কলেজে আমার শিক্ষকতা জীবনের পরিধি প্রায় ৩৬ বছর (১৯৮৪-২০১৯)। যাপিত জীবন নিয়ে ভাবলে মনে প্রায়ই বিস্ময় জাগে। সাধারণ এক ব্যক্তি হিসেবে জীবনটা একদম ক্ষুদ্র হলেও এ সময়ে নিছক কম দেখিনি আমি। ১৯৭৫ সালে আমার এসএসসি সম্পন্ন হয়। সারা দেশে চারটি বোর্ডের অধীন মোট পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৮৩ হাজার জন। পাসের হার গড়ে ৪৬.৬৭%। চার বোর্ডে প্রথম বিভাগে পাস করে মোট ৩ হাজার ৫০৬ জন। সারা দেশে আমরা মোট যতজন পরীক্ষার্থী ছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক পরীক্ষার্থী আজকাল বছর বছর জিপিএ ৫ পেয়ে থাকে (২০২২ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি বোর্ড থেকে মোট ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল)। অবশ্য পরবর্তী সময়ে কমতে কমতে সম্প্রতি তা অর্ধেকেরও কমে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালে জিপিএ ৫ পেয়েছে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। অন্যদিকে ২০২২ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১ লাখ ৯০ হাজার জিপিএ ৫-এর বিপরীতে সর্বশেষ ২০২৬ সালে পায় মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন।
আমাদের দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর বিষয়টি খুবই আলোচিত। ২০০১ থেকে ২০২৬ সাল, দীর্ঘ ২৬ বছর। ২০০১ সালে এসএসসি ও সমমান এবং ২০০৩ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় প্রথমবারের মতো গ্রেডিং পদ্ধতিতে। বোধ করি সবার জানা, সাতটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের (ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট) অধীন এসএসসি পরীক্ষায় ২০০১ সালে উত্তীর্ণদের মধ্যে সারা দেশ থেকে মোট ৭৬ জন জিপিএ ৫ পায়। আর উল্লিখিত সাত বোর্ডের অধীন ২০০৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পায় ২০ জন। এ প্লাস বা জিপিএ ৫-এর শুরুটা ঠিক এভাবেই।
সাধারণ সাতটি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় ২০০১ সালে ৭৬ জন, ২০০২ সালে ৩২৭ জন, ২০০৩ সালে এক হাজার ৩৯১ জন এভাবে এ প্লাসপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও প্রথম ছয় বছর (২০০১-২০০৬) এসএসসি সমমান তথা মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ এ প্লাস পেয়েছিল বলে আমার জানা নেই।
এইচএসসি পরীক্ষার বেলায়ও এমনই। সাতটি শিক্ষা বোর্ডের অধীন উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২০০৩ সালে ২০ জন, ২০০৪ সালে তিন হাজার ৩৬ জন এবং ২০০৫ সালে পাঁচ হাজার ৫০৯ জন এ প্লাস পেলেও প্রথম তিন বছর (২০০৩-২০০৫) মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে কারও পক্ষে এ প্লাস পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দেশে গ্রেডিং পদ্ধতিতে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের শুরুতে প্রথম বছরেই (২০০১) ছাত্রীরা সবাইকে একেবারে তাক লাগিয়ে দেয়। ৫ জুলাই ২০০১-এ প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এ প্লাস পাওয়া মোট ৭৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৯ জনই ছাত্রী। একুশ শতকের শুরুতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এও এক স্মরণীয় ঘটনা।
শুরুর দিককার আরেক চমক হলো, জিপিএ ৫ পাওয়া উল্লিখিত ৭৬ জনের মধ্যে ৭২ জনই ঢাকা বোর্ডের। এ ৭২ জনের মধ্যে আবার ৭১ জনই বিজ্ঞান বিভাগের। বিজ্ঞান বিভাগের ৭১ জনের মধ্যে ছাত্রী ৪৭ জন (দুই-তৃতীয়াংশ) আর ছাত্র ২৪ জন।
সেবার (২০০১) দেশের সেরা সেরা কলেজ, এমনকি একাধিক শিক্ষা বোর্ড থেকে কোনো শিক্ষার্থীই এ প্লাস পায়নি। বোর্ডওয়ারি জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরা হলো : ঢাকা বোর্ডের ৭২ জন, কুমিল্লা বোর্ডের ১ জন, সিলেট বোর্ডের ২ জন ও বরিশাল বোর্ডের ১ জন। এসএসসিতে কোনো পরীক্ষার্থীই জিপিএ ৫ পায়নি এমন বোর্ড তিনটি হলো : রাজশাহী, যশোর ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড।
প্রথমবারের মতো ২০০৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় তিনটি বোর্ডে মোট যে ২০ জন এ প্লাস পায়, তাদের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বোর্ডে ১৫ জন, রাজশাহী বোর্ডে চারজন ও যশোর বোর্ডের একজন পরীক্ষার্থী। প্রথম বছর (২০০৩) এইচএসসিতে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বোর্ডের কেউ এ প্লাস পায়নি।
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও (এইচএসসি ও সমমান) এ প্লাস পায়নি প্রথম তিন বছর (২০০৩-২০০৫) মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কোনো পরীক্ষার্থী। গত ছয় বছরের (২০২১-২০২৬) এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ৯টি সাধারণ ও মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (মোট ১১টি) অধীন অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় ২০২১ সালে জিপিএ ৫ পায় মোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন (উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের ৮.৭৫%), ২০২২ সালে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন (১৫.৪৬%), ২০২৩ সালে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন (১১.১৮%), ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন (১০.৮৯%), ২০২৫ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন (১০.৬৬%) ও ২০২৬ সালে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন পরীক্ষার্থী (১০.২৪%)।
একইভাবে উল্লিখিত ১১টি বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত ছয় বছরের (২০২১-২০২৬) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ২০২১ সালে জিপিএ ৫ পায় মোট ১ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ জন (১৩.৭৯%), ২০২২ সালে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৮২ জন (১৭.৪১%), ২০২৩ সালে ৯২ হাজার ৫৯৫ জন (৮.৬৭%), ২০২৪ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন (১৪.০৯%), ২০২৫ সালে ৬৯ হাজার ৯৭ জন (৯.৫০%) ও ২০২৬ সালে ৪০ হাজার ৮৪ (৬.২০%) জন পরীক্ষার্থী।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু গত পাঁচ বছরে (২০২২-২০২৬) ১১টি বোর্ডের অধীন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় ৯ লাখ (৮ লাখ ৯১ হাজার ১৭ জন) শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করেছে। এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার বেলায়ও এমনই। পাঁচ বছরে (২০২২-২০২৬) ১১টি বোর্ড থেকে জিপিএ ৫ পায় মোট প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ (৫ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৯ জন) পরীক্ষার্থী। হালে অবশ্য চিত্র অনেকটা পাল্টেছে। একদিকে জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা, অন্যদিকে পাসের শতকরা হার; বছর বছর উভয়টিই কমছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যাসহ নানা কিছু নিয়ে সব মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অবশ্য তা হওয়ারই কথা। পাসের হার ৯৫% থেকে যেখানে ৫২%-এ নেমে এসেছে কিংবা মাত্র ২০ জন থেকে বাড়তে বাড়তে জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার পর্যন্ত উঠে আবার মাত্র ৪০ হাজারে নেমে এসেছে। তবে পাসের হার আর কৃতীদের সংখ্যা যখন যেমনই হোক, খেয়াল রাখা চাই শিক্ষার মান যাতে রজায় থাকে, তা নাহলে সবই হবে গরল ভেল।
লেখক: কলামিস্ট, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক