শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

বিসিএস পরীক্ষা যেন অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানবিমুখ না করে

Advertisement

আমরা মেরা প্রায়শ শুনে থাকি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ছাত্রছাত্রীরা বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেন। কিছুদিন পরে কোচিং সেন্টারে দৌড়াতে থাকেন। এতে তাদের নিজস্ব একাডেমিক বিষয়ের পড়াশোনা দারুণভাবে বিঘ্নিত হয়। ফলে বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য না হতে পারলে দুই কূল হারাতে হয়। একাডেমিক বিষয়ের পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল করতে পারেন না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে শিক্ষকদের সঙ্গে মূল্যবান সময় অতিবাহিত না করে চাকরির পরীক্ষার পেছনে দৌড়ে আদর্শ মানুষ হওয়ার উপদেশাবলি থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

আগেকার সময়ে বিসিএসের সিলেবাসের মধ্যে ৬০০ নম্বরের তিনটি বিষয় নির্বাচন করা যেত। তখন নিজের অনার্সের বিষয় এবং সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট সিলেক্ট করলে একাডেমিক পড়াশুনার বিষয়গুলো বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কাজে লাগত। ফলে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিলেও নিজস্ব বিভাগীয় সাবজেক্ট ভালো করে পড়ার প্রতি আগ্রহ থাকত। বর্তমান পদ্ধতিতে বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ইলেকটিও বলে কিছু নেই বলে বিভাগীয় বিষয়ের খুব একটা ভূমিকা নেই। তাই নিজস্ব বিভাগীয় বিষয় পড়ার আগ্রহে চিড় ধরে।

বিসিএস পরীক্ষায় প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার শর্ত বর্তমানে খুবই শিথিল। সমগ্র জীবনে একটা তৃতীয় শ্রেণি থাকলেও বিসিএস পরীক্ষায় বসা যায়। তৃতীয় বিভাগধারীকে সুযোগ দেওয়ায় প্রার্থী ভাবতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বা মাস্টার্স পর্যায়ে তার একটা তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি পেলেও ক্ষতি নেই। তাই তিনি বিভাগীয় পড়াশুনায় ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন এবং বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অধিক সময় দিতে থাকেন। আমাদের মতে, বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য বর্তমানে নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতার শর্ত এমন থাকতে হবে যে, জীবনে কোনো পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ বা তৃতীয় শ্রেণি পাওয়া চলবে না। এমন হলে যাদের বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা থাকবে, ছাত্রাবস্থায় তারা বিভাগীয় পড়াশুনাকে পাশ কাটানোর ঝুঁকি নেবেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব ধরে রাখার জন্য বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় আগের মতো তিনটি নির্বাচিত বিষয়ে কমপক্ষে ৩০০ নম্বরের পরীক্ষণ সিলেবাসে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। এমন ব্যবস্থা থাকলে যারা ভবিষ্যতে বিসিএস পরীক্ষা দেবেন, তারা যে-যে ফ্যাকাল্টিতে পড়েন, সেই ফ্যাকাল্টির অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের মধ্য থেকে বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন। বিসিএস পরীক্ষায় ভালো করতে হলে নিজস্ব একাডেমিক বিষয়ও ভালোভাবে পড়তে হবে। অন্যদিকে, বিভাগ এবং শ্রেণি, অথবা একাডেমিক গ্রেড-পয়েন্ট বিবেচনায় একটা উচ্চমানের বেঞ্চমার্ক পয়েন্ট আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা বিবেচিত হলে একাডেমিক কোর্সের প্রতি অবহেলা রোধ করা যাবে। যারা আবেদন করতে পারবেন না, তাদের বুঝতে হবে যে, বুয়েটে বা মেডিক্যাল কলেজ এবং ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য যেমন ন্যূনতম একটা পয়েন্ট নির্ধারিত থাকে, বিসিএসের জন্য তেমনি থাকবে।

বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে চাকরির পরীক্ষায় ভালো করতে পারা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তাই বলে আগের একাডেমিক অর্জনগুলো নিরর্থক নয়। সেগুলোরও গ্রেডভিত্তিক মূল্যায়ন থাকতে হবে। অন্যথায় একাডেমিক পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নষ্ট হবে। ভালো মানের একাডেমিক যোগ্যতা অর্জনের পড়াশোনার সপক্ষে বিষয়-সংশ্লিষ্ট চাকরির অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রেও জাতি আশা করে, তাদের সেরা সন্তানেরা সেখানে গিয়ে জনসেবা দিক। বিসিএসের পেছনে দৌড়ে মেধাবীরা সেসব ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে বিষয়-সম্পৃক্ত চাকরিতে শূন্যতা সৃষ্টি হবে-যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। পাশাপাশি ক্যাডার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তাকেও চৌকশ হতে হবে। তার একাডেমিক যোগ্যতা উচ্চমানের না হলে, তিনি নেতৃত্বের আসনে বসলে তাকে বেমানান লাগবে, তিনি হীনম্মন্যতায় ভুগবেন। আগের সিএসএস পরীক্ষা, বা বাংলাদেশ আমলের একটা সময় পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষায় দেখা যেত, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগের ওপরের দিকের স্থান দখলকারীগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভালো করতেন। বর্তমান বিসিএস পরীক্ষা এমন হতে হবে, যাতে একাডেমিক ভালো রেজাল্টধারীরা ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেন। মনে রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চাকরির পরীক্ষায় ভালো করার মধ্যে যতই কৃতিত্ব থাকুক, শিক্ষক-ছাত্রের গুরু-শিষ্য সম্পর্কের চেইনও অটুট থাকা চাই। আদর্শ মানুষ হতে নৈতিকতা গঠন, এবং ব্যক্তিত্ব অর্জনে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের গভীরতা অনেক বড় সম্পদ। -ইত্তেফাক


লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও প্রবন্ধকার

এ বিভাগের আরও সংবাদ