শিরোনাম
Advertisement
মুক্তস্বর

বিরোধীদের তাড়া সরকারের পীড়া

Advertisement
আরটিভির হেড অব নিউজ ইলিয়াস হোসেনসংগৃহীত

তাল পাকিয়ে ভাদ্র চলে গেছে ক্যালেন্ডার থেকে। কিন্তু আশ্বিনেও আসন গেড়ে বসে আছে তাল পাকা গরম। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কিছুটা কমলেও স্বস্তি মেলেনি জনজীবনে। তার ওপর বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। একে দাম বৃদ্ধির সর্বোচ্চ রেকর্ড বলা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়বে নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনে। এরই মধ্যে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবার অহেতুক কৌতুক করা হয়। বাড়ানো হয় পয়সায়। আদায় হয় টাকায়। প্রথম কয়েকদিন বাসের স্টাফদের সঙ্গে যাত্রীদের ঝগড়া ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে, সয়ে যায়। নিরুপায় যাত্রীরা কপালের দোষ দিয়ে কপাল ভেজায়। পণ্যের দাম বাড়ে। আকার ছোট হয়। খেয়েপরে বাঁচার তাগিদে পরিশ্রম বাড়ানোর পাশাপাশি খাওয়া কমানোর কথা শোনা যায়। পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অফিস-রেস্তোরাঁ। সরকার জানায়, বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। সমর্থকরা বিদেশের মূল্য তালিকা দেখিয়ে সান্ত্বনা দিতে চায়। উন্নত দেশের মূল্য তালিকা টাঙানো হলেও সেসব রাষ্ট্রের নাগরিক সুবিধার উদাহরণ আলোচনায় স্থান পায় না। বিরোধীরা তাদের তেলবাজ তকমা দেয়।

এরই মধ্যে বিরোধী দল তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। এ ছাড়া, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, মানুষের নিরাপত্তা এবং ন্যায্যমূল্যে সার ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার দাবিতে তাদের লংমার্চ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। ১১ দলীয় ঐক্য জোটের ঢাকা-রংপুর লংমার্চে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। বিভিন্ন বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের স্বার্থে আট দফা দাবি মেনে না নিলে তা যে কোনো মুহূর্তে এক দফায় রূপ নিতে পারে। লংমার্চ বা আন্দোলন কোনো হুমকি বা চাপ দিয়ে বন্ধ করা যাবে না।’ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘বিগত ১৬ বছর গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য লড়াই করলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে জনগণের মানবাধিকার হরণ করছে এবং গণতন্ত্র ধ্বংস করছে। শেখ হাসিনার আমলের আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সরকারও একইভাবে ব্যবহার করছে।’ তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানকে ক্ষমতা ছাড়ার রাস্তা নিজেকেই বেছে নিতে হবে।’

তাদের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অপরিণত হুংকার বলে মনে করছেন। অনেকটা গরমের দিনে শীতের পিঠার আয়োজনের মতো। এত আগে চূড়ান্ত পর্যায়ের হুমকি তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না জনগণের মাঝে। দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সূচকগুলো পুনঃস্থাপিত হওয়ার পথে পদে পদে বাধা পাচ্ছে সরকার। জননিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। উপরন্তু, পলাতক আওয়ামী লীগ সরকারের সক্রিয় দোসর পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন বাহিনীতে। এ অবস্থায় জুলাই বিপ্লবের সহযোদ্ধা হিসেবে ক্ষমতাসীন দলকে বিরোধীদের আরও সময় দেওয়া সমীচীন বলে মনে করেন কোনো কোনো পর্যবেক্ষক। কেননা, তপ্ত গরমে বিরোধীদের উত্তপ্ত কর্মসূচির সুযোগে ট্রেন-বাসে আগুন দিচ্ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। তাদের সরকারবিরোধী আলাদা আলাদা কর্মসূচিতে যুগপৎ আন্দোলনের আগাম ইঙ্গিত দেখছেন অনেকে। যদিও বিএনপি বলছে, এসব চোরাগোপ্তা হামলা আর হুংকারে ভীত নয় তারা। তবে, জামায়াত-এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলের কাছে আরও পরিপক্ব রাজনীতি আশা করেন বিশ্লেষকরা।

বিরোধীরা যখন রাজধানী থেকে বিভাগে বিভাগে লংমার্চ করছে, তখন জামায়াতের বহু সংসদ সদস্য বিদেশে শিক্ষা সফরে আছে। ৩৪ সংসদ সদস্য পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭১ জন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন ভ্রমণ করছেন। সফর শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব যাওয়ার কথা রয়েছে। এটিকে পূর্বনির্ধারিত একটি ‘শিক্ষা সফর’ বা ব্যক্তিগত সফর বললেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। আট মাসের মাথায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে বিদায় করার কথা বলছে বিরোধী দল। দেশে সংকট থাকলেও এত তারা নেই বলে মনে করে সাধারণ মানুষ। এরকম সময় বিপুলসংখ্যক এমপির শিক্ষা সফরের কর্মসূচি বৈপরীত্যে ভরা। শেখা হয়ে গেলে তারা রাজনীতিতে আরও ভালো করবে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তবে এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করলে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। উন্নত দেশ সফরে তাদের উন্নয়ন ভাবনা ও গণতান্ত্রিক শাসনে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তার ব্যুৎপত্তি ঘটবে বলে আশা করা যায়। তাদের ভ্রমণ তালিকায় থাকা প্রথম তিনটি দেশেই উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা আছে। ধর্মান্ধ বা ধর্মীয় রাজনীতির বাধা নেই আধুনিক জীবনে।

এদিকে, কম সময়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরে অল্প সঙ্গী নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাবা-মায়ের পর এবার জাতিসংঘে সরকারপ্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী প্রধানমন্ত্রী বাংলা ভাষায় বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবেন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। গত ডিসেম্বরে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার পর থেকেই একের পর এক চমক সৃষ্টি করছেন তিনি। বিনয়ী, মৃদুভাষী তারেক রহমান এক-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। উত্তারিধকার সূত্রে পেয়েছেন বিশাল ঋণের বোঝা ও তেল-গ্যাস সংকট। তারপর দুর্ভাগ্যের মধ্যপ্রাচ্য সংকট কণ্টকিত করে তুলেছিল ভবিষ্যৎ। তবু, গত আট মাসে কল্যাণমুখী নানা উদ্যোগের ঝুঁকি নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জনগণের কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন প্রতিনিয়ত। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে সহজাত তার বিনীত আচরণ। কিন্তু, তারই অনুগ্রহের সুযোগ নিয়ে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি দ্রুত দুর্বিনীত হয়ে উঠছেন। অল্প কিছু নেতাকর্মী মজলুম থেকে জুলুমবাজে পরিণত হয়েছেন। বদনামের জন্য যা যথেষ্ট। শুধু বিরোধী দলের কর্মসূচির তারা নয়, নিজ দলের এসব জঞ্জাল দিন দিন পীড়াদায়ক হয়ে উঠছে তার জন্য।

সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় অনুপস্থিত এবং দেরিতে আসা কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনা করেছেন এক প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কর্মকর্তাদের এখানে ফাজলামি বা পিকনিক করতে আসার সুযোগ নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাদের ডাকা হয়েছে।’

ওই একই সভায় তিনি ‘মন্ত্রী বড় নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্য বড়’—এই প্রশ্নও তোলেন। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সভায় মন্ত্রীদের চেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বড় মনে করে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিত থাকা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান। অন্য আরেকটি সভায় ফোন বাজার কারণে এক সিভিল সার্জনের ওপর ক্ষুব্ধ হন এক মন্ত্রী। মোবাইল ফোন বারবার বেজে ওঠায় বাইরে যাওয়া-আসা করেন ওই সিভিল সার্জন। মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে তাকে উদ্দেশ করে ‘ইউ গেট আউট ফ্রম দিস রুম’ বলে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। একে তিনি শিষ্টাচারবহির্ভূত ও অসদাচরণ বলে উল্লেখ করেন। মন্ত্রীদের এই শাহি মেজাজ তাদের বনেদি পরিবার থেকে পেয়েছেন বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু, গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় জমিদারি ভাব চলে না। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় জনসম্মুখে অপরাধীকে অপদস্থ করা যায় না। এটাও অসদাচরণ। তার ওপর আমলাতন্ত্রের অসহযোগিতার কথা শোনা যায় মাঝে মাঝেই। এই পরিস্থিতিতে বিষয়গুলো আরও স্মার্টলি দেখা উচিত।

এমনিতেই দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিমে সমাজে নানা অসংগতি বেড়েছে। উগ্র ধর্মান্ধতার আবাদ চালু থাকলেও বন্ধ ছিল সংস্কৃতি চর্চা। জনপ্রিয় ও সৃষ্টিশীল মানুষগুলো হাসিনা বন্দনায় বন্ধক রেখেছিল তাদের মেধা। অসহায় জনগণকে কামলা ভাবত সুবিধাভোগী আমলারা। মাদকের অবাধ সরবরাহে বিপ্রতীপ এক সমাজ তৈরি হয়েছে। যেখানে অপ্রতীমরা খুন হলেও হত্যাযোগ্য যুক্তি তুলে ধরে অনেক সাইকো। এই সমাজ, রাষ্ট্রকে পরিশুদ্ধ করতে হলে কেন্দ্রের নিবিড় পর্যবেক্ষণে নিতে হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। অথচ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা বা মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ক্রমাগত দূরত্ব বাড়ছে তৃণমূলের। কেউ কথা শুনতে চায় না বলে মুখ ফিরিয়ে থাকে প্রভাবশালীরা। দলীয় কোন্দলের আশঙ্কায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে অনেক পোড় খাওয়া, বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। জামায়াত এটা নিজ দায়িত্বে প্রচার করছে বিভিন্ন কর্মসূচিতে। এই সময়ে লংমার্চ দিয়ে সরকার ফেলা যাবে না। জামায়াত এটা ভালো করেই জানে। তবে, কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীদের সক্রিয় রাখা যায়। লংমার্চের মাধ্যমে সংগঠনকে চাঙ্গা রাখছে তারা। এই বিনিয়োগ দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ফসল ঘরে তুলতে চায় জামায়াত-এনসিপি। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন বিএনপির নেই কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা। রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ থাকে দলীয় উপস্থিতি। প্রত্যাশার তুলনায় ত্যাগী কর্মীদের প্রাপ্তি কম। সাংগঠনিকভাবে ঘুরে না দাঁড়ালে সরকারে দল স্থবির হয়ে যাবে। হয়তো হাইকমান্ড সে কথা মনে রেখে ভেতরে ভেতরে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কর্মসূচি রচনা করছে। তবে, দৃশ্যমান করা জরুরি। কেননা, দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তন হয় আড়ালের কারসাজিতে।

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

এ বিভাগের আরও সংবাদ