আবদুল্লাহ আল-হারুন
সাহিত্যের দুই প্রধান স্তম্ভ—পদ্য ও গদ্যের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আকার-প্রকার-প্রভাব ছাড়াও একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তফাৎ হলো—গদ্যের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। কিন্ত পদ্যের আছে। ছন্দ, পয়ার, চতুষ্পদ, মিত্রাক্ষর, অমিত্রাক্ষর, সনেট, তিন লাইনের হাইকু আরও অনেক বিধি-নিষেধ। তবে আধুনিক কবিতায় এসব নিয়মকানুনের বালাই অনেক কম। নেই বললেই চলে।
জি বি এম রুবেল আহম্মেদের সাথে আমার পরিচয় সাম্প্রতিক। সে আমার প্রিয় শহর জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জের বাসিন্দা। একজন বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হয়েও পেশায় শিক্ষক। নেশায় আপাদমস্তক কবি। তার একটি কবিতা, জামালপুরের একদা প্রমত্ত, অধুনা লুপ্ত ব্রহ্মপুত্র নদকে নিয়ে। যে হতভাগা নদটি গত ষাট দশক অবধি শহরটির ধার দিয়ে সগৌরবে ও বর্ষাকালে কলমুখরিত সশব্দে বয়ে চলত। আজ তা শুধু একটি স্মৃতির রেখা। এই করুণ ইতিহাস তার কবিতার প্রতিটি লাইনে ব্যক্ত।
আমি কবিতার মানুষ নই। মনে-প্রাণে আমি গদ্যের পাঠক ও অতি সামান্য লেখক। সম্প্রতি ফেসবুকের কল্যাণে আমি বাংলাদেশের বেশ কিছু আধুনিক কবিদের সংস্পর্শে এসেছি। এদের মধ্যে বেশিরভাগই জামালপুরের বাসিন্দা। কবি রুবেল আহম্মেদ তাদের মধ্যে একজন। যার সাথে এখনো পরিচয় ফেসবুকের মাধ্যমে, মেসেজ আদান-প্রদানে, তার কবিতার বই নিয়ে লিখতে হলে বেশিরভাগই অনুমান, অনুভূতি এবং তার যে কয়েকটি কবিতা পড়া হয়েছে, তাদের মধ্যেই কবিকে খুঁজতে হয়। এখানে অভিজ্ঞতা নেই, নেই কোনো স্মৃতি, শুধু আছে আকর্ষণ আর সদিচ্ছা।
কবি হিসেবে রুবেলের মধ্যে ভাবনা-কল্পনা আর বাস্তবের একটি প্রশংসার্হ রাসায়নিক প্রক্রিয়া সদা কর্মচঞ্চল। তার প্রতিভা সমস্ত সন্দেহের ঊর্ধ্বে। বয়স অল্প। সামনে প্রায় গোটা জীবনটাই পড়ে আছে। কবিতা তার মস্তিস্কে নয়, হৃদয়ে। তাই স্বদেশপ্রেম, প্রকৃতি, আলো, বাতাস, ফুল-ফল, বৃক্ষরাজি, নদ-নদী সবই তার কবিতার মহৎ উপকরণ। যে কবি দেশকে ভালোবাসে, জন্মস্থানের প্রতি সদা কৃতজ্ঞ থাকে, মনে যার সর্বদা মা ও মাতৃভাষার প্রতি সংবেদনশীল তাড়না ও ভালোবাসা, তার কবি না হয়ে আর কোনো উপায় থাকে না। সব কবিই কবি নয়, কিন্তু সৎকবিদের সংখ্যা কম হলেও তাদের মধ্যে রুবেল তার স্থানটি শক্ত করেই আত্মস্থ করেছেন। অন্তর দিয়ে তিনি ধারণ করেছেন বাংলার কাব্যাকাশ, স্বদেশের মাটি ও মানুষকে।
তার ‘আঁতুড়ঘরের চিৎকার’ গ্রন্থের নেতৃস্থানীয় ও প্রতিনিধিত্ব মূলক কবিতাটি থেকে আমি চারটি লাইন উল্লেখ করছি—‘আঁতুড়ঘর থেকে ভেসে আসা/ প্রথম যে ধ্বনি কানে এলো/ সেটিই আমার মায়ের ভাষা/ সেই মোদের বাংলা ভাষা’—এরপরে আর কিছু বলার থাকে না। আমি বইটির বহুল পাঠ ও প্রচার কামনা করছি।
বই: আঁতুড়ঘরের চিৎকার
কবি: জি বি এম রুবেল আহম্মেদ
প্রকাশক: হরিৎপত্র
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
মূল্য: ২৫০ টাকা