Thursday, June 11, 2026
spot_img

ক্লান্তি পিছু ছাড়ছে না, ভিটামিন ডি স্বল্পতায় ভুগছেন না তো?

শাহিনুর আক্তার তানিয়া। একটি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। সকালে স্কুলে ঢুকছেন, বেরোতে বেরোতে বিকেল। আবার ছুটির দিনগুলোতে বাসার কাজের ব্যস্ততা। এদিকে সব সময় ক্লান্ত লাগে, শরীরে বিভিন্ন রকমের ব্যথাও ভোগায় মাঝেমধ্যে। বসে থাকতে থাকতে বাড়ছে ওজনও। চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, ভুগছেন ভিটামিন ডি-এর অভাবে। যেভাবেই হোক অল্প সময়ের জন্য হলেও শরীরে সূর্যের আলো লাগানো চাই।

ভিটামিন ডি-কে বলা হয় ‘সানশাইন ভিটামিন’। কারণ এটি সূর্যের আলোয় আমাদের ত্বকে তৈরি হয়। আর এটি অভাব যে কতটা ভোগাতে পারে, তা তানিয়া আক্তারের মতো ভুক্তভোগীরাই ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারে। যাদের সকাল—সন্ধ্যা চার দেয়ালের ভেতরে থাকতে হয়, তাদের এই সমস্যায় ভুগতে হয় বেশি।

দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝে শরীরের চাহিদা অনুযায়ী সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসার সুযোগ সবার হয় না। যার ফলে শরীরের অন্যতম প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান হলেও এর পর্যাপ্ততা সবার শরীরে নেই। আপনার শরীরে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি রয়েছে কি না সেটি বোঝার কিছু উপায় রয়েছে। সেগুলো নিয়েই জানাব এই প্রতিবেদনে।

ভিটামিন ডি স্বল্পতার লক্ষণগুলো—
১. ক্লান্তি ভাব :
‘হাউ নট টু ইট আল্ট্রা-প্রসেসড’ বইয়ের লেখক বিশেষজ্ঞ ডায়েটিশিয়ান নিকোলা লুডল্যাম-রেইন বলেন, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির একটি সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী নার্সদের ওপর চালানো একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৮৯ শতাংশের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ছিল এবং তারা নিজেরাই ক্লান্তি অনুভবের কথা বলেছেন। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায়ও দেখা যায়, ৪৮০ জন বয়স্ক মানুষের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সঙ্গে ক্লান্তির উপসর্গের মিল পাওয়া যায়।

২. ঠান্ডা লাগা ও সংক্রমণে বারবার আক্রান্ত হওয়া : গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির কারণে ইমিউন সিস্টেমের কাজ দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যদি কেউ ঘন ঘন অসুস্থ হন বা বারবার সংক্রমণে ভোগেন এবং এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ না জানা থাকে, তাহলে জলদি চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে আপনি যদি গর্ভবতী হন বা ৭৫ বছরের বেশি বয়সী হন, তবে এটি আরও জরুরি। অধ্যাপক গ্রসম্যান বলেন, ‘ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা গেলে যৌক্তিক মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট নেওয়াতে কোনো ক্ষতি নেই। যদি রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা ৫০ এনএমওএল/এল-এর নিচে হয়, তাহলে আমি সাধারণত এক থেকে দুই হাজার আইইউ প্রতিদিন নেওয়ার পরামর্শ দিই।

৩. হাড়ে ব্যথা : ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের গঠন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে অস্টিওপোরোসিসের মতো হাড়ের রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে অস্টিওপোরোসিস অনেক সময় ধরা পড়ে তখনই, যখন হঠাৎ পড়ে যাওয়ার পর কোনো হাড় ভেঙে যায়। অধ্যাপক গ্রসম্যান বলেন, ‘হাড়ে ব্যথা থাকা মানেই অস্টিওপোরোসিস হয়েছে— তা নয়। কিন্তু যদি হাড়ে ব্যথা থাকে এবং অন্য কোনো কারণ না থাকে, তাহলে আমি পরামর্শ দেব, ভিটামিন ডি-এর মাত্রা ৫০ এনএমওএল/এল-এর নিচে হলে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি অনেক বেশি হলে ‘অস্টিওমালাসিয়া’ হয়। এই রোগে হাড়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও প্রায়ই পেশিশক্তি কমে যাওয়ার সমস্যা হয়। এটি এটি অস্টিওপোরোসিস থেকে আলাদা।

৪. পেশির ক্লান্তি ও ব্যথা : পেশিতে ব্যথার নির্দিষ্ট কারণ সব সময় চট করে বোঝা যায় না, তবে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। লুডল্যাম-রেইন বলেন, ভিটামিন ডি পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় সহায়তা করে। এর অভাবে পেশির দুর্বলতা ও ব্যথা হতে পারে। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যথায় ভুগছিলেন, তাঁদের ৭১ শতাংশের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ছিল।

৫. ক্ষত ধীরে সেরে ওঠা : ডায়েটিশিয়ান লুডল্যাম-রেইন বলেন, ভিটামিন ডি শরীরে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করা, সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও ত্বক মেরামতে সহায়তা করে থাকে। তাই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে ক্ষত সেরে উঠতে দেরি হওয়া স্বাভাবিক। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় ২২১ জন মানুষের মধ্যে দেখা গেছে, যাদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ছিল, তাদের রক্তে প্রদাহ-সংক্রান্ত উপাদানের মাত্রা বেশি ছিল, যা ক্ষত নিরাময়ে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর পায়ে ক্ষত ছিল। যাঁরা ১২ সপ্তাহ ধরে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নিয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষত অন্যদের তুলনায় দ্রুত সেরে গিয়েছে। অধ্যাপক গ্রসম্যান বলেন, কিছু মানুষ বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন—বয়স্করা, বেশির ভাগ ঘরেই থাকেন এমন মানুষেরা, যাদের গায়ের রং কালো এবং যেসব দেশে সূর্যের আলো কম।

৬. চুল পড়া : লুডল্যাম-রেইন জানান, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি ও চুল পড়ার মধ্যে একটি সম্পর্ক থাকতে পারে, বিশেষ করে অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটা-র মতো রোগে। তিনি বলেন, ‘অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটা একটি অটোইমিউন রোগ, যার ফলে প্রচুর চুল পড়ে যায়। এক গবেষণায় ৪৮ জন রোগী, যাঁরা এই রোগে ভুগছিলেন, তাঁদের ওপর একটি পরীক্ষামূলক ওষুধ হিসেবে কৃত্রিম ভিটামিন ডি ব্যবহার করা হয়েছিল। ১২ সপ্তাহ পরে দেখা যায়, তাঁদের চুল গজানোর হার অনেক বেড়ে গেছে। অন্য একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বেশি ছিল, তাদের চুল পড়ার হার কম ছিল।

৭. ওজন বেড়ে যাওয়া : ওজন বাড়ার প্রধান কারণ শরীরের চাহিদার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ। তবে এতে ভিটামিনের ঘাটতিও প্রভাব ফেলে। অধ্যাপক গ্রসম্যান বলেন, ‘যেসব রোগীর প্রি-ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস হওয়ার আগের অবস্থা) রয়েছে, তাদের ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হলে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা ধীর গতিতে রূপ নিতে পারে।

ভিটামিন ডি কেন প্রয়োজন? এই ভিটামিন হাড় সুস্থ রাখে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউন সিস্টেম) ঠিক রাখে। এমনকি মস্তিষ্কের কোষকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান যা ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিলে হাড় তৈরি ও হাড়কে শক্ত করে তোলে। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকলে শরীর ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে। ঘাটতি হলে হাড় নরম হয়ে যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে একে রিকেটস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অস্টিওমালাসিয়া বলা হয়। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, কম ভিটামিন ডি-এর মাত্রা ক্যানসার, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, হৃদ্‌রোগ ও রক্তজনিত রোগের সঙ্গেও জড়িত থাকতে পারে।

ভিটামিন ডি ঘাটতি পূরণের উপায় : ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণের জন্য বা ঘাটতি যেন না হয় সেটার জন্য সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকা অনেক বেশি জরুরি। বিশেষ করে সকালের সূর্যের আলোয় সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ডি থাকে। যদি সূর্যের আলোতে যাওয়ার সুযোগ না থাকে তাহলে সাপ্লিমেন্ট নিতে পারেন। এ ছাড়া খাবারের মাধ্যমেও শরীরে ভিটামিন ডি বাড়ানো সম্ভব।

শরীরে ভিটামিন ডি বাড়ানোর কিছু উপায় বলে দিয়েছেন লুডল্যাম-রেইন— ১. ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ দুধ: অনেক আলমন্ড, সয়া, ওট এবং অন্যান্য প্ল্যান্ট বেসড দুধে ভিটামিন ডি যুক্ত করা হয়। সেগুলো পান করতে পারেন। সাধারণ দুধে ভিটামিন ডি থাকে না। ২. ডিমের কুসুম: এটি একটি সমৃদ্ধ উৎস। বিশেষ করে যদি মুরগি মুক্ত বাতাসে থাকে এবং সূর্যালোক পায়। গ্রামাঞ্চলে খোলা জায়গায় লালন-পালন করে বড় করা দেশি মুরগির ডিম এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী। ৩. তেলাপিয়া মাছ: তেলাপিয়া মাছ ভিটামিন ডি-এর চমৎকার উৎস। ৪. গরুর মাংস ও যকৃৎও ভিটামিন ডি-এর ভালো উৎস। ৫. ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ সিরিয়াল: অনেক সিরিয়ালে ভিটামিন ডি যুক্ত করা থাকে। সেগুলো খেতে পারেন। এসব খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আপনি সহজেই ভিটামিন ডি-এর অভাব পূর্ণ করতে পারবেন।

এ বিভাগের আরও পড়ুন

spot_img

সর্বশেষ

spot_img