Thursday, June 11, 2026
spot_img

অপরূপ সৌন্দর্যের ‘নীলফক্কি’

মাত্র ৩০ মিনিট বনের ভেতর অবস্থান করে পাখিটির ছবি তুললাম। আরেকটা স্বপ্নপূরণ করে দুই ভাই মনের সুখে ঢাকায় ফিরলাম। এই পাখিটি যোগ হওয়ায় আমার পাখি সংগ্রহের সংখ্যা ৪৫০-এ দাঁড়াল।

বার্ড ফটোগ্রাফির শুরুতে অনেক পাখির নাম শুনেছি। সব পাখিই যে এক জায়গায় দেখা যাবে তা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল। ফটোগ্রাফারদের নির্দিষ্ট পাখিটিকে খুঁজতে হলে সেই অঞ্চলগুলোতেই যেতে হয়। তাতে যেমন সময়ের প্রয়োজন, তেমনি ব্যয় হয় অর্থও। তবে যে পাখিটি এখনও চোখে লেগে আছে সেটি হলো ‘নীলপাখি’, যা নীলফক্কি বা হালতি নামেও পরিচিত। আবার ‘সবুজ-হৃদয় বনসুন্দরী’ বা ‘সবুজাভ সুমচা’ও ডাকা হয়। এটির ইংরেজি নাম ‘গ্রিন-ব্রেস্টেড পিটা’ বা ‘হুডেড পিটা’। বৈজ্ঞানিক নাম ‘পিটা সোরডিডা’ (মুলার, ১৭৭৬)।

পাখিটির নামকরণ করেছেন শ্রদ্ধেয় সাজাহান সরদার ও রেজা খান স্যার। বাংলাদেশের বাগেরহাট অঞ্চলে এদের নাম ‘ছোট হালতি’। নীলফক্কি বাংলাদেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। গ্রীষ্মকালে খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনে দেখা যায়। এ ছাড়া ভারত, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, চীন ও থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদের বিস্তৃতি রয়েছে।

অপরূপ সৌন্দর্য ও রূপ নিয়ে বনে উড়ে বেড়ায়। যে কেউ প্রথম দেখায় পাখিটির মায়ায় পড়ে যাবেন। ফটোগ্রাফারদের প্রতিটি ছবির পেছনে একটি গল্প থাকে। আমার প্রতিটি ছবিই একেকটি গল্প। অনেক বছর ধরেই পাখিটিকে খুঁজছিলাম। কিন্তু দেখা পাইনি। তবে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে যখন বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রী আদনান আজাদ আসিফের সঙ্গে সাতছড়ি যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে পাখিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, আদনানের কাছে পাখিটির চরিত্র ও বর্ণনা শোনার পর মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারপর থেকে পাখিটির সন্ধানে ছিলাম। পাখিটির ছবি তোলার জন্য সেই বছরই ফের সাতছড়ি গেলাম।

সেবার গহীন বনের ভেতর সারা দিন পাখিটিকে খোঁজার পর শূন্য হাতে ঢাকায় ফিরতে হলো। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালে পাখিটি প্রথম দেখি। কিন্তু ছবি তুলতে পারিনি। পাখিটি দেখার পর থেকেই প্রেমে পড়ি। পরবর্তী বছরগুলোতেও পাখিটির ছবি তুলতে না পারায় ফিরে আসি। এরই মাঝে ২০২০ সালে করোনা মহামারি গোটা বিশ্বকে থমকে দেওয়ায় সে বছর আর যাওয়া হলো না। কিছুটা অপ্রাপ্তি ও আফসোস ছিল দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে। যারা পাখির ছবি তোলেন একমাত্র তারাই উপলব্ধি করতে পারেন এমন পরিস্থিতি কতটা কষ্টের।

মজার বিষয় হচ্ছে, এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালেও পাখিটির অপেক্ষায় ছিলাম। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সবকিছু ওলট-পালট করে দিলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। সবকিছু মিলে সে বছরও আশা ছেড়ে দিলাম। কারণ এরা গ্রীষ্মকালীন পরিযায়ী পাখি। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমাদের দেশে দেখা যায়। জুন মাসজুড়ে অবস্থান করে। একমাত্র এই প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা বাংলাদেশে প্রজনন করে। ছানা বড় করে নিজ দেশে ছানাসহ উড়ে যায়।

তবে স্থানীয় গাইড হারেস মামা ও রাসেল দেববর্মার একটা ফোন কল সব বদলে দেয়। ওদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলতে থাকে। ওরা পর পর তিন দিন পাখিটির টেরিটরি ও গতিবিধি লক্ষ্য রাখে ও ছবি তোলে। ওদের শতভাগ সুবজ সংকেত পাওয়ার পর আমার ফুপাতো ভাই কিসমত খোন্দকারকে সঙ্গী করে চলে গেলাম পাখির সন্ধানে। মাত্র ৩০ মিনিট বনের ভেতর অবস্থান করে পাখিটির ছবি তুললাম। আরেকটা স্বপ্নপূরণ করে দুই ভাই মনের সুখে ঢাকায় ফিরলাম। এই পাখিটি যোগ হওয়ায় আমার পাখি সংগ্রহের সংখ্যা ৪৫০-এ দাঁড়াল।

নীলফক্কির দৈর্ঘ্য ১৯ সেন্টিমিটার ও ওজন ৬৫ গ্রাম। ‘পিট্টিডি’ গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত পিটাগনের এক প্রজাতির ছোট বনচর পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির কালচে ডানা ও কাঁধ নীলপট্টির হয়। ডানার বাইরের কালচে অংশে সাদা পট্টি থাকে। বুক বগল ও পালক উজ্জ্বল সবুজ-নীল বর্ণের। লেজতল উজ্জ্বল লাল রঙের। মাথার চাঁদি তামা রঙের। মাথাসহ ঘাড়ের পেছনের অংশ কালো। চোখ কালচে-বাদামি। ঠোঁট কালো। পা ও পায়ের পাতা কালচে। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন।

সবুজাভ সুমচা চিরসুবজ বন, আর্দ্র ঝরাপাতা বন ও ঘন ঝোপ-জঙ্গলে বিচরণ করে। সচরাচর একা বা জোড়ায় থাকে। পরিযায়নের সময় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঝরাপাতা উল্টিয়ে এরা খাদ্য খুঁজে বেড়ায়। খাদ্য তালিকায় রয়েছে নানা জাতের কীট। খাবারের সন্ধানে এরা মাটিতে নামে। অন্য সময় গাছের ডালেই থাকে। এরা নীরবে গাছের ডালে বসে থাকে ও বনসুন্দরীর মতন এদের খাটো লেজ ঘন ঘন ওঠা-নামা করে। মেয়েপাখির দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ছেলেপাখিদের ডাকের প্রতিযোগিতা হয়। আর সেই সময় পাখিটি সহজেই নজরে পড়ে।

এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এই পাখির বাসা বানানোর পদ্ধতিটা বনসুন্দরীর মতন নয়। বনসুন্দরী শাল বা গজারি গাছের উঁচুতে কাঠি ও সরু ডাল দিয়ে বাসা বানায়। অথচ এরা ঝোপের নিচে বা বাঁশঝাড়ের গোড়ায় মাটিতে ঘাস ও পাতা দিয়ে আলগা বলের মতন বাসা বানায়। নিজেদের বানানো বাসায় মেয়েপাখিটি ৪-৫টি ডিম পাড়ে। উভয়ে ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। বাবা-মা দুজনেই সংসারের কাজ করে।

লেখক : বন্যপ্রাণী-বিষয়ক আলোকচিত্রী

এ বিভাগের আরও পড়ুন

spot_img

সর্বশেষ

spot_img