শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

থাপ্পড়-কাণ্ড ২

মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম-শ্রেণিকে কেন ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না

Advertisement

আমরা স্বীকার করি বা না করি, এটাই সত্যি যে, টঙ্গীর মাদরাসায় সংঘটিত ঘটনায় দেশজুড়ে ওঠা প্রতিবাদ বা অভিযুক্ত হুজুরের বিচারের দাবি এখন পুরোপুরি মাদরাসা শিক্ষা ও আলেম শ্রেণির বিরোধিতার প্রচারণায় পর্যবসিত হয়েছে। অভিযুক্তের বিচার দাবির বদলে সন্তানের অনিরাপত্তার আবেগে, ক্ষোভে, অন্যদের পোস্টের মাধ্যমে ট্রিগারড হয়ে, বুঝে-না বুঝে, অন্যায্যভাবে আমরা এটাকে কেন্দ্র করে পুরো আলেম সমাজকে দেশবাসীর নিকট হেয়প্রতিপন্ন, অপমান-অপদস্থ করে চলেছি।

ফেসবুকে ঢুকলেই দেখা যায় প্রচার চলছে- হুজুরেরা ধর্ষক, বলাৎকারকারী, পায়ুযোদ্ধা, কওমে লুত, মাদ্রাসাগুলো বলাৎকারের আস্তানা, আরো অনেক কথা যা মুখে নেওয়ার মতো নয়। নানান শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় চলছে আলেম ও মাদ্রাসাপড়ুয়াদের মুণ্ডুপাত। ফেসবুকে এসব পোস্ট দেখে দেখে আমরাও কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই একই ঢঙে দুচার লাইন লিখে নিজের টাইমলাইনে পোস্ট করে দিচ্ছি। ভুলে-টুলে এক দুইজন হুজুর যদি এর প্রতিবাদ করে কমেন্ট বা পোস্ট করেন, তাহলে সবাই মিলে তার ওপর হামলে পড়া হচ্ছে।

কে একজন এআই ব্যবহার করে পোস্টার বানিয়ে ছেড়ে দিল- “মাদরাসায় এখন আর বডিবিল্ডারদের সন্তান ভর্তি নেওয়া হয় না।” আমরা সেটাকে সত্য ভেবে হাস্যরসাত্মক ক্যাপশন সহযোগে দেদারসে সেই পোস্টার শেয়ার- টেয়ার দিলাম। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তা প্রতিরোধের উপায় কি, অভিযুক্ত হুজুরের কি ফাঁসি নাকি যাবজ্জীবন, নাকি অন্য কোনো কঠিন দণ্ড হওয়া উচিত, কিভাবে মাদরাসার প্রতি জনমানুষের আস্থা বৃদ্ধি করতে হবে- এসব প্রয়োজনীয় আলোচনা কোথাও নেই। এই যে মূল জায়গায় হাত না দিয়ে আমরা যে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছি, তার পরিণতি কী?

আলেমদেরকে ভিলিফাই করে এসব প্রচার প্রচারণায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার ত্বরান্বিত হচ্ছে? নাহ, সে তো ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তদন্তকার্য চলছে। তাহলে? আপনার- আমার এই প্রচারণা আসলে আমাদেরকে আলেম ও মাদ্রাসা- শিক্ষিতদের উপস্থিতি, প্রভাব ও ভূমিকামুক্ত একটি সমাজের দিকে ধাবিত করার শঙ্কার মুখোমুখি করে দিয়েছে।

আমাদের সমাজে আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, হুজুর ইত্যাদি শব্দবন্ধের লোকদের উপস্থিতি ও প্রভাব সুদীর্ঘ কালের। তারা সমাজে কী ভূমিকা পালন করেন? চাঁদাবাজি? মাস্তানি? কারো জমি দখল? নাহ, তার কোনোটাই না। তারা কি পেশিশক্তি বা রাষ্ট্রীয় কোনো শক্তির প্রতিভু? নাহ, তা-ও নয়। হুজুরদের মধ্যে বদচরিত্রের লোক আছে, যেমনটা আছে আমাদের মধ্যেও। কিন্তু কাল- কালান্তর ধরে যেকোনো সংকটে, গুরুত্বপূর্ণ অভিযাত্রায় আমরা এই হুজুরদেরই শরণ নিই।

