শিরোনাম
Advertisement
শব্দশিল্প

আল মাহমুদের কবিতায় জীবন অন্বেষা

Advertisement

সাইফুজ্জামান


গত শতকের পঞ্চাশ দশকে আল মাহমুদ বাংলাদেশের কাব্যজগতে আবির্ভূত হয়ে এক ভিন্ন ব্যঞ্জনা, বক্তব্য ও বিষয়বৈচিত্র্য উপস্থাপন করেন। লোকজ সংস্কৃতি, মৃত্তিকা সংলগ্নতা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব তাঁর কবিতার বাহন।

আল মাহমুদ ১৯৫৩-১৯৫৪ সালে ঢাকায় আসেন শুধুমাত্র বড় কবি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে, কাব্য চর্চার জন্য। তাঁর মননে গ্রামীণ জীবনের মর্ম সূত্র গ্রথিত থেকেছে সব সময়। তিনি একই সঙ্গে সফল, কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক এবং শিশুতোষ লেখক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর সক্রিয় অবস্থান বহুমাত্রিক পরিচয় বিস্তৃত করেছে। তাঁর রচিত কবিতা কোমল-কঠোর ভাষা বুনন ও উপমায় ঋদ্ধ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে উঠো পঞ্চাশ দশকে ভাষার আন্দোলন, জাতীয় চেতনা, অর্থনৈতিক শোষণ, পাকিস্তান শাসনের বিরুদ্ধে কবিদের কণ্ঠ উচ্চকিত ছিল। সে কাতারে শামিল ছিলেন আল মাহমুদ।

প্রথম জীবনে আল মাহমুদ সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। আস্তিকতাবাদ ও পরম স্রষ্টার প্রেমে আল মাহমুদের পরবর্তী সময়ে পরিভ্রমণ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৫৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখিতে পুরাপুরি আত্মনিয়োগ করেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয় সেসময়। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত নতুন সাহিত্যপত্র চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাসে তাঁর অনিবার্য উপস্থিতি সাহিত্য বোদ্ধামহলে তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। তিনি নগরকেন্দ্রিক কবিতার বিষয়বস্তু অগ্রাহ্য করে বাংলার সাধারণ মানুষ, গ্রামীণ জনপদ, ভাটি বাংলার লোকায়ত জীবন, নদী-প্রকৃতিকে মূল্য উপজীব্য করে শক্তিময় কবিতা নির্মাণ করেছেন। চরাঞ্চল, নারী, প্রেম, যৌনতাকে আল মাহমুদ শিল্পরূপ দিয়েছেন। প্রচলিত শব্দরাজির মধ্যে গ্রামে ব্যবহার করা অপ্রমিত শব্দের প্রয়োগ তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় মহিমান্বিত করেছে।

ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্যবাদের আগ্রাসনের মধ্য থেকে তিনি স্বজাতি, নিজস্বতা ও বাংলার রূপবৈচিত্র্য ধারণ করেছেন। জীবনানন্দীয় মুগ্ধতা তাঁর কবিতাকে পরিপুষ্ট করেছে। প্রকৃতি, কবিতা এমন, প্রত্যাবর্তনের লজ্জা, তোমার হাতে, পালক ভাঙার প্রতিবাদে, খড়ের গম্বুজ, এক নদী, আমার প্রাতরাশে-কবিতার বিষয় ও ভাবনা, বিচ্ছিন্নতা পেরিয়ে সুষমাময় হয়ে উঠেছে। এখানে যেন তিনি ‘মুক্তি’র স্বাদ নিয়েছেন।

রাজধানীর ঢাকা শহরে দীর্ঘ বসবাসের প্রভাব তাঁকে সেভাবে স্পর্শ করেনি, বরং গ্রামে থাকার অভিজ্ঞতাই আল মাহমুদ অধিক মাত্রায় কবিতাবদ্ধ করেছেন-এখানেই তাঁর স্বার্থকতা। বিদ্যুৎ চমকের মতো তাঁর কবিতার উদ্ভাসন। তাঁর রচিত কবিতা-রূহু বর্ণে, ধ্বনিতে প্লাবিতঃ

‘প্রেম করে নিয়েছিলো ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?
মরনের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস
যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন।
তার পর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস (সোনালী কাবিন-৪)

আল মাহমুদ স্পষ্টভাষী, জটিল কিংবা পরোক্ষ কোনো বক্তব্য তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত। এই থাকা না থাকার পৃথিবীতে তিনি জীবনঘনিষ্ঠ। তাঁর পক্ষেই বলা সম্ভব ‘আর আসবো না/দুধের উপর ভাষা সর চামচে নিংড়ে নিয়ে চেয়ে আছি/বাইরে বৃষ্টির ধোঁয়া। যেন সাদা স্বপ্নের চাদর বিছিয়েছে পৃথিবীতে/কেন এত বুক দোলে/আমি আর আসবো না বলে,/সুখ আমি আসবো না/দুঃখ আমি আসবো না/প্রেম হে কাম, হে কবিতা আমার।/তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর (আমি আর আসবো না বলে)।

