হুসাইন আলমগীর
হেমন্তের এ সন্ধ্যায় জিয়া উদ্যানের ওয়াকিং ট্র্যাকে হাঁটছিলাম;
ওজন বশে রাখার জন্য অনেকেই হাঁটে, রোজ।
আমিও হাঁটছি রোজকার মতো…
আধো আলো আধা অন্ধকারে শুকনো পাতার শব্দ
ডানে বাঁয়ে তাকাতেই দেখি আশেপাশে কেউ নেই
আমি একা… লাম্পপোস্টের আলোগুলো কাঁপছে
কিছুটা ভয় পেলাম! এবং আবার পাতার শব্দ…
পেছনে তাকিয়ে দেখি মেজর জিয়ার সমাধিতে
বৈদ্যুতিক আলো আছড়ে পড়ছে…
ওখানেও কেউ নেই! চারপাশে স্তব্ধ নীরবতা
কেবলি শুকনো পাতা আছড়ে পড়ার শব্দ পাচ্ছি
অন্ধকার ভেদ করে আমার দুচোখ শব্দের উৎস খুঁজছে…
যে ট্র্যাকে আমি হাঁটছি তাতেই একটা মানুষের ছায়া
দেখতে পেলাম…
চাদর মোড়ানো কেউ একজন হাঁটছেন, মনে হলো।
এই গরমে চাদর! তাও চোখমুখ ঢেকে হাঁটছেন!
কোন অশরীরি না তো!-
আমি তাঁর পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বললাম,
‘আমি হিকমত জহুর, কবি… আপনি?’
লোকটি কোনও জবাব দিলেন না।
ভাবলাম, লোকটা আবার ছিনতাইকারী কিনা-
অমনি হেসে দিলেন; বললেন, ‘ভুল ভাবছেন,
আমি মন্দ লোক নই’
ভড়কে গেলাম। যা বলিনি লোকটি তা জানলো কি করে?
লোকটা কি ভূতভবিষ্যৎ জানে?
তো, কোথায় থাকা হয়? মানে কোন মহল্লায়?
‘এখানেই’ লোকটি উত্তর দিলেন…
এখানে তো কেউ থাকেন না। এটা তো সমাধি
প্রেসিডেন্ট জিয়ার সমাধি…
তিনি আড়চোখে তাকিায়ে বললেন, ‘দেখেছেন তাঁকে?’
আমি বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি তখন ক্লাস ওয়ানে
কাজী বশির উচ্চবিদ্যালয় মাঠে…
স্পষ্ট মনে আছে, স্মার্ট, ছিমছাম, চোখে সানগ্লাস…
আপনি তাঁকে চেনেন? আমি সাগ্রহে জানতে চাইলাম
তিনি মুচকি হাসলেন। আমি তার হাসির গুঞ্জন শুনতে পেলাম।
তিনি স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন, সাহসী বীর,
আমাদের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট
এটা তাঁরই সমাধি; পাশেই বেগম জিয়া শুয়ে আছেন
মানে তাঁরই সহধর্মিণী।
আমার অমন পিছুপড়া তাঁকে আকৃষ্ট করল।
তাকেও চেনেন? দেখেছেন তাঁকে? শিশির শব্দের মতো ক্ষীণ স্বরে মৃদু কৌতূহল দেখালেন তিনি।
বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাঁকে নিয়ে অনেক কবিতা
আছে আমার, অনেক…
হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বিভান্বিতা’?
‘কবিতাটি আমি পড়েছি; শব্দটি অভিধানে নেই’
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কে আপনি?
তিনি চাদর সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে মুহূর্ত তাকালেন
তাঁর চিবুকের নিচে ঘামের নহর বইছিল, চোখদুটো
ছলছল করছিলো…
আমি বললাম, আমি আপনাকে ধরতে পেরেছি
আপনি মেজর জিয়া, আমাদের প্রিয় প্রেসিডেন্ট
এই যে, আপনার দরিয়ার মতো চোখ, প্রশস্ত ললাট
আপনার গোঁফ, ধারালো চিবুক…
আপনি কেমন আছেন মেজর?
বেগম জিয়া কেমন আছেন?
তিনি কি সবই বলে দিয়েছেন আপনাকে?
তাঁর ঘরছাড়া হওয়ার কথা? জেল জুলুমের কথা?
চব্বিশের বিপ্লবের কথা?
এবং তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের মহা সমাগমে
আমার আপ্রাণ উপস্থিতির কথা?
সবই কি বলে দিয়েছেন?
কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিলেন না মেজর
ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখা গেলো তাঁকে
ঘর্মাক্ত চাদরখানি আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে
নিরোত্তর অন্ধকারের গহিনে মিলিয়ে গেলেন
আমি পেছন পেছন ছুটলাম,
হাঁটা শেষে, চিনি সমৃদ্ধ রোগীরা ফিরে যাচ্ছে ঘরে
আর আমি-
তাঁর ঘামে ভেজা চাদরটি আমার গায়ে জড়িয়ে
ঘরে ফিরলাম; রাতে
এটা জিয়ার চাদর…..
সাহসের ধূমায়িত ঘ্রাণ, শৌর্য লেগে আছে তাতে।
এ চাদর নিয়ে আমি এখন কি করি!
ইঁদুরে ভরা আমার এই ঘর
হে মেজর,
এখন আমি কোথায় রাখি আপনার এ চাদর?