সন্তানের এসএসসি পরীক্ষা, ভাইয়ের বিদেশ গমন, বাবার অনিরাময়যোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্তের সময় আমরা মসজিদের হুজুরের হাতে পঞ্চাশটি টাকা গুঁজে দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বলি। দশ নম্বর সংকেতের ঘূর্ণিঝড় বা প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের মুহূর্তে সশঙ্ক চিত্তে হুজুরকে অনুরোধ করি- ‘হুজুর, আযান দেন’। এই যে দোয়া-আযান, তা কাজে লাগবেই- তা কি পরীক্ষিত? না। হয়তো কোনো কাজে না-ও লাগতে পারে। সব জেনেও আমরা ইমাম সাহেবের কাছেই যাই। মানসিক আশ্রয় লাভ করি।

হুজুরেরা কেবল এসব দোয়াদরুদ, নামাজ, মিলাদ, জানাযা এসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানই পরিচালনা করেন? তাও নয়। যেসব নর্মসের ওপর আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে, তার প্রতিটিই আলেম তথা হুজুরদের উপস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মুরুব্বিদের দেখলে সালাম দেওয়া, ধূমপান-মদপান না করা, বাবা-মায়ের অবাধ্য না হওয়া, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, রাস্তায় আদবের সাথে চলা প্রভৃতি শিক্ষা আমরা কোথায় পাই। বাবা-মায়ের পর স্থানীয় মসজিদ, মক্তবেই তো।

চলমান পরিস্থিতিতে আমরা যেভাবে হুজুরদেরকে, মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভিলিফাই করে চলেছি, তার ফলে তারা সমাজে অচ্ছুৎ হয়ে উঠলে, শ্রদ্ধা ও প্রভাব হারালে কেউ আর তখন হুজুরদের কাছে যাবে না, তাদের কথা শুনবে না। এই বাস্তবতা সামাজিক শক্তি ধ্বংস করবে, সমাজকে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাবে, সর্বোপরি জাতীয় সংহতিকে দুর্বল করবে। যদি আমরা সেটা না চাই, তাহলে সন্তানের নিরাপত্তার মূল উদ্বেগের জায়গা থেকে সরে কারো কর্তৃক ট্রিগারড হয়ে আলেম সমাজের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচারণা বন্ধ করতে হবে, এখুনি বন্ধ করতে হবে।

আমি অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের বিপক্ষে কথা বলিনি, বরং বিচার কঠোর ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের কথা বলেছি। এটাও বলিনি যে, মাদরাসা শিক্ষার সমালোচনা করা যাবে না। গণতান্ত্রিক পরিবেশে আলোচনা- সমালোচনার থাকবে। কিন্তু সমালোচনা যখন নির্দিষ্ট সমস্যা থেকে সরে গিয়ে সামগ্রিক বিদ্বেষে পরিণত হয়, সন্তানের অনিরাপত্তার আবেগে আমরা কোটি কোটি মানুষ যখন নিজের অজান্তেই সেই বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রক্রিয়ায় অংশ নিই, তখন সেটি আর সংস্কারের পথ দেখায় না; বরং সমস্যাকে ঘনীভূত করে আরো বড় বিপদের দিকেই আমাদেরকে ধাবিত করে।

সবশেষে একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। সামাজিক মাধ্যমে যা চলছে, তাতে আমরা কি ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছি, নাকি ন্যায়বিচারের দাবিকে ব্যবহার করে অন্য একটি অন্যায্য প্রচারণার অংশ হয়ে যাচ্ছি? তাই ফেসবুকে কোনো পোস্ট করার আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞাসা করবেন, আমি কি অপরাধীর বিচার চাইছি, নাকি ট্রিগারড হয়ে আলেমসমাজ ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছি? যারা পোস্ট করে ফেলেছেন, তাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখব, দয়া করে নিজের পোস্টটি পর্যালোচনা করে সম্পূরক আরেকটি পোস্ট করে অবস্থান পরিষ্কার করুন।

আসুন, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই চিহ্নিত করি। ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াই। মাদ্রাসাকে নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক করার দাবি তুলি। কিন্তু একজনের অপরাধের দায় হাজারো নিরপরাধ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অন্যায়ে শামিল না হই। সন্তানের নিরাপত্তাহীনতার আবেগে যদি আমরা আলেমদেরকে সমাজকাঠামো থেকে বিযুক্ত করতে ভূমিকা পালন করি, ভুল করার পর সেই ভুল বুঝতে যদি আমরা ব্যর্থ হই, মনে রাখবেন বিপদ আমাদের অত্যাসন্ন। আপনাদের আবেগের বিপরীতে কথা বলে সবার অপ্রিয় হবার ঝুঁকিটা আমি এমনি এমনি নিইনি।


লেখক : বিসিএস (পুলিশ), এডিশনাল স্পেশাল এসপি (সিআইডি)

এ বিভাগের আরও সংবাদ