শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

পরীক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক নিরীক্ষা

Advertisement
আরটিভি হেড অব নিউজ ইলিয়াস হোসেন

‘ছাত্রজীবন সুখের জীবন, যদি না থাকে এক্সামিনেশন’— এটি পরীক্ষা নিয়ে সব বয়সী শিক্ষার্থীর মনের চিরন্তন অনুভূতির প্রকাশ। কেউ কেউ বলেন, লেখাপড়া আর পরীক্ষার আবিষ্কারককে হাতের কাছে পেলে দেখে নিতেন। পরীক্ষা নিয়ে নানারকম কুসংস্কার, রসিকতা এবং মজার প্রবাদ চালু আছে সমাজে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কাটে মানবজীবন। কিন্তু, শিক্ষা জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। গুরুর কাছে দীক্ষার সংস্কার হতে হতে শিক্ষার দফারফা হয়ে গেছে। সময়োপযোগী সংস্কারের দাবিও এখন চিরন্তন। ‘পরীক্ষা’ শব্দটির বেশ কয়েকটি অর্থ রয়েছে। যেমন, গভীরভাবে কোনো কিছু পর্যবেক্ষণ করা, পরিদর্শন বা অধ্যয়ন করা।

১৮০৬ সালে সিভিল সার্ভিসের প্রার্থী নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যে পরীক্ষা পদ্ধতির প্রচলন করে ব্রিটিশরা। পরে ১৮৫৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ পদ্ধতি নিয়ে আসে ভারতীয় উপমহাদেশে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিয়ে তারা কোম্পানির জন্য বেসামরিক কর্মচারী নিয়োগ দিত। তবে পরীক্ষা বলতে খাতা-কলমে প্রশ্নোত্তর লেখার প্রচলন ছিল না। লন্ডনে একটা পরীক্ষা নেওয়া হতো প্রতি বছর আগস্ট মাসে। সেখানে পরীক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক ঘোড়ায় চড়ে দেখাতে হতো। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরা পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করলেও পড়ালেখা শুরু হয়েছিল অনেক অনেক আগে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতে ‘গুরুকুল’ নামে শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একটি নির্দিষ্ট ঘরে থাকতেন। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া ও পড়ালেখা হতো। অনেকটা আধুনিক হোস্টেলের মতো বলা যায়। সেই গুরুকুলে ছিল না কোনো পরীক্ষা পদ্ধতি। গুরু যদি মনে করতেন, ছাত্রের পর্যাপ্ত জ্ঞান হয়েছে, তাহলেই তার পড়ালেখার পাঠ শেষ। তবে ব্রিটিশদের কারণে এ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। নিজেদের আধিপত্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশরা অর্থ ও শাসন বিভাগের দায়িত্ব নেয়। তাদের সঙ্গে কাজ করতে হলে তো ইংরেজি না জেনে উপায় নেই। তাই ভারতীয়রা ইংরেজি শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়। এভাবে ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা চিরতরে হারিয়ে যায়।

তবে, বাংলাদেশিদের ইংরেজি শিক্ষা আজও পূর্ণতা পায়নি। এবারের উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে উৎকটভাবে তার কুফল দেখা গেছে। ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৭০ শতাংশ পৌঁছায়নি। অন্য বোর্ডগুলোতে ইংরেজিতে পাসের হার ৫৪ থেকে প্রায় ৬৬ শতাংশের মধ্যে। আইসিটি বিষয়েও এবার খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। বাধ্যতামূলক এই দুটি বিষয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব সামগ্রিক ফলাফলেও পড়েছে। পাসের হার মাত্র ৫২.১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন। এমনকি জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তিও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অনেকে এই ফলকে পতন বা বিপর্যয় বলছে। আবার কেউ কেউ বলছে, যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়েছে। পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন, খাতা দেখায় কড়াকড়ি, গত দুই বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরীক্ষার সময় বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান ও শিখন ঘাটতির বিষয়টিও জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে। এবার ২৯৭টি কলেজ থেকে কেউ পাস করেনি। আগে বিভিন্ন কলেজ প্রতি বছর শতভাগ পাসের রেকর্ড গড়েছে। যদিও তা নিয়ে সমালোচনা আছে। টেস্ট পরীক্ষায় এক বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহনের সুযোগ দেয় না কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান।

ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘খাতা দেখায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি। ফলাফলে কোনো অসংগতি থাকলে শিক্ষার্থীরা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করতে পারবে।’ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় এবার পরীক্ষার পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়নে শতভাগ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা হয়েছে। অতীতে জিপিএ ফাইভ কিংবা পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।’ এই গুরুতর অভিযোগ গত দেড় যুগ ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে। প্রাথমিক থেকে সব পর্যায়ে শতভাগ পাস দেখিয়ে জনগণকে কৃত্রিম খুশি রাখা হতো বলে মনে করে সংশ্লিষ্টরা। এবার অতি কড়াকড়ি ব্যবস্থাও কৃত্রিম কি না তা নিয়ে ধন্দে পড়েছে অনেকে। শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়ে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ভালোভাবে দেখছে না শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তাছাড়া বিষয়ভিত্তিক ও দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি সবার জানা। মূল্যায়নের মান নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে।

২০০৫ সাল থেকে এ বছর পর্যন্ত ২২ বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাসের হারে সবচেয়ে বড় অবনতি হয় গত বছর। ২০২৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৭৫ শতাংশের বেশি। গত বছর তা কমে দাঁড়ায় ৫৭ শতাংশের ঘরে। করোনা শুরুর বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে পরীক্ষা ছাড়াই ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই বছর সব পরীক্ষার্থী পাস করেছিলেন। সে বছর সবাইকে অটোপাস দেওয়া হয়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। আবার ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থীদের একাংশের চাপের মুখে মাঝপথে বাতিল করা হয়েছিল এইচএসসিতে স্থগিত হয়ে পড়া কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা। সেগুলোর ফলাফল তৈরি করা হয়েছিল পরীক্ষার্থীদের এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিষয় ম্যাপিং করে। অটোপাসের ব্যাপারটি কখনও সম্মানের নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালেও অটোপাস দেওয়া হয়েছিল। সে বছর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সারাজীবন বাহাত্তইরা বলে উপহাস করেছে মানুষ।

এখন ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের ভুল ও অসংগতির অভিযোগ উঠেছিল। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের দুটি প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি সরকার স্বীকারও করেছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রসায়ন ও জীববিজ্ঞান বিষয়েও প্রশ্নপত্রে কিছু অসংগতির অভিযোগ করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা। প্রশ্নপত্র বিতরণেও কিছু গরমিল হয়। কোথাও নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া হয় অনিয়মিতদের জন্য তৈরি প্রশ্নপত্র। কোথাও আবার প্রথম পত্রের পরীক্ষার জায়গায় নেওয়া হয় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ, দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি এবং তদন্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। ফল দেখে এবার কোনো কোনো শিক্ষার্থী অবাক হয়েছে। ইংরেজিতে কাঙ্ক্ষিত নম্বর পায়নি। আবার, আইসিটিতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। এ নিয়ে খাতা দেখায় শিক্ষকের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব নিয়েই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের শত শত কলেজ। এ ছাড়া, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও সামর্থ্য ছাড়া উন্নত দেশের আদলে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। আবার আগের পদ্ধতিতে ফেরা, ঘন ঘন পাঠ্যক্রম এবং পাঠ্যসুচি পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানানো হয়।

আলোচিত সমস্যার আড়ালে আছে শিক্ষা ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব। জাতীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না করে দলীয় বিবেচনায় যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তি, শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদ নিয়োগ করা হয়। ক্ষমতাসীন দলের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য লোককে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও দলীয় রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সৎ ও যোগ্য লোক নিয়োগ পেলেও প্রশাসনিক দায়িত্ব পান না। ফলে, বাদশাহ আলমগীরের সময়ের মতো সমাজে আজ শিক্ষকের মর্যাদা নেই। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণে প্রায়ই তারা মবের শিকার হন। বিনয় শিক্ষার পরিবর্তে ছাত্র সমাজও এখন ক্ষমতার চর্চা করে। বড় ভাইদের নির্দেশে অনেক সময় নিরীহ শিক্ষকের ওপরও চড়াও হয় তারা। তাছাড়া, প্রাপ্য সম্মান ও সম্মানী না থাকায় মেধাবী এবং যোগ্যরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। শিক্ষার মান এবং শিক্ষকের মর্যাদা না ফেরালে জাতিকে ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে। সব রাজনৈতিক দলকেই খেসারত দিতে হবে। কাজেই দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত উদার, আধুনিক, কর্মমুখী ও সুদূরপ্রসারী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তবে, রাজনীতি ঠিক হলে শুধু শিক্ষা নয়, সব ক্ষেত্রই ভালো ফল পেত।


লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

এ বিভাগের আরও সংবাদ