শিরোনাম
Advertisement
শিক্ষা প্রশাসন

কালবেলার প্রতিবেদন

গ্র্যাজুয়েটদের চাকরিযোগ্য করতে ৮০ কোটি টাকার প্রকল্প মাউশির

Advertisement

উচ্চশিক্ষার গণ্ডি পেরিয়েও চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছেন না লাখ লাখ তরুণ। শিক্ষাগতযোগ্যতা থাকলেও কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার ঘাটতি তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে বেশিরভাগই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। এ দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করে বিশাল গ্র্যাজুয়েট জনগোষ্ঠীকে দেশ-বিদেশে চাকরিযোগ্য ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রস্তুত করতে ৮০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এর আওতায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার শিক্ষার্থীকে আধুনিক প্রযুক্তি, সফট স্কিল, ইংরেজি দক্ষতা এবং ইন্ডাস্ট্রিভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়লেও কর্মসংস্থান কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতেও সরকার নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অজস্র তরুণকে প্রশিক্ষিত করার পরও তাদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। তাই প্রশিক্ষণ, ভাতাসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কী সুফল মিলেছে, তার মূল্যায়ন জরুরি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প হিসেবে ‘কলেজ/উচ্চ শিক্ষার্থী/গ্রাজুয়েটদের বৈশ্বিকমানের কর্ম-উপযোগীকরণ’ শিরোনামের একটি প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মাউশি। ৮০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের ২০ কোটি খরচ করবে সরকার। বাকি ৬০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অনুদান পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রকল্পটির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য ৫ কোটি, আরেকটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

গতকাল বুধবার যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পটির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিগগির সক্ষমতা যাচাই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মূল প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ৩ বছর, যা ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।

মাউশি-সংশ্লিষ্টরা এবং শিক্ষা বিশ্লেষকরা জানান, বর্তমান বিশ্বে শুধু শিক্ষাগত ডিগ্রি থাকলেই চাকরি পাওয়া সহজ নয়। কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন, যেন তারা শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক চাকরির বাজারেও টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে শিক্ষিত যুবকদের একটি বড় অংশ দক্ষতার ঘাটতির কারণে কর্মসংস্থানে পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সফট স্কিল, ডিজিটাল দক্ষতা এবং ভাষাগত সক্ষমতা না থাকায় তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মানসম্পন্ন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিভিন্ন গবেষণা তথ্য বলছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ চাকরি পাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, শিক্ষিত তরুণদের চাকরির বাজারের সঙ্গে শিক্ষার অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। দেশের চাকরির বাজারে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক স্নাতক তরুণ প্রবেশ করলেও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পেশাগত চাকরি তৈরি হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার। দেশের সামগ্রিক তরুণ বেকারত্বের হার যেখানে প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার সাড়ে তিনগুণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন বেকার মানুষের সংখ্যা রয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এদিকে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারের হার প্রায় ৮৭ শতাংশ। এর মধ্যে বেশিরভাগই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। সংস্থাটি বলছে, কয়েক বছর ধরে দেশের বেকারত্বের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে।

এ ছাড়া, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিকালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব শিক্ষার্থী পাস করেন। তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪। পাস করা শিক্ষার্থী যারা চাকরিতে আছেন, তারা বেশিরভাগ স্বল্প আয়ের চাকরি করেন। নারী ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্য বেকারের সংখ্যা বেশি।

তাই বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান উপযোগী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। তারার জানান, এ প্রকল্পটি বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে দেশি-বিদেশি ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন তৈরি করা হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া, বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রমের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে বলেও জানান তারা। বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে শিক্ষার্থীদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদানও করা হবে। এজন্য চুক্তি করা হবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে।

প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৮০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের স্কিল ট্রেনিং খাতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা, এসব শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেশন করতে খরচ হবে ৩ কোটি, ইন্টার্নশিপে খরচ হবে ১০ কোটি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ৫ কোটি, ট্রেইনার ডেভেলপমেন্টে ৪ কোটি, ক্যারিয়ার ও প্লেসমেন্টে ৫ কোটি এবং প্রশাসন ও মনিটরিংয়ে ৮ কোটি টাকা খরচ হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি দক্ষ জনবল সমৃদ্ধ প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট থাকবে। যেখানে প্রেষণে, সরাসরি ও আউট সোর্সিং মাধ্যমে জনবল অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তবে এর জন্য কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রশিক্ষণ অতীতে খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। এসএসসি পাসের পর শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নেবে, নাকি কর্মমুখী শিক্ষায় যাবে, তা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করা জরুরি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে বর্তমান বেকারত্ব দূর করা কঠিন। এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ ও ভাতা বাবদ বিপুল অর্থ ব্যয়ের ফলও পর্যালোচনা করতে হবে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা ছাড়া এসব উদ্যোগ বেকারত্বের সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল কালবেলাকে বলেন, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সক্ষমতা যাচাইকালে উঠে আসবে প্রকল্পটি কতটা বাস্তবসম্মত, প্রয়োজনীয় ও কার্যকর হবে। যদি ইতিবাচক ফল আসে তাহলে মূল প্রকল্প অনুমোদন পাবে।

এ বিভাগের আরও সংবাদ