প্রেম ও দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী আজ

দ্রোহ ও প্রেম, হৃদয় ও সংগ্রাম; যার কবিতায় একীভূত হয়ে চিরায়ত উচ্চারণে পাঠককে মুগ্ধ আর প্রাণিত করে চলেছে, সেই কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মদিন আজ। পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে ‘মহাকালের ধূমকেতু’ হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল তার। তিনি শুনিয়েছেন আশার বাণী- ‘আসিতেছে শুভ দিন’। জাতির মুক্তিদাতা কবি শোষিতের পক্ষে দাঁড়িয়ে শাসকের উদ্দেশে বলেছেন, ‘শুধিতে হইবে ঋণ।’

কবি নজরুল চিরপ্রেমের, চিরযৌবনের দূত। সাম্যের দূতও তিনি। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকেই মহীয়ান হিসেবে দেখেছেন। তার চোখে পুরুষ-রমণীর কোনো ভেদাভেদ ছিল না।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব আর কৈশোরে দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা ‘দুখু মিয়া’ পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা-কবি। একদিকে কবিতায় দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ সঞ্চারের জন্য পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছেন বিদ্রোহী কবি, আবার প্রেমের অসামান্য কবিতা ও গানের রচয়িতা হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন প্রেমিক কবি হিসেবে। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে কবি নজরুল ইসলামকে জাতীয় কবি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

জাতীয় কবির ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘নজরুলের কবিতার মূল বিষয় ছিল মানবতার জয়গান এবং মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। নজরুলের অমর সৃষ্টি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে আমাদের অনুপ্রেরণা ও সাহস জুগিয়েছে। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, গেয়েছেন নারী-পুরুষের সাম্যের বন্দনা। বাণী ও সুরের অমিয় ধারায় ঋদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে।’

তিনি বলেন, ‘কবি নজরুলের সংগ্রামী জীবন ও তার সৃষ্টি বাংলার মানুষের জন্য আজীবন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে এবং একটি অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।’

জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে আজ। এ বছর কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান: কাজী নজরুলের উত্তরাধিকার’।

জাতীয় পর্যায়ে আজ ২৫ মে এবং আগামীকাল ও পরশু এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় এবং কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় আজ কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বেলা ৩টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। স্মারক বক্তৃতা করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।

আগামীকাল সোমবার ২৬ মে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে নজরুল জন্মদিবসে ‘চেতনা ও জাগরণে নজরুল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তবে নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকীর মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে আজ ভোর সাড়ে ৬টায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবির সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন নাগরিক সমাজ ও সর্বস্তরের মানুষ।

বিকেল ৪টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে নজরুলবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এ আয়োজনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের চর্চা, প্রসার এবং তার জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণায় স্বীকৃতি হিসেবে গবেষক ও অধ্যাপক আনোয়ারুল হক এবং সংগীতশিল্পী শবনম মুশতারীকে ‘নজরুল পুরস্কার-২০২৫’ দেবে বাংলা একাডেমি। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ লাখ টাকা, সঙ্গে দেওয়া হবে সম্মাননা স্মারক ও উত্তরীয়।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *