দারিদ্র্য, স্বজন হারানোর বেদনা, অভিভাবকহীনতা কিংবা সংসারের দায়িত্ব—কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাঁদের। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন করেছেন চার মেধাবী শিক্ষার্থী। কেউ মা-বাবাকে হারিয়ে, কেউ খালার আশ্রয়ে থেকে টিউশনি করে, কেউ বা সংবাদপত্র বিক্রেতা বাবার কষ্টের সংসারে বেড়ে উঠে সাফল্যের দেখা পেয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। তবে অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
যশোরের কেশবপুরে মা-বাবাহীন সুমাইয়া খাতুন অভাবের সঙ্গে লড়াই করে আলিম পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছেন। কেশবপুর মহিলা ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার মানবিক বিভাগ থেকে তিনি এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। মজিদপুর গ্রামের বাসিন্দা সুমাইয়া তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা সেলিনা খাতুন এবং নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আব্দুল আহাদকে হারান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই খুলনার একটি কলেজে পড়লেও সুমাইয়া কেশবপুরেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কখনো অর্ধাহারে, কখনো অনাহারে দিন কাটলেও পড়াশোনা ছাড়েননি তিনি। সুমাইয়ার স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়া; কিন্তু উচ্চশিক্ষার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁর পরিবারের নেই।
মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইজাহার আলী বিভিন্নভাবে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। অধ্যক্ষ জানান, এবার মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় একমাত্র সুমাইয়াই জিপিএ ৫ পেয়েছেন। তাঁর চাচা আব্দুল শেখ বলেন, সমাজের সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা পেলে সুমাইয়ার স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের খিলবাড়ি এলাকার সুমাইয়া আক্তার সাথী মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছেন। হবিরবাড়ি ইউনিয়ন সোনার বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। ওই কলেজ থেকে উত্তীর্ণ ৮৬ জনের মধ্যে একমাত্র সাথী জিপিএ ৫ পেয়েছেন।
মায়ের গর্ভে থাকতেই বাবা এখলাস শেখকে হারান সাথী। বড় হয়েছেন নানু সমিরন নেছার কাছে। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর নিজামকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়েছেন। তাঁর বয়স ১০ বছর হলে মা সুমি বেগম অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে খালা চায়না বেগম তাঁকে ভালুকায় নিয়ে এসে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন।
২০২৪ সালে এসএসসিতেও জিপিএ ৫ পান সাথী। বৃত্তি পাওয়ায় কলেজে বেতন দিতে হয়নি। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর দুটি টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা ও আনুষঙ্গিক খরচ চালিয়েছেন। কলেজের ইংরেজি শিক্ষকও বিনা বেতনে তাঁকে পড়িয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ে শিক্ষকতা করতে চান তিনি। অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম খান বলেন, সাথী মেধাবী ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি আরো ভালো করবেন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সংবাদপত্র হকার তাজুল ইসলামের মেয়ে ফাহমিদা সুলতানা এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছেন। বাড়বকুণ্ড হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফাহমিদার সাফল্যে আনন্দিত পুরো এলাকা। তাজুল ইসলাম ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে পত্রিকা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। অভাবের কারণে দুপুর পর্যন্ত পত্রিকা বিক্রির পর পাহাড় থেকে শুকনা কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করেন তিনি। দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাঁর এই সংগ্রাম। ফাহমিদা বলেন, ছোটবেলা থেকেই বাবাকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখেছেন। তাঁর সাফল্যের পেছনে মা-বাবা, শিক্ষক ও ফুফুর অনুপ্রেরণা রয়েছে।
ফাহমিদার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তবে অর্থসংকটে উচ্চশিক্ষার পথ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তাঁর বাবা। তিনি মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা চেয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ফাহমিদা মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তাঁর সাফল্যে তাঁরা গর্বিত।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাজিতা চতুর্থখণ্ড গ্রামের মো. আরাফাত খান এবার বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছেন। চৈতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ ৪.৯৪ পেয়েছিলেন তিনি। বাবা মো. ইসমাইল খান মারা যাওয়ার পর পাঁচ সদস্যের পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তাঁর ওপর। মা শাহিনুর বেগম, প্রতিবন্ধী ভাই আল আমিন খান, ছোট বোন হ্যাপি আক্তার এবং স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়া বোনের মেয়ে তাহিয়াকে নিয়ে সংসার। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি টিউশনি করে সংসারেও অর্থ জুগিয়েছেন আরাফাত। অনেক সময় না খেয়ে কলেজে গেছেন, একটি শার্ট ও প্যান্ট দিয়েই কলেজজীবনের অর্ধেক সময় পার করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান তিনি। তবে ভর্তি ও উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন আরাফাত। কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, আরাফাত অত্যন্ত মেধাবী। সহায়তা পেলে তিনি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ রাসেল জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরাফাতকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পথ কিছুটা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।





