আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক মালবিকা সরকার। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথে বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা বিভাগের সহযোগী ডিন এবং আচরণগত ও সামাজিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাস্তবায়নবিজ্ঞান, মিশ্র পদ্ধতির গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োগ তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র।
বাংলাদেশে চিকিৎসাশিক্ষা দিয়ে তাঁর পেশাগত পথচলা শুরু। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি জনস্বাস্থ্যের দিকে মনোনিবেশ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ থেকে জনস্বাস্থ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এর আগে সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটে লিঙ্গ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণও নেন তিনি।
পেশাজীবনের শুরুতে বাংলাদেশে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন মালবিকা সরকার। কমিউনিটি পর্যায়ে চিকিৎসা, প্রজননস্বাস্থ্য এবং নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাস্তবায়নবিজ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়।
মালবিকা সরকার দীর্ঘ সময় ব্র্যাকের স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর তিন দশকের বেশি সময়ের জনস্বাস্থ্য ক্যারিয়ারে প্রায় এক দশক তিনি ব্র্যাকের কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ও সাব সাহারান আফ্রিকায় স্বাস্থ্যসেবা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ, প্রজননস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর গবেষণার বিস্তৃতি রয়েছে।
বাংলাদেশে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথে তিনি অধ্যাপক ও সহযোগী ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত ডিনের দায়িত্বও পালন করেন। একই সঙ্গে গবেষণার ফল কীভাবে কার্যকরভাবে স্বাস্থ্যনীতি ও মাঠপর্যায়ের সেবায় প্রয়োগ করা যায়, সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি বাস্তবায়নবিজ্ঞান ও সম্প্রসারণ বিষয়ক একটি বিশেষায়িত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০২৩ সালে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথে যোগ দেওয়ার পর তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষণা ও শিক্ষাদানের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য অনুযায়ী, বাস্তবায়নবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির মূল্যায়ন এবং প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব তৈরির কাজেও তিনি যুক্ত।
২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মালবিকা সরকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী ডিন ফর গ্লোবাল এনগেজমেন্ট হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। এই পদে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য কৌশল এগিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে মালবিকা সরকার গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রকল্পে এক কোটির বেশি মার্কিন ডলারের অনুদান সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর ১৫৫টির বেশি পিয়ার রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের একটি তথ্যে তাঁর ১৫৮টি গবেষণা প্রবন্ধ এবং সাতটি বইয়ের অধ্যায়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বজনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক পর্ষদের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ, গ্যাভি দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনস এবং যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক ও নেতৃত্বের ভূমিকায় তিনি কাজ করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এইচআরপি অ্যালায়েন্সের গবেষণা সক্ষমতা উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
বিশ্বজনস্বাস্থ্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে উইমেন ইন গ্লোবাল হেলথ তাঁকে ‘হিরোইন অব হেলথ’ সম্মাননায় ভূষিত করে। নারীর স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য গবেষণা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাশিক্ষা থেকে শুরু করে হার্ভার্ড ও হাইডেলবার্গে উচ্চশিক্ষা, বাংলাদেশে ব্র্যাকের জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম এবং বর্তমানে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও নেতৃত্ব, মালবিকা সরকারের পেশাগত পথচলা বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক ও গবেষকের বিশ্বজনস্বাস্থ্য অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।





