক, কোথাও মানুষের খুলি, কোথাও টাকা। অর্থাৎ মুখটা দেখলেই শুধু মানুষটাকে না, সে কী রিপ্রেজেন্ট করে তাও যেন বোঝা যায়।

এ রুমের বাঁ দিকে হাসিনার একটা চেয়ার নিয়ে আরেকটি ইনস্টলেশন আছে। শিল্পী সাহেলা আক্তার উমামার শিল্পকর্ম। এর বেসিক আইডিয়াটাও তার। তানজিমরা সুপারভাইজ করেছে। নিজের ক্ষমতাকে প্রায় ঐশ্বরিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, নিজেকে মাবুদ ভাবার যে প্রবণতা-সেটাই এ ইনস্টলেশনের মূল কথা।

রিমেইনস অব ফ্যাসিজম : এরপর ডান দিকে ঢুকলেই বিশাল একটা রুম। এ রুমের ক্ষেত্রে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, গণভবনের ভাঙচুরের পর যে রাবলস পাওয়া গেছে, সেগুলো রুমের মেঝেতে ফেলে রাখা হবে। তার ওপর থাকবে কাচ। মানুষ সেই কাচের ওপর দিয়ে হাঁটবে, আর তার পায়ের নিচে থাকবে একটা ভেঙে পড়া ফ্যাসিস্ট শাসনের ধ্বংসাবশেষ। মানুষের ক্ষোভের ভাষা যেন এই রুমে এলেই ভিজিটররা টের পান। যাতে আর কেউ এরকম ফ্যাসিস্ট হওয়ার দুঃসাহস না করে।

রুমের দুই পাশের দেওয়ালের একটিতে ৫ আগস্টে গণভবন দখলে নেওয়া মানুষের ভিডিও এবং বিপরীত দেওয়ালে ওইদিনের রাজপথে মানুষের আন্দোলন দেখানো হবে। কোনো পরিষ্কার, সুন্দর পর্দায় না। প্রজেকশন হবে সরাসরি সেই ভাঙাচোরা দেওয়ালের ওপর। যাতে দেওয়ালের রেজ, ক্ষত, ভাঙচুর-সবকিছুর ওপর দিয়েই ছবিগুলো চলতে থাকে এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিই এ জাদুঘরের প্রদর্শনীতে গণভবনে প্রাপ্ত ফার্নিচারগুলোই ব্যবহার করব। এ আইডিয়াটিকে তানজিম আরও আর্টিস্টিক ও পলিটিক্যাল করে তোলেন। তিনি এ ফার্নিচারগুলোতেই ব্যবহার করেন সব ফটোগ্রাফ ও বিভিন্ন স্মারক।

এ কাচের ওপর হাঁটার আইডিয়াটা নিয়ে প্রথমদিকে সংশয় ছিল। আর্কিটেক্টরা, মেরিনা আপারাও ভাবছিলেন, এত বড় জায়গায় কাচের ওপর মানুষ হাঁটবে-এটা কীভাবে করা যাবে, নিরাপত্তা কী হবে। কিন্তু আমি মোটামুটি গোঁ ধরেছিলাম-না, এখানে মানুষকে কাচের ওপর দিয়েই হাঁটতে হবে।

কারণ আমি চাইছিলাম, আপনি যখন এ ঘরের মধ্যে হাঁটবেন, পায়ের নিচে ধ্বংসাবশেষ দেখবেন, দুই পাশের ক্ষতবিক্ষত দেওয়ালে ষোলো বছরের ফিল্মগুলো চলবে-তখন একটা গুজবাম্প হবে। ষোলো বছরকে আপনি শুধু তথ্য হিসাবে জানবেন না, ওই সময়টার একটা ফিলিংয়ের ভেতর দিয়ে হাঁটবেন।

এ রুমটার নাম কী হবে, তারও একটা গল্প আছে। জাদুঘরের কাজ যখন চলছিল, তখন আমাদের বিভিন্ন উপদেষ্টা এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়ই দেখতে আসতেন। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভাইও প্রায়ই আসতেন। জাদুঘরের বাইরে তখন পোড়া গাড়িগুলো স্ট্যাক করে আমরা একটা স্কাল্পচারের মতো বানাচ্ছিলাম। একদিন খলিলুর ভাই সেটা দেখে বললেন, ‘রেমন্যান্টস অব ফ্যাসিজম।’ কথাটা আমার মাথার মধ্যে থেকে গেল। এরপর তাকে নিয়ে জাদুঘরের ভেতরে ঢুকলাম। তখনো ষোলো বছরের এ রুমটার কোনো নাম আমরা দেইনি। রুমে ঢুকেই হঠাৎ আমার মাথায় এলো।

আমি বললাম, খলিলুর ভাই, আপনার কাছ থেকে একটু আগে একটা জিনিস চুরি করলাম। আপনি বাইরে গাড়িগুলো দেখে ‘রেমন্যান্টস অব ফ্যাসিজম’ বললেন না? অ্যাকচুয়ালি সেখান থেকে আমি একটা আইডিয়া পেলাম। এই যে ষোলো বছরের রুমটা, যেখানে কাচের নিচে একটা ভেঙে পড়া ফ্যাসিস্ট শাসনের রাবলস থাকবে, চারপাশে থাকবে ষোলো বছরের ইতিহাস-এ রুমটার নাম আমরা দিই ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’।

এভাবেই রুমটার নাম হয়ে গেল-‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’। এখন গ্যালারিতে ঢুকলে দেখবেন, ওপর থেকে ফ্লোরে একটা প্রজেকশন পড়ে। সেখানে লেখা-‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’।

এরপর আমি বললাম, এ রুমের চারপাশে ষোলো বছরের হাইলাইটসও থাকতে হবে, অনেকটা গ্যালারি এক্সিবিশনের মতো।

গুম, খুন, নির্বাচনবিহীন নির্বাচনের নামে সার্কাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, বিচারিক হত্যাকাণ্ড, বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, লুটপাটতন্ত্র, ক্লেপ্টোক্রেসি, সংবাদপত্রের ওপর দমন-এগুলোর প্রত্যেকটার ওপর আলাদা আলাদা ডিসপ্লে থাকবে। আর রুমের মাঝখানে থাকবে গণভবনে পাওয়া বেশকিছু দলিল, যেগুলোতে দেখা যায় হাসিনা কীভাবে মানুষকে টার্গেট করতেন।

তানজিম এগুলো সাজানোর কাজ করল। প্রথমে একটা অন্য রকম স্ট্রাকচার করেছিল, তা-ও সুন্দর ছিল। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, এত কিছুর মধ্যে তা একটু হারিয়ে যাচ্ছে। তখন বললাম, একটা কালো ফ্রেমের স্ট্রাকচার করা হোক। পরে তানজিম সেটাকে সেভাবেই করল। ফাইনালি রুমটা খুবই ইফেক্টিভ একটা রুম হয়ে দাঁড়াল।

বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর : ফ্যাসিজমের ডিএনএ : ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’ থেকে বের হয়ে বামে একটা করিডর আছে। এ করিডরটা আমার করার ইচ্ছা ছিল ‘বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর’। অর্থাৎ বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরে কী কী হয়েছে, তার হাইলাইটসগুলো দিয়ে এ করিডরটা তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল।

এ লক্ষ্যে আমরা রিসার্চও কমপ্লিট করেছিলাম। একটা আলাদা রিসার্চ টিম এ কাজটা করেছিল। তারা আমাদের মিউজিয়ামের সঙ্গে সরাসরি কাজ করত না। তানজিমও ছিল। আমরা মিটিংয়ে বসে ঠিক করেছিলাম কীভাবে কাজটা হবে। এ করিডরের জন্য আমার নিজেকেও প্রচুর বই পড়তে হয়েছে। সেখান থেকে আমি বাছাই করা বইগুলো তাদের দিয়েছি। কোন কোন জিনিস আমরা চাই, তাও বলে দিয়েছি। তারা সেখান থেকে সেগুলো বাছাই করেছে।

এ করিডরটা করার পেছনে আমার একটা পরিষ্কার চিন্তা ছিল। আপনি ‘রিমেইনস অব ফ্যাসিজম’-এ হাসিনার ষোলো বছরের ফ্যাসিজম দেখলেন। সেখান থেকে বের হয়ে করিডরে আপনি দেখবেন আমাদের দেশে ফ্যাসিজমের প্রথম চেহারাটা-বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর। আমার কাছে ষোলো বছরের এ ফ্যাসিজমের ডিএনএ ছিল আসলে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের ফ্যাসিজমের মধ্যে। সেই ডিএনএটা দেখানোর জন্যই আমি এ করিডরটা করতে চেয়েছিলাম।

রিসার্চ রেডি ছিল। আনফরচুনেটলি, শেষ পর্যন্ত আমি যখন দায়িত্ব থেকে সরে গেলাম, তারপর আর এটা করা যায়নি। কারণ উদ্বোধনের আগে বেশ কয়েক মাস আসলে চিফ কিউরেটর, রিসার্চার, প্রোডাকশন টিম মিউজিয়ামে কোনো কাজ করতে পারেনি।

বর্ডার কিলিং : বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর যে প্যাসেজে করার কথা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে ডানদিকে গেলে এখন একটা ছোট রুম আছে, যেটা এখন ‘ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স’ নামে আছে। এ রুমটাই ছিল আমাদের ‘বর্ডার কিলিং’ রুম। রুমটার মধ্যে কাঁটাতারের সঙ্গে বর্ডারে খুন হওয়া মানুষদের নাম ঝুলানো ছিল। নামগুলো স্টিলের নেমপ্লেটে ছিল। বর্ডার কিলিং রুমের ফটোগ্রাফিগুলো এসেছিল পারভেজ আহমেদ রনির কাছ থেকে।

এখন কেউ ভাবতে পারেন আচ্ছা আওয়ামী দুঃশাসনের প্রসঙ্গে বর্ডার কিলিং কীভাবে প্রাসঙ্গিক? সাদা চোখে তাই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু এর উত্তর ছিল ওই রুমের ঠিক দরজার কাছে থাকা একটা টিভি স্ক্রিনে। যেখানে ফেলানীর বাবার একটা ডকুমেন্টারি চলত একটানা। সেখানে ফেলানীর বাবা বলছেন-আমার মেয়েকে বিএসএফ খুন করল, অথচ আমার সরকার আমার মেয়ের পক্ষে কথা না বলে ভারত সরকারের পক্ষে কথা বলছে। এ কেমন সরকার? আমরা এরকম সরকার চাই না। একজন বাবার এ ক্ষোভটাই আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই যে একটা তাঁবেদারি সরকার যখন নিজ নাগরিকের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে অন্য দেশের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন এটা আর জাস্ট অন্য দেশ কর্তৃক কিলিং হিসাবে থাকে না। এটাকে আরও নানাভাবে পাঠ করতে হয়। এ কারণেই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল সেখানে একটা বড় আইকন হয়ে ওঠে ফেলানী। দেখেন, আমি কোনো দেশের সঙ্গেই চিরস্থায়ী প্রেম কিংবা ঘৃণায় বিশ্বাস করি না। যে কারণে ভারতের হাসিনা নীতির সমালোচনা করেও গত বছর পূজায় ইলিশ পাঠানোর কথা বলেছি। বলে গালও খেয়েছি অবশ্য।

তো অবশ্যই আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই, ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। এ কারণে আগস্ট চব্বিশে আমি লিখেছিলাম, সময় এসেছে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ভারতের তরফ থেকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করার এবং আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার। তা কতটা হয়েছে, সেটা আরেক বিতর্ক। কিন্তু সম্পর্ক রিসেট করা মানে ইতিহাস বলা যাবে না তা তো নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলা বন্ধ করতে হবে? ভারতও কি আজ ব্রিটেনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য নিজের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বলা বন্ধ করে দিয়েছে? তা তো নয়। ব্রিটেনের সঙ্গে তাদের দারুণ সম্পর্ক আছে, আবার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসও তারা বলে।

আমরাও ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চাইব, কিন্তু ইতিহাসের কথাও বলব। ইতিহাসটা বলা দরকার, যাতে বাংলাদেশ এবং ভারত-দুই রাষ্ট্রই মনে রাখতে পারে, এ কাজগুলো আর রিপিট করা ঠিক হবে না। এগুলো রিপিট হলে দুই দেশের সম্পর্ক আবার তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

বিডিআর : বর্ডার কিলিংয়ের পর ছিল বিডিআর রুম। আমরা জানি, হাসিনার ফ্যাসিবাদের শুরু আসলে বিডিআর কিলিংয়ের মধ্যদিয়ে। পিলখানা ট্র্যাজেডির মধ্যদিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। এবং হাসিনা ও তার আধিপত্যবাদী প্রভুরা বুঝে যায়, এবার বাংলাদেশকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে কন্ট্রোল করা যাবে। কোনো ইলেকশন দেওয়া লাগবে না, যা ইচ্ছা তা করা যাবে। গুম করা যাবে, যা ইচ্ছা করা যাবে। ফলে বিডিআর রুমটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ রুমের জন্য কাজ করেছে ফাবলিহা বুশরা এবং জুবায়ের ইবনে কামাল।

বিডিআর রুমটা একটা হৃদয়বিদারক রুম। এ রুমে সারাক্ষণ একটা ডকুমেন্টারি চলতে থাকে-‘পিলখানা : থার্টি সিক্স আওয়ার্স অব ট্র্যাজেডি’। এ ছাড়া সেখানে বিডিআরের বিভিন্ন ফোনকল শোনা যায়। আরও অনেক স্মৃতিচিহ্ন এ রুমে নিয়ে আসা হয়েছে। এ রুমে যে কেউ গেলে তার কান্না পায়।

এখানকার ফটোগ্রাফি জোগাড় করার ক্ষেত্রেও তানজিম একদম রাইট মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যাতে আমরা ছবিগুলো পেতে পারি। পিলখানা, তারপর শাপলা চত্বর-এগুলো আমাদের কিউরেটোরিয়াল ফিলোসফির অংশ ছিল। আপনারা আমাদের জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানের তালিকা দেখলেই বুঝবেন এগুলোকে আমরা কোর এরিয়া হিসাবে চিহ্নিত করেই এগিয়েছি। কারণ এগুলোর মধ্যদিয়েই ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

শাপলা চত্বর : এরপর ছিল শাপলা চত্বরের রুম। এ রুমটার রিসার্চের ক্রেডিট মহিম মাহফুজ এবং হাসান ইনামের। তারা দুজন যাবতীয় ম্যাটেরিয়াল কালেকশন থেকে শুরু করে শহীদদের অবজেক্ট, নানা গল্প-সব সংগ্রহ করেছে। শাপলা শহীদদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। এ রুমের রিলেভেন্ট ফটোগ্রাফিগুলোও কালেক্ট করেছেন তানজিম ওয়াহাব। কারণ তিনি জানতেন, এ ফটোগ্রাফগুলো কার কাছে আছে। এ রুমটা আমাদের স্তব্ধ করে দেয়।

রুমের মাঝখানে যে স্কাল্পচারটা আছে, তারও একটা গল্প আছে। স্কাল্পচারটা আসলে প্রথমে একটা মিনিয়েচার হিসাবে আমাকে বানিয়ে দেখানো হয়েছিল-বাইরে এটাকে বড় করে করা হবে কি না, তা দেখার জন্য। আমি তা দেখে বললাম, এটা তো শাপলা চত্বরের রুমে থাকাই আইডিয়াল। এ স্কাল্পচারটার দিকে তাকালে প্রচণ্ড বেদনাহত হয়ে যেতে হয়। পরে আমরা এটাকে এ রুমেই রাখলাম।

শাপলা চত্বরের ঘটনা যখন ঘটে, মিডিয়া আমাদের মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। এটা হিস্টরিক ফ্যাক্ট। এটাকে আমাদের উল্লেখ করতে হবে। এটা ভুলে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মিডিয়া আমাদের বলেছিল, সেদিন তেমন কিছু হয়নি। বরং সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল অল্প শক্তি ক্ষয় করে তাদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। ফলে আমরা রুমের একপাশে রেখেছিলাম সেই সময়কার মিডিয়ার এডিটোরিয়ালগুলো। আরেক পাশে ছিল অধিকারের রিপোর্ট, যেখানে বলা হয়েছিল এক রাতে ৬১ জন মানুষ মারা গেছে। এ কনট্রাস্টটা আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল-কীভাবে জার্নালিজম ফ্যাসিজমকে গ্রো করতে সাহায্য করে এটা বোঝার জন্য।

পরে আমি জানি না কার পরামর্শে মিডিয়ার সেই এডিটোরিয়াল এবং শহীদদের তালিকা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, এ দুটি পাওয়ারফুল এলিমেন্ট সরিয়ে দেওয়া রুমটাকে ফ্যাকচুয়ালি দুর্বল করেছে। তারপরও রুমটা এখনো পাওয়ারফুল।

ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স থেকে গুম : পিলখানা এবং শাপলা চত্বরের পর আমরা রেখেছিলাম ক্যাম্পাস ভায়োলেন্স, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ। তারপর বাঁ দিকে গেলে আসে টর্চার রুম এবং গুম। আমরা প্রথম থেকেই জানতাম-গুম আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সেকশন হবে।

টর্চার রুম এবং গুম : মিউজিয়ামের কাজ শুরুর একদম প্রথম থেকেই আমরা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে খুব নিবিড়ভাবে কাজ করছিলাম। একদিন আমি তাজুল ভাইকে (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর, আইসিটি) ফোন দিলাম। বললাম, উনি এবং উনার টিমের মেম্বাররা যদি আমাদের সঙ্গে একটু বসেন। এরপর উনি আমাদের এখানে আসেন।

জুলাই জাদুঘরের জন্য গণভবনে আমরা যেসব কাগজপত্র পেয়েছিলাম, যেগুলো আইসিটির কাজে আসতে পারে, সেগুলো আমরা তাদের হাতে তুলে দিই। একইসঙ্গে আমি প্রস্তাব দিই-আপনাদের কাছে এমন যেসব ডকুমেন্ট বা জিনিসপত্র আছে, যেগুলো হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্ট হিসাবে আমরা মিউজিয়ামে এক্সিবিট করতে পারি, সেগুলো আমাদের দেন। শুরু থেকেই আমরা এ ধরনের কোলাবোরেশন করছিলাম। আমরা তাদের জিনিস প্রোভাইড করেছি, আবার তারাও আমাদের জিনিস প্রোভাইড করেছে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আমি গুম কমিশনের সঙ্গেও বসি। নাবিলাকে (নাবিলা ইদ্রিস, সদস্য, গুম কমিশন) একদিন ফোন দিয়ে মিউজিয়ামে ইনভাইট করি। তানজিমসহ আমাদের রিসার্চাররা ছিল-খোন্দকার রাকিব, রোবায়েত, সাগর, জোহানসহ আরও অনেকে।

টর্চার রুম এবং গুমের রুম-এ দুটি রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল এভাবেই এসেছে। টর্চার রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল আমরা পেয়েছি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের কাছ থেকে। আর গুমের রুমের বেশির ভাগ ম্যাটেরিয়াল এসেছে মশফিকুর রহমান জোহানের কাছ থেকে। কারণ বাংলাদেশের গুমের ওপর এত এক্সটেনসিভ কাজ আর কেউ করেছে বলে আমার জানা নেই। আপনারা জানেন, মায়ের ডাকের সঙ্গে মশফিকুর রহমান জোহান যুক্ত ছিল। ওর ফটোগ্রাফিক সেন্স এবং ‘অ্যাবসেন্স’ আর ‘প্রেজেন্স’ নিয়ে ওর আর্টিস্টিক ভাবনা অসাধারণ। তাও তার ফটোগ্রাফির মধ্যেও ধরে রেখেছে। এ রুম সাজাতে জোহানের সঙ্গে গবেষণা করেছে রুম্মানা জান্নাত।

গুম হওয়া মানুষদের পরিবারগুলোর সঙ্গে জোহান দীর্ঘদিন কাজ করেছে, ফটোস্টোরি করেছে, সিরিজ করেছে। ফলে ওর কাছ থেকে এ ম্যাটেরিয়ালগুলো নিয়ে আমরা গুমের রুমটা সাজাই। পাশাপাশি আপনারা জানেন, গুম নিয়ে আমরা অনেক ডকুমেন্টারি করেছি। সেগুলো একটু পরে, যখন আমরা মুনসুন থিয়েটার নিয়ে কথা বলব, তখন আসবে। তখন বাংলাদেশের অসাধারণ সব তরুণ ফিল্মমেকার এ জুলাই জাদুঘরের পেছনে কী ভূমিকা রেখেছে তা আসবে।

তো যে কথা বলছিলাম-গুম কমিশন এবং আইসিটির কাছে গুমের ভুক্তভোগী, গুমের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা মানুষ এবং হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা মানুষদের বিভিন্ন সাক্ষ্য ছিল। সে সাক্ষ্যগুলোর ভিত্তিতে টর্চার এবং গুমের বিভিন্ন ঘটনার কিছু ইলাস্ট্রেশন তৈরি হয়েছিল-এর মধ্যে লাশ কেটে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনার ইলাস্ট্রেশনও ছিল। সেই ইলাস্ট্রেশনগুলো আমরা তাদের কাছ থেকে নিই। সেগুলো দিয়ে একটা অ্যানিমেশন তৈরি করা হয়, যেটা গুমের রুমে রাখা হয়েছে। এটা দেখলে গা শিউরে ওঠে। এইভাবে টর্চার এবং গুমের রুম তৈরি করতে আমরা এ কমিশন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য নিয়েছি।

হাসিনার অফিস এখন শহীদদের : প্রথম থেকেই একটা ব্যাপারে আমরা একমত ছিলাম হাসিনার অফিস রুমের মালিক এখন শহীদরা। রুমজুড়ে জুলাইয়ের শহীদদের ছবি থাকতে হবে। সে অনুযায়ী আবদুল হালিম চঞ্চল এবং জিহান করিম কাজ করে।

এর আগেও উল্লেখ করেছি জুলাই জাদুঘর এবং আইসিটির সঙ্গে প্রথম থেকেই একটা নিবিড় কাজের সম্পর্ক ছিল। একদিন তাজুল ভাই আমাকে ফোন করে বললেন, ভাই, আমাদের কাছে অজস্র ফোন রেকর্ডিং আছে, কল রেকর্ডিং আছে-জুলাই চলাকালে হাসিনা কী কী অর্ডার করেছে, কার সঙ্গে কী কথা বলেছে। এগুলো আমরা আপনাদের দিতে পারি। পরে এ অডিওগুলোর অনেক আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান পায় এবং ফরেনসিক্যালি ভেরিফাই করে। ফলে এ অডিওগুলো আমাদের কাছে একটা বিরাট সম্পদ হয়ে গেল। কিন্তু এগুলো নিয়ে কী করব?

আমরা প্রতিদিন মিটিংয়ে বসছি। বারবার চিন্তা করছি-এ অডিওগুলো মিউজিয়ামে কীভাবে দেখাব বা শোনাব? কোনো সলিউশন খুঁজে পাচ্ছি না। হঠাৎ একদিন একটা সমাধান নাজিল হলো। আমি মিটিংয়ের মধ্যে উঠে বলে উঠলাম, তানজিম ভাই, একটা কাজ করেন। এসব অডিও, হাসিনার কনভার্সেশন, একটা লাল ফোনে দিয়ে দেন। লাল ফোনটা হাসিনার টেবিলের ওপর থাকবে। আর ফোনের পাশে একটা ক্যাটালগ থাকবে। মানুষ সেই ক্যাটালগ দেখে নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করবে। ডায়াল করে শুনতে পারবে-হাসিনা পুলিশের আইজিকে কী বলেছে, কবে গুলির অর্ডার দিয়েছে, কার সঙ্গে কী কথা হয়েছে, সবকিছু।

তানজিম ততদিনে আমার হুটহাট নতুন জিনিস নাজিল হওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। যেমন একদিন হঠাৎ বললাম, তানজিম ভাই, আপনি আগামী তিন দিনের মধ্যে চায়না চলে যান। আমি চায়না মিউজিয়ামের সঙ্গে কথা বলছি। গ্লোব টিভি এবং ইমার্সিভ রুম করার জন্য ওখানে কিছু জিনিস দেখে আসেন। আমি ইনস্টাগ্রাম থেকে কিছু রেফারেন্স পাঠিয়ে বললাম, এগুলো দেখে আসেন। এগুলো আমাদের এখানে ইনস্টল করতে হবে। এখানে একটা কথা বলে নিই-তানজিম ওয়াহাব যেহেতু ওই জগতের লোক ফলে সেসব জায়গায় বেস্ট মানুষদের হেল্প নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেমন-প্রজেকশন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ইনস্টলেশনের ক্ষেত্রে শিল্পী জিহান করিম অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে।

তো লাল ফোনের আইডিয়াটা শুনে তানজিম আবার চিন্তায় পড়ল-এটা কীভাবে করবে? বলল, ভাই, আমাকে একটু সময় দেন। দুয়েক দিন পরে এসে বলল, ভাই, আমি সলিউশন পেয়েছি। বুয়েটের একটা টিম আছে। ওরা আমাদের এটা করে দিতে পারবে। এখন জাদুঘরে গেলে আপনারা সেই লাল ফোনটা দেখতে পারবেন। ক্যাটালগ দেখে নম্বর ডায়াল করে একটার পর একটা অডিও শুনতে পারবেন। আমার মনে হয়, হাসিনার অফিস রুমটা এখন মিউজিয়ামের অন্যতম ফ্যাকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট এবং একইসঙ্গে অন্যতম আকর্ষণীয় রুম হয়ে উঠেছে। এ রুমে নেত্র নিউজের করা জুলাইয়ের অসাধারণ ডকুমেন্টেশনও রাখা আছে।

একরামের মেয়ের দেওয়াল : হাসিনার অফিস রুমে এখন আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে। কক্সবাজারের একরামের কথা মনে আছে? যার ক্রসফায়ার সারা বাংলাদেশকে নাড়া দিয়েছিল। বাবার মৃত্যুর পরে তার মেয়ে ভীষণভাবে ট্রমাটাইজড হয়ে যায়। সে সারাক্ষণ দেওয়ালে বাবার সঙ্গে কথা লিখত, অনেক কিছু লিখে রাখত, ছবি আঁকত। সেখানে এমন অনেক কথা আছে, যেগুলো দেখলে বুক ফেটে যায়। একটা ছোট বাচ্চা কতটা ট্রমায় পড়লে দেয়ালে লিখতে পারে-‘আই হেইট মাই কান্ট্রি’।

এ দেওয়ালের ছবি তুলেছিল জোহান। ফটোগ্রাফার জীবন আহমেদও তুলেছিল। প্রথমে এ দেওয়ালের ছবিটা হাসিনার অফিস রুমে একটা র‌্যানডম জায়গায় লাগানো ছিল। আমি দেখে বললাম, এটা তুলে হাসিনার অফিস রুমে যে চেয়ারটা আছে, সেই চেয়ারের ঠিক পেছনের পুরো দেওয়ালজুড়ে ইন্সটল করে দাও। আর দুই পাশে থাকবে শহীদদের ছবি। সরকার নামের মনস্টার একটা ছোট বাচ্চাকে কোন পর্যায়ের ট্রমাতে ফেলতে পারে সেটা ওই দেওয়ালের লেখা পড়লে বোঝা যায়। সামনে হাসিনার সিংহাসন এবং পেছনে ছোট বাচ্চাটার ওইসব হৃদয়বিদারক দেওয়ালের লেখা। তখন জিনিসটার একটা অন্য মানে তৈরি হবে। বহু মানুষ সেখানে গিয়ে কান্না আটকাতে পারে না।

শেষ অধ্যায় : এবার আসি দোতলায়। নিচতলার গল্প যেখানে শেষ, দোতলায় আমরা পুরোটা জুলাইয়ের গল্প বলতে চেয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই দেখবেন আবু সাঈদকে। উঠে প্রথম রুমটা ইমার্সিভ রুম। এখানে আপাতত আটটা ছবি আছে, সামনে আরও বাড়বে। আমাদের লক্ষ্য ছিল জুলাইয়ের যত অ্যাঙ্গেল আছে-মফস্বল, নারী, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, মাদ্রাসা, ডাক্তার, প্রবাসী, রাজবন্দি, রাজনৈতিক দল-প্রতিটা নিয়ে তিন-চার মিনিটের ইমার্সিভ ফিল্ম তৈরি করা। এ ছবিগুলো নির্মাণের জন্য জাহিন ফারুক আমিন এবং সালজার রহমানকে ধন্যবাদ জানাই।

এছাড়া করিডরজুড়ে আছে জুলাইয়ের ৩৬ দিনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ছবি। অসাধারণ এসব ছবির জন্য জীবন আহমেদসহ সব ফটোগ্রাফারদের স্যালুট। জুলাই আমরা তাদের চোখেই দেখেছি। স্যালুট বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ ও মোজো জার্নালিস্টদেরও। এছাড়া দোতলায় আমরা হাসিনার বেডরুম, পাঁচ আগস্ট নিয়ে অগোপগোর টয় রুম, ৩৬ দিনের টাইমলাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ করে যেতে পারলেও, অনেক কাজ আমরা পুরো শেষ করে যেতে পারিনি।

পরিকল্পনা ছিল রাজনৈতিক দল, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, প্রবাসী, নারী ও আহতদের নিয়ে আলাদা সেকশন করা। কিছু হয়েছে, কিছু এখনো হচ্ছে। কোথাও কোথাও একটু পলিটিক্যালি ওভারকিল করা হয়েছে। কোথাও তাড়াহুড়া আছে। ওইসব জায়গায় প্রেজেন্টেশন দুর্বল। ফলে দোতলা এখনো আমার কাছে ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মানুষ যায় হাসিনার বেডরুমে। আমরা চেয়েছি অফিস রুমের মতো তার বেডরুমটাও শহীদদের দখলে যাক। এখানে শহীদ ও আহতদের স্মারক রাখা হয়েছে। হাসিনার বিছানার চাদরের ওপর ৮৩৫ জন বীর শহীদের নাম খোদাই করা, পাশে একজন শহীদের রক্তাক্ত কাপড়। এ রুমে বহু মানুষকে আমি কাঁদতে দেখেছি। এরপর লাইব্রেরিতে আছে আবু সাঈদের টেবিল, যেখানে সে লিখে রেখেছিল-‘ডু অর ডাই।’ বিল্ডিং থেকে বের হয়ে ওয়াটার বডির দিকে গেলে দেখা যাবে জিয়াউল আহসানের গেস্টাপো কায়দায় মানুষ খুনের ডিসপ্লে। কীভাবে সে হাজারখানেক মানুষ খুন করেছে তার রিয়াল ফুটেজ, ছবি, স্কাল্পচার এবং বর্ণনা আছে।

সেখান থেকে ডান দিকে গেলে ‘বিল্ডিং ফ্রম দ্য স্ক্র্যাচ’-৫ আগস্টের পর সরকার নাই, পুলিশ নাই, সেই সময় ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ কীভাবে বাংলাদেশটা সামলেছে, তার গল্প ও স্মারক। সামনে হাঁটলে আছে আয়নাঘরের রেপ্লিকা। মূল আয়নাঘরের আদলে আর্ট ডিরেক্টর শিহাব নবী এটি তৈরি করেছেন। এখানে গুমের ভিকটিমদের গল্পও আছে। আর সবশেষে মুনসুন থিয়েটার। পিলখানা, গুম, আবরার ফাহাদ, জুলাই ম্যাসাকারসহ আমাদের তৈরি বিভিন্ন ডকুমেন্টারি এখানে নিয়মিত দেখানো হয়। এ রুমেই একসময় হাসিনা প্রেস কনফারেন্সের নামে মিথ্যাচার করত, সাংবাদিকরা তাকে তেল দিত। আজ সেই একই রুমে মানুষ বসে তার কুকীর্তির ইতিহাস দেখে-এই আইরনিটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এ অসাধারণ কাজগুলো বানানোর জন্য ধন্যবাদ জানাই অনম বিশ্বাস, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রাকা নোশিন, শাহরিয়ার সজীব, দীপক গোস্বামী, নাজিম পলাশ, নাজমুল নবীন, মাহাথির স্পন্দন, ইয়াসির হক, সাদিয়া ইসলাম রোজা, সুকর্ণসহ আরও অনেককে। এগুলোর ম্যানেজমেন্ট এবং কমপাইলেশন দেখেছে শান্তা রহমান।

