বিমল সরকার
এখন যেমন সরকারীকরণ বা জাতীয়করণ বলা হয়, পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) বলা হতো প্রাদেশিকীকরণ। পাকিস্তান সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি বা প্রাদেশিকীকরণের বিষয়টিকে তখন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ জনগণ আসলে ভালো দৃষ্টিতে দেখতেন না। খুশি না হয়ে সুযোগ পেলে তারা বরং প্রাদেশিকীকরণের বিরোধিতাই করতেন, করেছেন। পাকিস্তানি শাসন আর শোষণের তিক্ত অভিজ্ঞতায় সচেতন মানুষের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছিল যে, কায়েমি শাসন-শোষণের বন্দোবস্তকে আরও পাকাপোক্ত ও মজবুত এবং সচেতন তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থী তথা মানুষের কণ্ঠরোধ করাটাই হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করার আসল উদ্দেশ্য। আর তাই কলেজ সরকারীকরণের উদ্যোগ বা ঘোষণায় খুশি হওয়া তো দূরের কথা, বরং সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সচেতন এলাকাবাসী এর বিরোধিতায় নেমে পড়েন। ১৯৬৪ সালে আনন্দমোহন কলেজ সরকারীকরণের বিপক্ষে ময়মনসিংহ শহরে এমন যৌথ বিক্ষোভ মিছিলে (শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক-পাবলিক) অংশগ্রহণের স্মৃতির কথা জানান একই কলেজের শিক্ষার্থী (পরবর্তী সময়ে শিক্ষকও) আমার বেশ কয়জন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। ১৯৬৩ সালে কলেজটিতে বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়। ষাটের দশকে কোনো একটি কলেজে (সরকারি আর বেসরকারি কিংবা কলেজটির অবস্থান রাজধানী শহর আর মফস্বল শহর যেখানেই হয়ে থাকুক তা বড় কথা নয়) মাত্র এক-দুটি বিষয়েও অনার্স চালু করা খুব বিরাট এক বিষয় ছিল। ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজসহ ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বর্তমান ১৭টি জেলার মধ্যে আনন্দমোহন ছাড়া আর কোনো কলেজে তখন অনার্স চালু ছিল না। ভাবা যায়? গোটা বিভাগে অন্তত ২৫টির মধ্যে (বেসরকারি) একটি কলেজে সবে অনার্স খোলা হয়েছে (১৯৬৩)। বছর না ঘুরতেই তাও আবার সরকারীকরণ (১৯৬৪)! এমন প্রেক্ষাপটে সরকারীকরণের বিপক্ষে শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের রাজপথে নামা, এও এক অসামান্য ঘটনা।
যে যাই বলুন, আজকাল তা ভাবনারও অতীত। গত ১০ বছরে (২০১৬-২০২৬) ঘোষণা অনুযায়ী সরকারীকরণের প্রক্রিয়াধীন সাড়ে ৬০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (কলেজ এবং স্কুল) কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের দিকে দৃষ্টি দিলেই খানিকটা আন্দাজ করা যাবে। টানা ১০ বছরে এখনো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। আমলা কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঢিলেমির কারণে সরকারীকরণের সুবিধা না পেয়েই অন্তত চার হাজার শিক্ষক ইত্যবসরে অবসরে গিয়েছেন, অনেকে মৃত্যুবরণও করেছেন। প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে অনেকের পদায়ন হয়েছে, অনেকের এখনো হয়নি। জায়গায় জায়গায় ‘তেল চর্বি’ দিয়েও অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে শিক্ষক-কর্মচারীদের মনে হতাশা এসে ভর করেছে। ভর করবে না-ই বা কেন, একই কলেজে টানা ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। বেসরকারি থাকা অবস্থায় বেতন-ভাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বশেষ প্রায় ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। পদায়নের পর (২০২৩) দেখা গেছে, ওই শিক্ষক কিংবা শিক্ষকদের বেতন-ভাতা স্থির করা হয় সাকুল্যে আনুমানিক ৪২ হাজার টাকা। পদায়নের চার বছরের মাথায় (২০২৩-২০২৬) সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতার পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা। ১৯৯৫ সালে যোগদান করা নিয়মিত শিক্ষক, এমনকি ২০১০ সালে অনার্স কোর্সের ‘নন-এমপিও’ শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে টানা ১০ থেকে ১২ বছর শর্ত অনুযায়ী এমপিওর বাইরে থাকা শিক্ষকদেরও (বর্তমানে সবাই সরকারি) একই পরিমাণ বেতন-ভাতা আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা।
