ভোরবেলার কুয়াশা ভেদ করে কিংবা দুপুরের চড়া রোদে একজন মানুষ প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসরুমে ঢোকেন। তাঁর হাতে থাকে চকবোর্ড বা মার্কার, আর চোখে থাকে একদল তরুণমনের কৌতূহল মেটানোর অদ্ভুত আলো।
এই মানুষটিকে আমরা শিক্ষক বলি। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা কি কখনো আয়নায় নিজেদের মুখটি ফিরিয়ে দেখেছি যে আমরা এই মানুষটির সঙ্গে আসলে কেমন আচরণ করছি? বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য—‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিক্ষক পেশার মর্যাদা রক্ষা এবং এগিয়ে নেওয়া’ যেন আমাদের এই আত্মোপলব্ধির আয়নাটাই আরেকবার পরিষ্কার করে দিল।
আজকের পৃথিবীটা আগের মতো নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম আর প্রযুক্তির ঝড়ে সবকিছু বদলে যাচ্ছে চোখের পলকে।
তথ্য এখন আর শুধু শিক্ষকের মুখস্থ বলা বুলিতে সীমাবদ্ধ নয়, হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনেই মহাবিশ্বের জ্ঞান লুকিয়ে আছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় শিক্ষকের ভূমিকা বদলাচ্ছে, এটি সত্য। শিক্ষক এখন আর শুধু তথ্যদাতা নন, তিনি নির্দেশক, পথপ্রদর্শক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির এই রমরমা বাজারে আমরা কি শিক্ষকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, নাকি তাঁকে দিন দিন এক কোণঠাসা ও প্রান্তিক চরিত্র বানিয়ে ফেলছি? বাস্তবতার নির্মম চিত্রটি আমাদের আশপাশেই ছড়ানো।
অথচ আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত দ্বিচারিতা রয়েছে। আমরা কথায় কথায় বলি, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু কাজের বেলায় ওই মেরুদণ্ডকেই সবচেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষকের সামাজিক সম্মান আজ শুধু মুখের বুলিতে টিকে আছে, বাস্তব জীবনে নয়। একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন নন-এমপিও শিক্ষক মাসের পর মাস যে অর্থনৈতিক টানাপড়েন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান, তা কি কোনো সভ্য সমাজের জন্য গৌরবের? যখন একজন মেধাবী তরুণ বা তরুণী দেখে যে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষক সমাজের অন্য পেশার মানুষের তুলনায় চরম আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন, তখন সে কি আর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহী হবে? মেধার এই উল্টো স্রোত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভিতটাই ধসিয়ে দিচ্ছে।
শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য আমরা কত কোটি টাকার প্রকল্প নিই, কত নতুন কারিকুলাম তৈরি করি, বিদেশ থেকে বড় বড় কনসালট্যান্ট এনে ওয়ার্কশপ করি। কিন্তু যাঁর ওপর দাঁড়িয়ে এই পুরো ইমারত তৈরি হবে, সেই শিক্ষকের পেটে যদি ক্ষুধা থাকে এবং মনে যদি দুশ্চিন্তা থাকে, তবে কোনো কারিকুলামই কাজে দেবে না। একটি ভালো গাড়ি চালানোর জন্য যেমন ভালো চালক এবং তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন দরকার, তেমনি একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন মানসিকভাবে মুক্ত ও আর্থিকভাবে সচ্ছল শিক্ষক। মর্যাদা শুধু পকেটের টাকার অঙ্কে মাপা যায় না ঠিকই, কিন্তু পেটে ভাত না থাকলে গলার জোর যেমন থাকে না, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তার অভাব থাকলে পেশাগত উত্কর্ষও আশা করা যায় না।
পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের শিক্ষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। শিক্ষকদের হাতে তুলে দিতে হবে প্রযুক্তির হাতিয়ার। কিন্তু এর আগে তাঁদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে শিক্ষকদের বেতন সমাজের সর্বোচ্চ স্তরগুলোর কাছাকাছি রাখা হয়। দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশে শিক্ষক হওয়া মানেই সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ও লোভনীয় পেশার অংশ হওয়া। আমাদের দেশেও যদি মেধাবীদের শিক্ষকতায় টানতে হয়, তবে এই কাঠামোগত পরিবর্তন আনতেই হবে। শিক্ষকতার পেশাকে শুধু একটি চাকরি ভাবলে চলবে না, এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
পাশাপাশি শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদাকে ফিরিয়ে আনতে হবে শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত। রাজনৈতিক বলয় বা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষকসমাজেও এক ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা পেশার সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যেও পেশাগত নৈতিকতা, সততা এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। শুধু অধিকারের কথা বললে চলবে না, দায়িত্বের জায়গাটাও সমানভাবে সততার সঙ্গে পালন করতে হবে। যখন একজন শিক্ষক তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেন, তখন আপনা-আপনিই তাঁর প্রতি সমাজের শ্রদ্ধা ফিরে আসে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর