অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে সাত ইসলামী রাজনৈতিক দলের ঐক্য এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলোর অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকা বা ভবিষ্যতে নতুন কোনো জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে কি না—এ প্রশ্নে মতৈক্য না হওয়ায় মূল আলোচনা থেমে গেছে। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর দলগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
গত রোববার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে সাত দলের প্রতিনিধিদের বৈঠকে ঐক্যের খসড়া রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। হেফাজতের আমির মাওলানা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে সাত দলের প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। এছাড়া হেফাজতের উদ্যোগে গঠিত উপকমিটির নেতারা এবং সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় কয়েক নেতা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকে খসড়া নিয়ে দলগুলোর মতামত নেওয়া হলেও কোনো প্রস্তাবই চূড়ান্ত করা যায়নি।
দলগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করে উপকমিটি ঐক্যের একটি সমন্বিত খসড়া তৈরি করেছিল। এর আগে প্রতিটি দলকে নিজেদের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য গত ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপকমিটি কয়েক দফা আলোচনা করে খসড়া রূপরেখা তৈরি করে।
সাত দলের এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
সাত দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঐক্যের রূপরেখায় একটি দল অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে বা ভবিষ্যতে নতুন কোনো জোটে যেতে পারবে কি না, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ চান, ঐক্যের অংশ হলে অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকা বা যোগ দেওয়ার সুযোগ না থাকুক। আবার কয়েকটি দলের নেতার মত, রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন শর্ত কতটা কার্যকর হবে, তা আরও পর্যালোচনা করা দরকার।
কয়েকজন নেতা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলগুলোর জোট ও রাজনৈতিক সমঝোতার ধরন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ফলে সাত দলের ঐক্যকে স্থায়ী কাঠামো দিতে গিয়ে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর কোনো শর্ত আরোপ করা হলে ভবিষ্যতে তা জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা একটি দলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সাতটি দলই কওমি ঘরানার। তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ঐক্যের উদ্দেশ্য কী—স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমন্বয়— সেটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। এটি স্পষ্ট না করে তাড়াহুড়ো করে ঐক্য চূড়ান্ত করার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে হেফাজতে ইসলাম থেকে বের করে দিতে চায় একটি দল, যাতে তারা হেফাজতের নেতৃত্ব দিতে পারে। আবার অন্য একটি দল চায় হেফাজতের উদ্যোগে ১১–দলীয় ঐক্য থাকা দলগুলোকে যেন সে ঐক্য থেকে বের করে নিয়ে আসা হয়। ওই দল মনে করে, ১১–দলীয় ঐক্য ভাঙলে তারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবে। আবার বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ আরেকটি দলের মহাসচিব ৭–দলীয় ঐক্য হলে এর মহাসচিব হতে পারবেন, এমন ধারণায় ঐক্য গঠনে তাড়াহুড়ো করছেন।
হেফাজতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন: ঐক্যের আলোচনায় আরেকটি প্রশ্ন হেফাজতের ভূমিকা নিয়ে। হেফাজত নিজেকে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু সাতটি রাজনৈতিক দলের ঐক্যের উদ্যোগ নিয়েছে সংগঠনটি। ফলে ঐক্য চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে হেফাজতের ভূমিকা কতটা থাকবে, সেটি নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। দলগুলোর কয়েকজন নেতা মনে করেন, ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়ায় হেফাজত সমন্বয়কের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঐক্য চূড়ান্ত হওয়ার পর রাজনৈতিক কৌশল ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে দলগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। এর সঙ্গে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও আলোচনাকে জটিল করছে। সাত দল ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও তাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ এবং তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। কয়েকটি দলের নেতাদের অভিযোগ, ঐক্য প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক পক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থও কাজ করছে।
লিয়াজোঁ কমিটিতে সমাধানের চেষ্টা: ২৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে মতপার্থক্য নিরসন না হওয়ায় ২৪ সদস্যের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমানকে। সাতটি দলের প্রতিটি থেকে তিনজন করে মোট ২১ জন এবং হেফাজতের আরও তিনজন নেতা এই কমিটিতে থাকবেন। এর মধ্যে হেফাজতের মহাসচিব ছাড়া চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ মুফতি মাওলানা জসিম উদ্দিন থাকতে পারেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। ঐক্যের খসড়া রূপরেখার যেসব বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবে লিয়াজোঁ কমিটি। আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সাত ইসলামী দলই ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা মনে করছে, দলগুলোর পরস্পর কাদা–ছোড়াছুড়ি বন্ধে এই ঐক্যের প্রয়োজন আছে। তবে একই সঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা দলগুলোর কোনো কোনোটির নেতা-কর্মীরা নিজেদের মধ্যে এখনো তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত। সেটিকে ঐক্য গঠনে অন্তরায় মনে করছেন অনেকে। আবার ঐক্য প্রক্রিয়ার পেছনে সাত দলের কারও কারও ভিন্ন মতলব আছে বলেও মনে করছেন কয়েকটি দলের নেতারা।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেন, তারা হেফাজতের উদ্যোগে সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান। কওমি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ ও পরস্পরকে আক্রমণ বন্ধে ঐক্য প্রয়োজন। তবে তাঁরা তাড়াহুড়ো করে ঐক্য চান না। এখন ঐক্য হলো, কিছুদিন পর আবার ভেঙে গেল—এমন ঐক্য আমরা চাই না। আমরা চাই, ঐক্য হোক এবং এখানে যাতে অন্য কারও কোনো দুরভিসন্ধি না থাকে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২২ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে মূলত মতানৈক্য দেখা দেওয়া বিষয়গুলোর সমাধানের চেষ্টা হবে। সেখানে অন্য রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্কের শর্তের পাশাপাশি হেফাজতের ভূমিকা এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। এছাড়া ঐক্যের উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক কর্মকৌশল কী হবে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে সাত দলের ঐক্যটি নির্বাচনী সমঝোতার জন্য, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ঐক্যের কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, এ বিষয়ে স্পষ্টতা চাওয়া হতে পারে।
সাত দলের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অন্য একটি অংশ এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় নেই। তাদের কেন ঐক্য প্রক্রিয়ায় রাখা হয়নি, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ ছাড়া সাত দলের বৈঠকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও নায়েবে আমির কেন আসেন না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, সাত দল নিয়ে চট্টগ্রামে বৈঠক হওয়ায় এবং সেখানে হেফাজতে ইসলামের আমির ও হাটহাজারী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হেফাজতের প্রভাবশালী নেতারা থাকায় ঐক্যের আলোচনা খুব গভীরে যায়নি। তবে ঢাকার বৈঠকে সব দল খোলা মনে আলোচনা ও যৌক্তিক সমালোচনা করবে। যদি সমাধান না হয়, তাহলে ৭–দলীয় ঐক্য গঠনের আলোচনা পিছিয়ে যেতে পারে। এত কিছুর পরও হেফাজত আশাবাদী, আগামী বৈঠকেই ৭–দলীয় ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত হবে। হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা শায়খ সাজিদুর রহমান বলেন, আমরা আশা রাখছি, আগামী বৈঠকে ঐক্য চূড়ান্ত হবে।