প্রথম থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল, জুলাই জাদুঘরকে আমরা একটা স্ট্যাটিক জাদুঘর হিসাবে ভাবব না। এটা যেন প্রতিনিয়তই নতুন জিনিস যোগ করে। জুলাই নিয়ে গবেষণা চলবে, নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি হবে। এবং সেগুলো শুধু জুলাই বা ষোল বছর নিয়ে নয়-আমাদের দেড়শ বছরের ইতিহাস নিয়েও। এটা যেন বাংলাদেশের কালচারাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের একটা হাব হয়ে ওঠে। এটার রিসার্চ এবং কনটেন্ট ফান্ডিং নিয়ে আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল সেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে এটা শুধু জুলাই না, বাংলাদেশের কালচার ও পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের সেন্টার হয়ে উঠবে।

শেষ করব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে। তার নির্দেশনাতেই নানামুখী ষড়যন্ত্রের পরও এ জাদুঘর মানুষের জন্য খোলা গেছে। এখানে উল্লেখ্য, ২০২৪-এর সেপ্টেম্বর তিনি গণভবনকে জুলাই জাদুঘরে রূপান্তর করার কথা বলেছিলেন। কাকতালীয় মিল হলো সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার একই সময়ে একই কাজের প্রস্তুতি চালাচ্ছিল। তাদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আরও ধন্যবাদ দিতে চাই সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান ও আসিফ নজরুলকেও। বিশেষ ধন্যবাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জাতীয় সংসদে এই জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেওয়ার জন্য, এই জাদুঘরকে আমাদের ইতিহাসের সেইফগার্ড ভাবার জন্য। ধন্যবাদ রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, সব রাজনৈতিক দলকে এই জাদুঘরটি পাশের জন্য। এবার আপনাদের আরেকটু ভূমিকা আমরা চাই-যাতে এ জাদুঘর নিয়ে যে প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল সেটা যেন বাস্তবায়িত হয়।

দ্রুত মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনারসহ সব পদে নিয়োগ দিন। এ মিউজিয়ামের পরিকল্পনাই হয়েছে মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার মাথায় রেখে। অর্থাৎ প্রতিটি এক্সিবিট সাজানো হয়েছে এর সঙ্গে মিলিয়ে মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার কি স্টোরিটা বলবে সেটা মাথায় রেখে। এটা এতটাই ফান্ডামেন্টাল এই মিউজিয়ামের জন্য যে আমি যতদিন ছিলাম ভিআইপি গেস্ট বা বিদেশি অতিথিদের সামনে আমি মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনারের কাজ করতাম। প্রধান উপদেষ্টা যখন তিন প্রধান দলের নেতাদের নিয়ে যান, তখনো আমি ছিলাম এক্সপ্লেইনার। কথা ছিল মিউজিয়াম এক্সপ্লেইনার নিয়োগের পর আমি নিজে ওদের ট্রেইনার হব। ট্র্যাজেডি এই যে এখনো কোনো এক্সপ্লেইনার তো দূরের কথা, নিয়োগই হয় নাই যদিও হাতে পাঁচ মাস সময় পাওয়া গিয়েছিল। এখন মিউজিয়াম চলছে জুলাই একদল নিবেদিত প্রাণ ভলান্টিয়ার দিয়ে। আর আছে আমাদের সব বিপদের মুখে ছাতা হয়ে থাকা মন্জুরুল ইসলাম নান্টু, ফারহান মাসুদ এবং অন্যরা। যারা এখনো প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমই দিচ্ছেন। -যুগান্তর


লেখক: বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, চলচ্চিত্র নির্মাতা। যিনি জুলাই জাদুঘরের আর্টিস্টিক ডিরেক্টরের ভূমিকাও পালন করেছেন।

এ বিভাগের আরও সংবাদ