বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে হত্যার আজ সাত বছর পূর্ণ হলো। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তাকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২১ সালে বিচারিক আদালত রায় দেন এবং ২০২৫ সালে হাইকোর্টও সেই রায় বহাল রাখেন। তবে আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় মামলাটি এখন আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে জানিয়ে এই মামলায় আসামি পক্ষের অন্যতম আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু মঙ্গলবার (৬ অক্টাোবর) দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, ‘হাইকোর্ট যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন, তাদের একজন মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম। বিশেষজ্ঞ সাক্ষীসহ কোনো সাক্ষী ভিডিওতে তাকে শনাক্ত করেননি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক আসামি মো. মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়নের হাতের লিগামেন্ট ছেঁড়া, তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম, তার পক্ষে মারধর করা সম্ভব নয়–এসব যুক্তি তুলে ধরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করেছি। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে এটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।’
সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাবে এই আইনজীবী বলেন, এই যুক্তি আগের কোর্টেও দিয়েছি। কিন্তু বিচারিক আদালতের রায় ও হাইকোর্টের রায়ের কোনোটিতেই এই যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ‘ফাইন্ডিং’ দেওয়া হয়নি। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই যুক্তি আপিল বিভাগের শুনানিতেও তুলে ধরব।
আবরার ফাহাদের মরদেহ উদ্ধারের পর তার বাবা বরকতউল্লাহ রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করেন। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ওই মামলার রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারিক আদালতের দেওয়া ওই রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে ডেথ রেফারেন্স বলা হয়। এই মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
রায়ে যা বললেন হাইকোর্ট
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, আবরার ফাহাদ শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, শুধু এমন অভিযোগে অভিযুক্তরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে বলে দেখা যায়। কিন্তু কোনো বিবেকবান ব্যক্তির কাছে এ ধরনের নির্মম ও অমানবিক নির্যাতন করার এটি কোনো যুক্তি হতে পারে না; যেখানে তারা নিজেদের বুয়েটের মেধাবী ছাত্র বলে দাবি করেন। হতে পারে ভুক্তভোগীকে পেটানোয় কিছু অভিযুক্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেননি, কিন্তু এর মানে এ নয় যে তারা শাস্তির বাইরে থাকবেন। তারা সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যা ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা ভুক্তভোগীকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি, যা এ হত্যাকাণ্ডকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেওয়া।
রায়ে উচ্চ আদালত বলেন, ভুক্তভোগী আবরার ফাহাদকে পেটানোর ঘটনায় কিছু অভিযুক্তকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে এবং কিছু অভিযুক্তকে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখা যায়। কিন্তু তাদের কেউই ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেননি। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্টতই প্রমাণ হয় তাদের অপরাধের মানসিকতা ছিল এবং উপস্থিতির মাধ্যমে তারা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণে যা উঠে এসেছে
আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যার ওই ঘটনায় সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আদালতের রায়ে দণ্ডিতদের সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) নেতা-কর্মী।
অধস্তন আদালত বা বিচারিক আদালতের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, চাক্ষুষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষীদের সাক্ষ্য, সরকারি সাক্ষীদের সাক্ষ্য, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রদর্শিত নথিপত্র ও সিসিটিভির পুরো ফুটেজ বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, নিঃসন্দেহে সব আসামি পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন
অভিযোগ এনে তাকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে।
কী ঘটেছিল সেদিন?
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মীর নির্মম নির্যাতনে নিহত হন আবরার ফাহাদ। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ওই ঘটনার পর গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তাতে বলা হয়েছিল যে, সেদিনই কুষ্টিয়ার বাড়ি থেকে বুয়েটে এসে শেরেবাংলা হলে নিজের ১০১১ কক্ষে এসেছিলেন আবরার।
ফেসবুকে ভারতবিরোধী একটি পোস্টের জের ধরে রাত ৮টার দিকে তাকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। পরে রাত ৩টার দিকে জানা যায় যে আবরারকে হত্যা করে একতলা ও দোতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি ফেলে রাখা হয়েছে। পরে জানা যায়, তাকে ‘শিবির আখ্যা’ দিয়ে দুই দফায় দুটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয় এবং পরে বুয়েট মেডিকেলের ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর মধ্যে খবর পেয়ে রাত ২টার দিকে টহল পুলিশের একটি দল হল গেটে গেলে তাদের হলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে ৪টার দিকে পুলিশ আবার হলে যায়। এরপর ডাক্তার মৃত ঘোষণার করলে পুলিশ মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পরে পুলিশের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় যে, আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
আমরা মামলায় কোনো বিলম্ব ঘটাতে চাই না: অ্যাটর্নি জেনারেল
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায় বহাল থাকায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেনি বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস। মঙ্গলবার তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ মামলায় আমাদের অবস্থান হচ্ছে–আমরা মামলায় কোনো বিলম্ব ঘটাতে চাই না। নাগরিকের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির যে সাংবিধানিক অধিকার, আমরা চাই সেটা নিশ্চিত হোক।’
তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এই মামলার শুনানি শুরু হলে সে শুনানির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো রকম বিলম্ব ঘটানো হবে না। আমরা একদিন শুনানি মুলতবি চাইব না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হওয়া উচিত। মানুষ এই মামলার রায় কার্যকর দেখতে চায়।’