আরও একটি নজিরবিহীন ঘটনা অন্তরে বেশ দাগ কাটার মতো। আর কিছু যেমনই হোক, একজন শিক্ষকের জীবনে এমন অপমান ও গ্লানিময় বিষয় আর কিছু হতে পারে না। একই প্রতিষ্ঠানে টানা ৩০ বছর শিক্ষকতা করা আর তার অর্ধেক সময় অর্থাৎ ১৫ বছর শিক্ষকতা করা ব্যক্তি উভয়েরই পদবি এখন ‘প্রভাষক’ এবং দুজনের বেতন-ভাতার পরিমাণও একই। তাদের মধ্যে সিনিয়ররা অন্তত ১৬ বছর ধরে রীতি অনুযায়ী সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার টাকার বেতন স্কেল পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের সরকারীকরণের ‘কৃপায়’ বর্তমানে সিনিয়র-জুনিয়র সবার গ্রেড এখন নবম করা হয়েছে। তার মানে সিনিয়রদের দুই ধাপ অবনমন হলো! সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মুখেই শুনেছি, তাদের পদটিকে ‘ব্লক পোস্ট’ করা হয়েছে। ব্লক পোস্ট মানে তাদের কখনো পদোন্নতি (সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক) হবে না।
জনবল প্যাটার্ন অনুযায়ী এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের পদোন্নতি হয়। কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রভাষক থেকে আনুপাতিক হারে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার বিধানটি যথারীতি চলমান রয়েছে।
এমন দৃষ্টান্তও অনেক রয়েছে, দুই সহপাঠী বন্ধু একই কলেজে একজন ১৯৯৭ আর অন্যজন ২০০০ সালে যোগদান করেন। প্রথমজন পদায়ন পেয়ে বেতন-ভাতা হিসেবে নবম গ্রেড (স্কেল ২২ হাজার টাকা) অনুযায়ী টাকা পাচ্ছেন ৫০ হাজার। আর পদায়নের জন্যে অপেক্ষমাণ দ্বিতীয়জন (৩ বছরের জুনিয়র) পাচ্ছেন সপ্তম গ্রেড (স্কেল ২৯ হাজার টাকা) অনুযায়ী ৫৪ হাজার টাকা। সরকারীকরণ, পদায়ন, বেতন নির্ধারণ তথা এমন সব হিসাব-নিকাশ কেমন উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত, তা আমাদের জানা নেই। তবে ভুক্তভোগী শত শত কিংবা হাজারো শিক্ষকের মনের আক্ষেপ আর গ্লানিটি কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। এসব মনে হলেও শিক্ষকদের স্বাভাবিক মুখগুলো নিমেষে মলিন হয়ে পড়ে।
গতকালও আমার একসময়কার এক ছাত্র ফোনে এ নিয়ে অনেক আক্ষেপ করেছে। শিক্ষকদের সঙ্গে পঞ্চাশোর্ধ্ব ছাত্রটি (নতুন সরকারি হওয়া কলেজের শিক্ষক হিসেবে পদায়ন পাওয়া) এও জানায়, ‘আমরা কেমন সরকারীকরণের গ্যাঁড়াকলে পা বাড়ালাম? এমন সরকারীকরণের কী বা দরকার ছিল? না পারি সইতে, না পারি কাউকে কিছু বলতে। কেবলই বিড়ম্বনা আর বিড়ম্বনা ।’
সবচেয়ে বেমানান এবং বলতে গেলে নজিরবিহীন যে, ২০১৮ সালের বিধিমালায় সরকারি হওয়া সাড়ে ৬০০ প্রতিষ্ঠানের (কলেজ ও স্কুল) শিক্ষক-কর্মচারীরা শর্তানুযায়ী কোনোদিন বদলি হতে পারবেন না। আমরা ভাবতে পারি না; দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অনুযায়ী বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি হওয়া যেখানে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে, সেখানে সরকারি হওয়া স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীরা বদলি হতে পারবেন না! প্রশ্ন দেখা দেওয়াটাই স্বাভাবিক, তাহলে এ কেমন সরকারীকরণ? আরও ভাবতে পারি না, ২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ১০ বছরেও সম্পন্ন করা গেল না! কেবলই ফাইল চালাচালি, তথ্য আদান-প্রদান আর কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ মন্ত্রণালয় থেকে ও মন্ত্রণালয়, এ বিভাগ থেকে সে বিভাগ, এ টেবিল থেকে সে টেবিল। এ যেন মাত্রাছাড়া হয়রানি। আরে, মানুষ বাঁচে কয় বছর? আমরা জানি না পদায়নের জন্য অপেক্ষমাণ শিক্ষক-কর্মচারীদের এবংবিধ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কবে দূর হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক