শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

খাতায় ফেল, নাকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটাই ফেল?

Advertisement

আশির দশকের শুরুতে জন্ম নেওয়া আমাদের প্রজন্মের শৈশব কিংবা কৈশোরে খবরের কাগজে পাসের হারের বন্যা কিংবা ঘরে ঘরে জিপিএ ৫ পাওয়ার এমন রমরমা অবস্থা আমরা কখনো দেখিনি। ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন বা স্টার মার্কস পাওয়ার জন্য সে যুগে ঠিক কতটা ঘাম ঝরাতে হতো, তা আমাদের প্রজন্মের সবাই খুব ভালো করেই জানেন।

তখন এক একটি নম্বর অর্জনের পেছনে থাকত সত্যিকারের মেধা আর গভীর সাধনা। তাই গত দুই দশক ধরে যখন দেখতাম পাসের হার হুহু করে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আর সবাই মুঠোভরে জিপিএ ৫ পাচ্ছে, তখন থেকেই মনের ভেতর একটা খটকা লাগত। মনে হতো, কোথাও তো একটা গরমিল আছে। এত রাতারাতি পুরো দেশের ছাত্রছাত্রী সবাই কি আইনস্টাইন হয়ে গেল? নাকি অন্য কোনো ঘাপলা চলছে? আর সেই দীর্ঘদিনের জমানো গরমিলের মুখোশটাই পুরোপুরি খুলে দিল ২০২৬ সালের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফল।

এ বছর ফল প্রকাশের পর চারদিকে কেমন যেন একটা পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছে। পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬২.২৫ শতাংশে। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটাই নাকি সবচেয়ে কম পাসের হার! একটু হিসাব করে দেখলে ভেতরটা শিউরে ওঠে—এই একটিমাত্র পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি প্রায় পৌনে সাত লাখ শিক্ষার্থী। শতকরা হিসাবে দাঁড়াচ্ছে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৮ জন কিশোর-কিশোরী আজ ফেলের কালি মেখে বসে আছে। গত বছরও যেখানে পাসের হার ছিল ৬৮ শতাংশ, সেখান থেকে হঠাৎ এত বড় ধস নামার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে দোষারোপের মহোৎসব।

চারপাশে এখন একটাই কথা—এই পরিণতির জন্য আসলে দায়ী কে? কেউ আঙুল তুলছেন আজকের ছেলে-মেয়েদের টিকটক আসক্তি, ফ্রি ফায়ার গেম বা রাস্তায় ‘ভাই ভাই’ কালচারের দিকে। কেউ বলছেন, অ্যানড্রয়েড মোবাইল নামের সর্বনাশা যন্ত্রটাই ওদের জীবন বরবাদ করে দিয়েছে। আবার কেউ দোষ দিচ্ছেন শিক্ষকদের উদাসীনতা আর অভিভাবকদের অবহেলার ঘাড়ে। অনেকেই খুব সহজে একবাক্যে রায় দিচ্ছেন যে এই প্রজন্ম একদম নষ্ট হয়ে গেছে, তাদের পড়াশোনার প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখুন তারা তো এই সমাজেরই বুক থেকে বড় হয়েছে। আজ যারা ফেল করেছে, তাদের সবার ঘাড়ে একাই সব দায় চাপিয়ে দেওয়া কি খুব বেশি অন্যায় হয়ে যাচ্ছে না?

একটু পেছনের ইতিহাসটা ঘাঁটলে আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের প্রহসন চলেছে, তা কি কারো অজানা? শিক্ষাকে বানিয়ে ফেলা হয়েছিল রাজনৈতিক বাহবা নেওয়ার একটা বড় হাতিয়ার। পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে জনগণের চোখে ধুলা দেওয়া হতো, যেন মনে হতো দেশটা শিক্ষার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। জিপিএ ৫ যেন হয়ে উঠেছিল ঋতুভিত্তিক কোনো মৌসুমি ফল—খুব সহজেই গাছের আম কুড়ানোর মতো সবাই সেটা মুঠোভরে পেয়ে যেত। তখন প্রশ্ন ফাঁস, পরীক্ষার হলে নকলের মহোৎসব আর শিক্ষার নামে সার্টিফিকেট বিক্রির রমরমা বাণিজ্য পুরো সিস্টেমটাকে একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছিল। ওই সময়কার কোমলমতি শিশুরা যখন দেখল যে পড়াশোনা না করেও শুধু খাতা ভরিয়ে বা শর্টকাট উপায়ে দারুণ ফল করা যায়, তখন তারা সেটাই বিশ্বাস করে নিয়েছিল। সিস্টেমটাই তাদের শিখিয়েছিল যে মেধার চেয়ে গোঁজামিল অনেক বেশি শক্তিশালী।

আজ যখন হঠাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসল, পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে কড়াকড়ি করল, তখন তো এই কৃত্রিম বেলুনটা ফুটবেই। ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই গোঁজামিলহীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা যখন ২০২৬ সালে এসে আরো শক্ত হলো, তখনই আমাদের শিক্ষার আসল চেহারাটা নগ্ন হয়ে সামনে চলে এলো। এত দিন যাকে আমরা বিশাল সাফল্য বলে বুক ফুলিয়েছি, সেটা আসলে একটা ভুয়া বেলুনের ফুলকি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আজ যারা ফেল করেছে, তারা হঠাৎ রাতারাতি বোকা হয়ে যায়নি। এত দিন যে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আমরা সাফল্যের রঙিন ফানুস উড়াচ্ছিলাম, আজ সেই খাদের আসল গভীরতাই আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তাহলে বলুন, এই যে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করল, তারা কি সত্যি ফেল করেছে? নাকি আমাদের এই গলিত ও ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাটাই তাদের ফেল করিয়ে দিয়েছে? শিক্ষা নিয়ে যারা গত ২৫-৩০ বছর ধরে শুধু টেবিলের কাগজ উল্টে গেছেন, পরিকল্পনা আর গোলটেবিল বৈঠকের পর বৈঠক করেছেন, কিন্তু মাঠের বাস্তবসম্মত কোনো ভালো নীতিমালা তৈরি করতে পারেননি—ব্যর্থতা কি আদতে তাদের নয়?

আজকের ছেলে-মেয়েরা যদি পড়াশোনা থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ে, তার পেছনের পরিবেশটা একবার ভাবুন। যে সমাজ তাদের সামনে একটা সুস্থ বিনোদনের জায়গা, একটা খেলার মাঠ বা নৈতিকতার পরিবেশ তৈরি করতে পারল না, সেই সমাজ কি তাদের বিপথগামিতার দায় এড়াতে পারে? কিশোর গ্যাংয়ের যে সংস্কৃতি আজ চোখের সামনে দেখছি, তা তো এক দিনে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া আর পারিবারিক উদাসীনতার চাদরেই এগুলো ডালপালা মেলেছে।

আমাদের দেশের পড়াশোনার সিস্টেমটায় এখন আমূল পরিবর্তন আনা ভীষণ জরুরি। যে শিক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী না বানিয়ে শুধু মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী করে তোলে, তার কোনো মূল্য নেই। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ বছর যারা ফেল করেছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জীবন তো এভাবে এক নিমেষে নষ্ট হয়ে যেতে পারে না। যদি আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় একটি বিশেষ পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেত, তবে তা তাদের জন্য অনেক বড় একটা সুযোগ হতো।

ফল প্রকাশের পর সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যটা দেখা যায় ঘরের ভেতরে। সন্তান ফেল করার পর বহু মা-বাবা সমাজের লজ্জার ভয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন। পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজনের মুখের ওপর কথা শোনার ভয়ে তারা নিজেদের সব রাগ গিয়ে ঝাড়েন ওই কিশোর বা কিশোরী সন্তানটির ওপর।

অভিভাবকদের এই মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটলে ফল প্রকাশের পরের দিনগুলোতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ফলাফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেমন অন্তত সাতজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার সংবাদ হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে, তেমনি আমাদের সচেতন করে তুলেছে। পরীক্ষার ফল মনের মতো না হলে বা ফেল করলে জীবন শেষ হয়ে যায় না—এই সত্যটি আমাদের সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে। কোনো সার্টিফিকেটই একটি তাজা প্রাণের চেয়ে দামি হতে পারে না।

তাই আসুন, ছেলে-মেয়েদের দিকে আঙুল তোলার আগে আয়নায় একবার নিজের চেহারাটা দেখি। এই ৬২.২৫ শতাংশ পাসের হার এবং এর জেরে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো কোনো একক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্র, শিক্ষক, অভিভাবক এবং গোটা সমাজব্যবস্থার সম্মিলিত পরাজয়। গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ এই ফলাফল এবং এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে এখনই সময় শিক্ষাব্যবস্থাকে গোড়া থেকে পাল্টে ফেলার। একটি বাস্তবসম্মত, সুন্দর ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে এই প্রজন্মকে নতুন আলো দেখাতে হবে। তাদের অপরাধী না ভেবে, তাদের কষ্টটাকে নিজেদের কষ্ট হিসেবে বুঝে পাশে দাঁড়ানোর সময় এখনই। আসুন, গোঁজামিলের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আমাদের সন্তানদের আগামীর পথে এগিয়ে দিই। -কালের কণ্ঠ

এ বিভাগের আরও সংবাদ