যেহেতু সন্তানের প্রতি আমাদের আবেগ অত্যন্ত গভীর, টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনা সামনে আসার পর পুরো দেশবাসী এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেন। সামাজিক মাধ্যমে নির্যাতনকারী শিক্ষকের উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে পোস্ট-কমেন্টের ঝড় বয়ে যায়। ধর্মীয় শিক্ষার আঁতুড়ঘর মাদ্রাসাসমূহে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা এবং ঊর্ধ্বতনদের তদারকি বৃদ্ধির দাবিও উঠে বড় পরিসরে। অভিযুক্ত শিক্ষককে দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই আশাবাদও তৈরি হয় যে, শিশুটি ও তার পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন।
কিন্তু ২৪ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে প্রতিবাদের ভাষা বদলে যেতে থাকল। প্রথমিক প্রতিবাদ, ঘটনার বিচার ও ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবির স্থান নিয়ে নিল মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলেম সমাজকে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেয়প্রতিপন্ন করে উচ্চারণ অযোগ্য ভাষার ক্রমাগত পোস্ট- কমেন্ট। বিচারের দাবি আর বিদ্যমান ব্যবস্থার সমালোচনার স্থান নিয়ে নিল অশালীন,নোংরা গালিগালাজে ভরা ঘৃণার চাষবাস। আমরা সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও যেন এই প্রতিবাদের মূল প্রেক্ষাপট ও প্রতিপাদ্য ভুলে গেলাম। আলেম সমাজকে সমাজের জঘন্য জীব হিসেবে এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে একটি অমানবিক- জঘন্য শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরে চলমান পোস্ট-কমেন্টের স্রোতে আমরাও গা ভাসালাম।
আরও পড়ুন :থাপ্পড় কাণ্ড: অন্যায্য ফেসবুক পোস্টের জন্য আমরা অনুতপ্ত হব কি?
বিষয়টা দাঁড়াল এমন- প্রথমে শিক্ষক কর্তৃক অপরাধের বিচার ও পুনরাবৃত্তি রোধের দাবি, এরপর অপরাধীর পরিচয়কে সামনে এনে বিদ্রূপ, ব্যঙ্গ, অপমান ও ঘৃণার ভাষা ছড়িয়ে পড়া। ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট অপরাধীর জায়গায় তাঁর পেশাগত বা হুজুর পরিচয়কে বসানো। তারপর সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে একই পাল্লায় তুলে নিয়ে বিদ্রুপাত্মক, অবমাননাকর মন্তব্যের স্রোত সৃষ্টি।
এভাবে প্রতিবাদ ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। প্রসঙ্গটি আর থাকে না যে, অপরাধীকে অপরাধের শাস্তি পেতে হবে, ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তার পরিবর্তে প্রসঙ্গ দাঁড়িয়ে যায়- হুজুরেরা সবাই বলাৎকার তথা পায়ুসঙ্গমে যুক্ত, আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে আর কখনো মাদ্রাসা বা মসজিদে পাঠাব না, মাদ্রাসা মানেই অপকর্মের কেন্দ্রস্থল ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাষাভঙ্গিও এমনভাবে বদলে যায় যে, বস্তির লোকজনও (তুচ্ছার্থে নয়) শুনলে নির্ঘাত লজ্জা পাবে।
লক্ষ করুন, সমাজ মাধ্যম, বিশেষত ফেসবুকে একটি নির্দিষ্ট অপরাধের বিচার চাওয়া ও মাদ্রাসার সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা আরো উন্নত করে এর পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধের আলোচনাটি কীভাবে মাদ্রাসা বন্ধ করা, আলেমদেরকে তুচ্ছ ও হেয় করে সমাজে অচ্ছুৎ করে তোলা এবং ছেলেমেয়েদেরকে মাদ্রাসা- মসজিদে না পাঠানো বিষয়ক মন্তব্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়ে গেল!!! আমাদের সমাজের টিকে থাকার পক্ষে অপরিহার্য একটি উপাদানকে দুর্বল করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল!!!
এক পর্যায়ে দেখা গেল পূর্বেকার বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসায় সংঘটিত ঘটনার ভিডিও নতুন করে একের পর এক পোস্ট করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কে বা কারা এআই নির্মিত একটা বিদ্রুপাত্মক ফেইক পোস্টার বানিয়ে ছেড়ে দিলো-‘মাদ্রাসায় বডিবিল্ডারদের সন্তানদের ভর্তি নেওয়া হয় না’। আমরা সবাই নির্বোধের মতো এসব ভিডিও ও পোস্টার শেয়ার করা শুরু করতে অপরাধীর বিচারের দাবিতে প্রতিস্থাপিত আলেম ও মাদ্রাসা বিদ্বেষ নতুন করে জোর হাওয়া পেল। ততক্ষণে আমরা ভুলে বসে আছি, আমরা কী বলতে চেয়েছিলাম আর কী বলছি। আমাদের দাবি পথ হারালো, সঙ্গে অবর্ণনীয় ক্ষতি ডেকে নিয়ে আসল আমাদের দেশের আলেম সমাজ ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য। প্রকৃতপ্রস্তাবে ক্ষতিটা কি আমরা নিজেদেরই করলাম না!
শেষে আবারো বলব, আমাদের মাদ্রাসা-মসজিদগুলোতে কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও জবাবদিহিতা এত বেশি হওয়া জরুরি, সংঘটিত অপরাধের শাস্তি এমন তীব্র হওয়া জরুরি, যেন নিকট ও দূর ভবিষ্যতে কেউ মাদ্রাসা- মসজিদের মতো জায়গায় অপকর্মে যুক্ত হওয়া দূর কি বাত, সেটি কল্পনায় আনতেও ভয় পায়। আরো বেশি জরুরি আমাদের এই উপলব্ধি জাগ্রত হওয়া যে, আমাদের প্রতিবাদ যেন কখনো পথচ্যুত হয়ে আমাদের ভালবাসা, বিশ্বাস, ভরসার জায়গা আলেম সমাজের বিরুদ্ধে, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিপক্ষে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণায় পর্যবসিত না হয়ে যেতে পারে।
লেখক : বিসিএস (পুলিশ), এডিশনাল স্পেশাল এসপি (সিআইডি)