শিরোনাম
Advertisement
ক্যাম্পাসের ভেতরে

শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন কক্সবাজারের ৮ বোন

Advertisement

গ্রামীণ বাজারের মধ্য দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুলে আসা-যাওয়ার ঘটনাও ছিল এলাকাবাসীর চোখে সামাজিক অপমানের বিষয়। এ কারণে ষষ্ঠ শ্রেণির কিশোরী স্কুলছাত্রী খতিজা বেগমের বাবা তাঁর নিজ কন্যা ও জামাতার (খতিজার মা-বাবা) সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন। খতিজার আরেক বোন আনোয়ারা বেগম তৃতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে ছিলেন তাঁর শ্রেণির একমাত্র মেয়ে। নারী শিক্ষার সেই আকাল পেরিয়ে খতিজা আর আনোয়ারারা আট বোনই বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা আপন ১৬ ভাই-বোনের মধ্যে ১৩ জনই স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোনাপাড়া নামের অজপাড়া-গ্রামের উলামিয়া নামের একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি তাঁর ঘরটিতে শিক্ষার এমন আলো জ্বেলে দিয়ে গেছেন।

এমনই এক প্রতিকূল সময়ে সমাজের প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের কন্যাসন্তানদের ছেলেদের সমান মর্যাদায় শিক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন শিক্ষাব্রতী বাবা উলামিয়া সিকদার। তিনি আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষাকে কখনো পরস্পরবিরোধী মনে করেননি। তাঁর ১৩ মেয়ের মধ্যে আটজনই বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থেকে শত শত শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার বাণী। তারা হলেন- হুসনে আরা বেগম, সাবেকুন্নাহার কাজল, মুজিবুন্নাহার, রিজিয়া আক্তার, সেলিনা আক্তার, তাহমিদা ইয়াছমিন, ফাহমিদা ইয়াছমিন, শারমিন আফরোজ নওরীন বিভিন্ন জায়গায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় কর্মরত আছেন।

এলাকার মানুষের কাছে ‘শিক্ষাপাগল’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া প্রয়াত উলামিয়া সিকদারের দুই স্ত্রীর ১৬ সন্তান। উলামিয়া সিকদারের বাবাও ছিলেন শিক্ষানুরাগী মানুষ। ধন-দৌলত আর টাকা-পয়সা নয়, শিক্ষাই ছিল তাঁদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে থাকা কক্সবাজারে শিক্ষাবিষয়ক নানা আলাপ-আলোচনায় প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়ে আসছে প্রয়াত উলামিয়া সিকদার পরিবারের সন্তান-সন্ততিদের কথা।

উলামিয়া সিকদার মারা গেছেন ২০০৩ সালে। তাঁর প্রথম স্ত্রীও আর নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী সামারুক বেগম (৬৫) বলেন, ‘প্রথমে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমার স্বামী আমাদের সন্তানদের জন্য যা করে গেছেন, তা কোনো দিন ভোলার নয়। তাঁর সব অবদানই আজ আমাদের পরিবারে ছড়িয়ে আছে। আমার সব ছেলে-মেয়ে আমাকে দেখেশুনে রাখে, নিয়মিত খোঁজখবর নেয়। একসঙ্গে ১০-১২ সন্তানের পড়াশোনা করানোর ব্যাপারটি বাস্তবে কঠিন ছিল। আশির দশকে রামুর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন থেকে যে অল্প কয়েকজন মেধাবী তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিল, তাদের একজন ছিল তাদেরই জ্যেষ্ঠ সন্তান অধ্যাপক ছলিম উল্লাহ।’

১৬ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় অধ্যাপক ছলিম উল্লাহ। তিনি রামু সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। দুই বছর আগে অবসরে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম মায়ের সাত বোন ও তিন ভাই এবং দ্বিতীয় মায়ের ছয় বোন। আমরা সন্তানরা বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছি, এ কারণে মানসিক শান্তি পাচ্ছি। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে ১৩ জনই স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল শামসুদ্দিন প্রিন্স বলেন, ‘সত্তরের দশকের প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশে উলামিয়া যে ছোট্ট স্বপ্নটি বুনেছিলেন, সেটি আজ আর ছোট নেই। তাঁর সেই স্বপ্ন শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।’

এ বিভাগের আরও সংবাদ