আল মাহমুদ বাস্তবতা অস্বীকার করেননি। সমস্ত জীবনচক্রের মধ্যে পাওয়া না-পাওয়ার ব্যাকুলতা, অভিমান কখনো কখনো তাঁকে গ্রাস করেছে। তাঁর কবিতায় আবিষ্ট থাকার প্রবণতা প্রবল। গ্রাম্য মানুষের ক্রন্দন, আহাজারি আর বাঁচার আত্মবিশ্বাস তাঁকে আত্মস্থ করতে হয়েছে। তিনি তুমুল বিশ্বাস ও জীবনভাবনায় তাড়িত।

স্বদেশভূমির অপরূপ সৌন্দর্য তাঁর চোখের সামনে দুলে ওঠে। আল মাহমুদ দেহজ প্রেম ও ইন্দ্রিয় অনুভূতিতে আলোড়িত। তিনি প্রেমের সাথে দ্রোহের সম্মিলন ঘটিয়েছেন।

স্মৃতি তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ। কবিতা এক মায়াবী হাতছানি। সে কবিতাকে তিনি সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে- ‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি/সে তো ভেসে ওঠা ম্লান/আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি/পাতার আগুন ঘিরে রাত জাগা ভাইবোন/আব্বার ফিরে আসা,/সাইকেলের ঘণ্টা ধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া,/আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট (কবিতা এমন)’। বখতিয়ারের ঘোড়া, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো/অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, পাখির কাছে, ফুলের কাছে কাব্যগ্রন্থে আল মাহমুদ জীবনবোধ ও পরিবর্তিত বিশ্বাস ব্যক্ত করেছেন।

কবিতা অলৌকিক আনন্দ থেকে উৎসারণ শুধুমাত্র নয়, কবিতা জীবনজগৎ ও দর্শনজাত আল মাহমুদের কবিতা পাঠ থেকে জানা যায়। পরতে পরতে অভিজ্ঞতা মিশিয়ে তিনি যেসব কবিতা রচনা করেছেন তা জীবন-অন্বেষা যুক্ত। তিরিশের কবিদের কাব্য ভাবনা অতিক্রম করে তিনি পৌঁছে গিয়েছেন নিজ সীমানায়। শব্দ প্রয়োগ, বাক্য নির্মাণ ও উপমা কুশলতা তাঁর কাব্যশক্তি। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় সমাজ নিরীক্ষণ ও মানুষের মন।

আল মাহমুদ সংকট, দুর্ভাবনা কিংবা সম্ভাবনার ভাবনা থেকে কখনো দূরে ছিলেন না। শিল্প-সমালোচক, বোদ্ধাপাঠকদের প্রিয় কবি তিনি। আল মাহমুদ জীবনবাদী কবি। বিগত বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বাস্তবতা তিনি গ্রহণ করেছেন। তার সময়ের গণ অভ্যুত্থান-উত্তর প্রতিক্রিয়া, সমাজ নিরীক্ষণ ও মানবিক টানাপোড়েন তাঁর রচিত কবিতায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি জীবনের জয়গানে মুখর থেকেছেন।

‘সোনালী কাবিন’ সনেট গুচ্ছ আল মাহমুদের অনন্য সৃষ্টি। এ কথা বহুবার কবি নিজেও অকপটে স্বীকার করেছেন। একজন মানুষের চেতনাকে আপ্লুত করে তাঁর কাব্যভাষ্য। আল মাহমুদ রোমান্টিক মানস প্রবণতার অধিকারী হয়েও স্বদেশ, ঐতিহ্য চেতনা ও সমকালের কাছে দায়বদ্ধ থেকেছেন। তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম ও সমাজ ভাবনার স্ফুরণ লক্ষণীয়। স্বদেশ শস্যশ্যামলা প্রাকৃতিক প্রবাহ মানবচিত্তে আলোড়ন তোলে। তিনি স্মরণ করেন : লোকালয় থেকে দূরে, ধোঁয়া অগ্নি মশলার গন্ধ থেকে দূরে। এই দল কমলের ঝোপে আমার কাফন পরে আমি কত কাল/কাত হয়ে শুয়ে দেখে যাবো সোনার কলস আর বৃষের বিবাদ? আল মাহমুদ নিজস্ব বিশ্বাস নিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী। আবেগ, জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা পরতে পরতে মিশিয়ে তিনি যেসব কবিতা রচনা করেছেন, তাতে জীবন-অঙ্কের যুক্ত রেখায়ন ঘটেছে।-বাংলাদেশ প্রতিদিন

এ বিভাগের আরও সংবাদ